জুলাই সনদ ও গণভোটে হ্যাঁ/না ভোটের অসহায়ত্ব—আগামীর সংকট!
সাংবিধানিকভাবে জনগণ রাষ্ট্রের মালিক, এখন দেখার বিষয় একজন মালিক ভোটার হিসেবে তিনি কেন হ্যাঁ–এর পক্ষে ভোট দেবেন অথবা না–এর পক্ষে অবস্থান নেবেন—এ জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সংবিধান, জুলাই সনদ ও সব রাজনৈতিক দল এবং জোটের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে। কারণ, কমিশন জুলাই সনদের প্রস্তাবনা বা দফায় এমন কিছু প্রস্তাব ও নোট জারি করেছে, যা একজন সাধারণ ভোটারকে সংবিধান, জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক দলের ইশতেহার সর্বতোভাবে অনুধাবন না করে নিঃশঙ্কভাবে রায় প্রদানের সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
একজন সাধারণ নাগরিক ও ভোটার রাষ্ট্রের সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানা–বোঝা বা চর্চার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ার কথা নয় এবং জুলাই সনদ ও গণভোটের হ্যাঁ বা না এক জটিল সমীকরণের দলিল হিসেবে ভোটারের সামনে হাজির করা হয়েছে, যা একজন সাধারণ ভোটার যাঁরা এসব জটিল বিষয়ে কোনো জ্ঞান রাখেন না, চর্চার বিষয়ও নয়, অথচ গণভোটে হ্যাঁ বা না ভোট প্রদান করে সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণী অভিমত প্রদান করতে ভোটার হিসেবে বাধ্য হচ্ছেন।
জুলাই সনদ ৫০ পৃষ্ঠার এক দলিল। এতে ঐকমত্যে উপনীত হওয়া ৮৪টি প্রস্তাব বা দফা আছে। জাতীয় জুলাই সনদ ২০২৫–এ অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি প্রস্তাব বা দফায় ৩০টি দল ২২টিতে, ৩১টি দল ১০টিতে, ৩২টি দল ১৭টিতে ও বিভিন্ন সংখ্যক দল ভিন্ন ভিন্ন দফায় একমত পোষণ করেছেন অথবা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয়—কমিশন জুলাই সনদে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনার বিপরীতে ৭১টি বিশেষ নোট লিপিবদ্ধ করেছেন। উক্ত নোটসমূহে বলা হয়েছে—‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’
জনগণের ‘ম্যান্ডেট লাভ’ বাক্যটা শুনতে আশাজাগানিয়া ও গণতন্ত্রের পক্ষে আপ্তবাক্য হিসেবে আনন্দের। একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে গণভোটে কেন হ্যাঁ বা না ভোট প্রদান করবে তা বুঝতে জুলাই সনদ অনুধাবন জরুরি মনে করি। গণভোটে হ্যাঁ বা না–এর প্রশ্নমালায় দৃষ্টিপাত করা দরকার—
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
খ. আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চ কক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চ কক্ষের সংখাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য হইয়াছে—সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
ওপরের ৪টি প্রশ্নের উত্তর একত্রে হ্যাঁ বা না উত্তর দেওয়ার সুযোগ হয়তো অনেকের ক্ষেত্রে নেই। চারটি প্রশ্নের অন্তত দুটির উত্তর হ্যাঁ ভোট প্রদান করা গেলও সংগত কারণে অন্য দুটি প্রশ্নের উত্তর ‘না’ সূচক দিতে পারেন। কারণ, এ চারটি প্রশ্ন একত্রে অন্তত ৪৭টি প্রস্তাবের সামষ্টিক আলোচনায় দেখা গেছে বহু প্রস্তাব সরকার গঠন ও সরকার পরিচালনায় প্রতি পদক্ষেপে সরকার বাধাগ্রস্ত হবে।
আগামী সংসদ নির্বাচন নাগরিক অধিকার ও দেশের সংহতি এবং নিরাপত্তা ও নারী অধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ এবং নারীর সুরক্ষা ও অধিকারকে প্রাধান্য দিতে হবে অনুরূপভাবে গণভোটে হ্যাঁ বা না ভোটকে শুধু যৌক্তিক জায়গা থেকে দেখা দরকার দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়—জুলাই সনদে হ্যাঁ–এর পক্ষে ১০টা যুক্তি থাকলেও যদি না–এর পক্ষে এমন একটি যুক্তি থাকে, যে যুক্তিকে অবহেলা বা পাশ কাটানো হলে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিতকে আঘাত বা বিনষ্ট করবে তাহলে গণভোটে ‘না’ ভোট প্রদানই হবে ভোটারের দায়িত্ব।
অতি উৎসাহ বহু ক্ষেত্রে অযোগ্যতাকে সামনে আনে, যা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক জাতীয় জুলাই সনদ প্রণয়নের ক্ষেত্রে। ইতিপূর্বে প্রতীয়মান হয়েছে সনদে বিভিন্ন ইতিবাচক প্রস্তাব থাকলেও বহু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রস্তাব রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে সরকার গঠন, পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনা ও নারী অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে। তাই গণভোটে ‘না’ ভোট প্রদানই বিবেচনায় অগ্রভাগে থাকা উচিত।
রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটে ‘না’ ভোট প্রদান করে তাঁদের কর্তব্যের অবসান হয়েছে মনে করার সুযোগ নেই। ‘ঐতিহাসিক জুলাই পরিবর্তন’ জাতীয় জীবনে এক উজ্জ্বল অধ্যায়, এ পরিবর্তনকে আইনি ভিত্তি দেওয়া আগামী সংসদের পবিত্রতম দায়িত্ব। সে লক্ষ্যে সংসদ গঠনের পর স্বল্প সময়ের মধ্যে আরও একটি গণভোট আয়োজন করে—
১. জুলাই পরিবর্তনের স্বীকৃতি
২. ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা ও
৩. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে আগামী জাতীয় সংসদকে এবং এটি হবে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দল ও জোটের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]