আদি বুড়িগঙ্গার ভাগ্যে কী আছে

খননকাজ অপূর্ণাঙ্গ রাখা হয়েছে এ স্থানে, তবে উচ্ছেদ করা হবে বলা হচ্ছে
ছবি: লেখক

বুড়িগঙ্গা নদী নিয়ে যত আন্দোলন, লেখালেখি, প্রকল্প, পরিকল্পনা হয়েছে, তার নজির বোধ হয় আর কোনো নদীর ক্ষেত্রে নেই। রাজধানী ঢাকার জীবন (লাইফলাইন) নদীটি নিজে ‘জীবন’ (লাইফ) হারিয়েছে দীর্ঘদিন। বুড়িগঙ্গার ৭ কিলোমিটারের আদি খাতটি ৫০ বছর ধরে শুধু ভরাটই হয়েছে। ফলে কামরাঙ্গীরচর থেকে হাজারীবাগের অংশটি যে এককালের প্রবহমান কোনো স্রোতোধারা, তা বোঝাই দুষ্কর হয়ে পড়েছিল।

দেড় বছর ধরে খনন চলা এ নদীপথের উদ্ধারকাজ কেমন হলো, তা–ই দেখে এলাম সরেজমিন।

খনন, উচ্ছেদ চলছে

২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর কামরাঙ্গীরচরের এক নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিয়ে আদি বুড়িগঙ্গার খাতটি উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন গত বছরের জুন নাগাদ খননকাজ শুরু হয়। প্রথম ধাপে ২৫ কোটি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে ৭ কিলোমিটারের এ চ্যানেলকে ঢাকার দ্বিতীয় হাতিরঝিল করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে নদীর বর্জ্য অপসারণের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।

কামরাঙ্গীরচর এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, নদীতে ক্ষীণ প্রবাহ আছে। উত্তোলন করা বর্জ্য অপসারণের কাজ চলছে। যদিও খননের জন্য এক্সকাভেটরের সংখ্যা খুবই কম, তিন থেকে চারটি। কাজের গতি বেশ ধীর। ৩০ বছর ধরে হেন কোনো বর্জ্য নেই, যা আদি বুড়িগঙ্গায় পড়েনি। কাজেই এ কাজ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নদীর দুই পাড়ে যত দূর চোখ যায়, তত দূর কেবলই আবর্জনা।

কিছুটা এগিয়ে কোম্পানিঘাট সেতুর দিকে গেলাম। সেখানে দু-একটি ভবন ভাঙার কাজ চলছে। তবে এত দিন ধরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা যাদের নিয়ে, সেই ম্যাটাডোর পার্ক ও পান্না ব্যাটারির কারখানায় এখনো হাত পড়েনি। সব ভাঙা হচ্ছে, তবু কি এমন অলৌকিক কারণে এ দুই প্রতিষ্ঠানে এসে থমকে যাচ্ছে করপোরেশন, ভাববার বিষয়!

ম্যাটাডোর পার্ক, নদীর জায়গা দখল করা এ বিনোদনকেন্দ্র এখনো উচ্ছেদ হয়নি
ছবি: লেখক

স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে

আদি বুড়িগঙ্গার পানি ও বর্জ্যের গন্ধে হাঁটা যায় না। স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে চরম মাত্রায়। সম্প্রতি পরিবেশবিদ কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, আদি বুড়িগঙ্গার প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি অক্সিজেন থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র দশমিক ৫ মিলি। জনবহুল এ এলাকায় একটি ক্ষতিগ্রস্ত নদী খাতের জন্য যে দুর্ভোগ, তা বোঝানো দায়। শুষ্ক মৌসুমে এই বর্জ্যের দুর্গন্ধ, বর্ষায় জলাবদ্ধতা। আদি বুড়িগঙ্গা নদীর হাল ফিরলে অবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন এখানকার মানুষের চোখেমুখে।

নদীর পাড়েই মোবারক মিয়ার চায়ের দোকান। সেখানে বেশ কয়েকজন স্থানীয় নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা হলো। একজন নারী বলেন, এ নদীর পানি তিনি পান করেছেন, রেঁধেছেন এই পানি দিয়েই। বিস্মিত হলাম। চোখের সামনে যে পানি দেখছি, তার দুর্গন্ধেই প্রাণ ওষ্ঠাগত, এ পানি নাকি খাওয়াও যেত!

মোবারক বলে চললেন, ‘এসব ভবন হইছে বড়জোর ৩০ বছর। আগে কিছুই ছিল না। নদী আরও চওড়া ছিল, ভরা পানি ছিল, নৌকা চলত। আমরা সেইসব দেখে আসছি।’

অবাক হলাম না। বাংলাদেশের সব নদীর গল্পই মোটামুটি এক রকম। এককালে প্রমত্ত ছিল, এখন মৃতপ্রায়। জানতে চাইলাম আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের মহাপরিল্পনা সম্পর্কে তাঁদের অভিমত।

একজন বলেন, ‘এখনো তো কিছুই দেখি না। এটা তো উন্নতি না, শুধু ময়লা তুলে রাখছে। হাতিরঝিল তো একটা আছে, এটায় তো ওটার মতন পানি নাই, রাস্তা নাই। নদীর জায়গা এখনো উদ্ধার হয় নাই।’

কথা সত্য। দ্বিতীয় হাতিরঝিল করার জন্য এখনো কোনো উদ্যোগ আদি বুড়িগঙ্গায় চোখে পড়ে না।

কাজের গতি যথেষ্ট মন্থর, দখলদারের উচ্ছেদ করা শেষ হয়নি পুরোপুরি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়। হাতিরঝিলের জন্য সেনাবাহিনীর যে সুব্যবস্থিত পরিকল্পনা ও কর্মযজ্ঞ দেখা গিয়েছিল, তা একেবারেই অনুপস্থিত আদি বুড়িগঙ্গার বেলায়।

দু-একটি এক্সকাভেটর দিয়ে চলছে বর্জ্য উত্তোলনের কাজ
ছবি: লেখক

আশ্বাস মিলেছে

অবশ্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পুরো প্রকল্পটি বোঝা যাবে উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) অনুমোদনের পর। সম্প্রতি খননকাজ পরিদর্শনে এসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, ‘আপনারা জানেন, হাতিরঝিলের কাজ শেষ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিল। হাতিরঝিল বদ্ধ জলাশয়, কিন্তু আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল উন্মুক্ত নদীর অববাহিকা। বোঝাই যাচ্ছে, একটু ভিন্নতা রয়েছে। এটি যেহেতু নদীর অববাহিকা, সেহেতু এটিকে আরও সুন্দর, আরও বেশি নান্দনিক করে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

এখন পর্যন্ত এই আশ্বাসেই নির্ভর করছে আদি বুড়িগঙ্গার ভবিষ্যৎ। অবাসযোগ্য তকমা পাওয়া এ শহরে একেকটি জলাশয়ের বেঁচে থাকার লড়াই যে নগরবাসীর জন্য কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, দেরিতে হলেও তা টের পাচ্ছেন ঢাকাবাসী। ঢাকা বাঁচাতে নদী-খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। আদি বুড়িগঙ্গার মধ্য দিয়েই কি শুরু হবে সে প্রত্যাবর্তন?

আগামীর সময়ই দেবে সেই উত্তর।

  • লেখক: শাফায়াত স্বচ্ছ, শিক্ষার্থী, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে