৫৪ বছরেও অটুট বন্ধুত্ব, কে বলে নারীদের বন্ধুত্ব টেকে না
এপ্রিলের স্নিগ্ধ এক বিকেলে রেস্টুরেন্টের ছাদে আড্ডা দিচ্ছেলেন সাত নারী। কামরুন নাহার নেলি, কিসওয়ার ইসলাম, উন্মে সালমা, হাসিনা আক্তার, শামিমা আক্তার, ফজিলাতুন নাহার আর তানজিলা হোসেন। সবার বয়স প্রায় ৬৫। শুধু আড্ডা নয়, সবাই একে অন্যের হাত ধরে গান গাইছেন বৈশাখের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। মাঝেমধ্যে নানা খুনসুটিতে অকারণেই হেসে উঠছেন। মনে হচ্ছে সবাই হারিয়ে গেছেন সেই ছেলেবেলায়।
তাঁরা পড়তেন চট্টগ্রামের অর্পণা চরণ গার্লস হাইস্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বন্ধুত্ব তাঁদের। সময়ের স্রোতে ৫৩ বছর কেটে গেলেও বন্ধুত্ব এখনো অটুট। রেস্টুরেন্টে আড্ডা আর গানের মাঝে খাবারের অর্ডারের কাজটি ভাগাভাগি করে নিলেন তাঁরা। কেউ খাবার অর্ডার করছেন, আবার কেউ ট্রে করে নিয়ে আসছেন খাবারগুলো। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস, চাওমিন আর কোমল পানীয় ভাগাভাগি করে খেলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে কেউ কেউ নামাজে গেলেন। বাকিরা ভ্যানিটি ব্যাগ পাহারায় বসে আছেন।
তাঁদের একজন কিসওয়ার ইসলাম জানান, কয়েক দিন আগেই তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরে ব্যাকুল হয়ে পড়েন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। একসঙ্গে বসে কথা বলতে। আজ দুপুর থেকেই তাঁরা এখানে, দুপুর ঘনিয়ে এখন সূর্য ডোবার পথে—এর পরও তাঁদের কথা যেন শেষ হচ্ছে না।
কিসওয়ার ইসলাম বলেন, এই বন্ধুত্ব শুধু হাসি আর আনন্দ ভাগাভাগি নয়, এটি যেন সবার মনের এক গভীর যোগাযোগ। যেখানে রয়েছে বোঝাপড়া, সহানুভূতি ও নির্ভরতার এক অনন্য বন্ধন। এটি যেন রক্তের সম্পর্কের চেয়েও কম নয়। স্বামী হারানোর মতো অনেক ধরনের কঠিন সময় পার করেছেন তাঁদের কয়েকজন। তবে সে সময় একে অন্যের পাশে ছিলেন। বন্ধুত্বের এই সঙ্গ সবার মানসিক চাপ কমিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
ফজিলাতুন নাহার বলেন, এসএসসি পাসের পর তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন কলেজে ভর্তি হন, কেউ আবার বিয়ে করে পাড়ি জমান দেশের বাইরে। এ জন্য সবার একসঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি সে সময় যোগাযোগব্যবস্থাও এত উন্নত ছিল না। একে অন্যকে ভুলে যাওয়ার ভয়ে কঠিন হলেও যোগাযোগ চালিয়ে গেছেন তাঁরা। তবে বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। কিছুদিন আগে ১৯৭৭ সালের এসএসসি ব্যাচের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের জন্য একটি গ্রুপ খোলা হয় ফেসবুকের মেসেঞ্জারে। এই গ্রুপের মাধ্যম তাঁরা আরও বন্ধুদের খুঁজে পান, যাঁদের খুঁজে পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব।
কামরুন নাহার নেলি বলেন, ‘আমাদের বয়সে অনেকের জীবন খুব একা হয়ে পড়ে। কেউ হয়তো স্বামী হারিয়ে, আবার এই ব্যস্ত শহরে সন্তানেরাও প্যারেন্টসকে পর্যাপ্ত সময় দিতে ব্যর্থ হন। এমন সময় বন্ধুদের প্রয়োজন অতুলনীয়। এই বন্ধুত্বের কারণে তারা সেই নির্ভরতার জায়গাটি খুঁজে পান। অথচ একসময় তাদের শুনতে হয়েছিল মেয়েদের বন্ধুত্ব নাকি টেকে না।’
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
স্মৃতিচারণা করে উম্মে সালমা জানান, শিক্ষাজীবনে তাঁরা এই সাত বন্ধু প্রায়ই সিনেমা দেখতে যেতেন। তবে সে সময় প্রেক্ষাগৃহ ছিল ভিন্ন রকম। তখন পালকির মতো একটি বাক্সে বসে মেয়েদের সিনেমা দেখতে হতো বলে হেসে ওঠেন তিনি। বলেন, তাঁদের এই বন্ধুত্ব এখন আর আড্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরও কিছু দায়িত্ব নিয়ে হাঁটছেন তাঁরা। সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য করোনার সময় গঠন করেন ‘সুমিত’ নামে এক তহবিল। যেসব শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁদের সহযোগিতার পাশাপাশি দুস্থ নারীদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয় এই তহবিল থেকে। এটিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন তাঁরা। কাজটি তাঁদের যোগাযোগের কারণকে আরও অর্থবহ করার পাশাপাশি সময়কে আরও স্মৃতিমধুর করে তুলছে, বলেন তিনি।
তাঁরা মনে করেন, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বিয়ে করেননি, আবার অনেকে নিঃসন্তান জীবন কাটাচ্ছেন। তবে পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যাদের কোনো বন্ধু নেই।