ব্যাংকিং খাতের উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে কেন?

ব্যাংকের চাকরিফাইল ছবি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত একটি বড় ধরনের সংকটময় সময় পার করছে। নামে–বেনামে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ঋণ প্রদান এবং বিতরণ করা এসব ঋণের বৃহৎ অংশ খেলাপি হওয়ায় এ খাতে আস্থার সংকট চরমে। পরিস্থিতি এমন যে ব্যাংকগুলোকে একীভূত, অবসায়ন, মূলধন জোগানসহ নানা বিষয়ে সরকারকে ভাবতে বাধ্য করছে। এরই মধ্যে সরকার নানা ধরনের কাজও শুরু করেছে। তবে কাজের ধরন ও মাত্রা নিয়ে জনমনে কিছুটা প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

এখনো ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী কারও বিরুদ্ধেই দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। অল্প কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তার গতি মন্থর। এমনকি ৫ আগস্টের আগে স্বৈরাচারের পক্ষ নেওয়া ব্যাংকাররাও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। কেউ কেউ আবার খোলস পাল্টে ভিড়েছেন অন্য দলে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ব্যাংকগুলোয় নানা সময়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে; যার ফলে কর্মস্পৃহা হারাচ্ছেন তৃণমূলের ব্যাংকাররা। বিগত সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় দেখা গেছে, অল্প কয়েকটি শাখা থেকেই কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাট হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সে শাখাগুলো ব্যতীত অন্য সব শাখা আমানত সংগ্রহ, ঋণ প্রদান ও আদায়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ও কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি পূরণ করতে পেরেছে। অথচ সেই তৃণমূলের ব্যাংকারদেরই এখন ব্যাংকের লোকসানে ফল ভোগ করতে হচ্ছে। যদিও এখানে তাঁদের ভূমিকা একদমই নগণ্য।

কাজের ধরন ও পরিমাণের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা–কর্মচারীদের আলাদা বেতন কাঠামোর দাবি অনেক পুরোনো। তবে সেটা না মেনে নতুন করে উৎসাহ বোনাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হস্তক্ষেপ ব্যাংকগুলোকে আরও অস্থির করবে।

প্রথমত, এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রভাব সংকুচিত করবে, যা সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরবর্তী সময়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। ব্যাংকিং খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করা জরুরি, সেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এমন হস্তক্ষেপ পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত হলে এই খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আরও সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো এখন তৃণমূলের জনসাধারণকে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের পরিবর্তে লাভজনক কার্যক্রমে উৎসাহিত হবে। কারণ, বর্তমানে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো তৃণমূলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবকাঠামো সচল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বিবেচনায় রেখে মুনাফাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের তরুণদের একটা বড় অংশ বেকার এবং তাঁদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আস্থার সংকটে থাকা এ খাতে বেশি চাপাচাপি হলে তাঁরা এখানে আগ্রহ হারাবেন। এতে ভবিষ্যতে এ খাতে মেধাবী জনশক্তি পাওয়া দুষ্কর হবে। কিছু ক্ষেত্রে দেশ থেকে মেধা পাচার আরও বাড়বে।

চতুর্থত, দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কেন্দ্রীয় গুটিকয় কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশের আর্থিক খাতের এমন বেহাল সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিশাল উৎসাহ বোনাস গ্রহণও নৈতিকভাবে তাঁদের প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সরকারের প্রায় এক বছরের বেশি সময় পার হলেও বর্তমান সরকার ব্যাংকিং খাতের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার করতে পারেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের অযাচিত মন্তব্য খাতকে আরও অস্থির করেছে। রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা ও জনগণের কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন পাওয়ার পরও সরকার ব্যাংকিং খাতে গুণগত সংস্কারের কাছাকাছি যেতে পারেনি। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার বলতে কিছু প্রাইভেট ব্যাংককে একীভূতকরণ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অযাচিত হস্তক্ষেপেই সীমিত হয়ে পড়েছে। সরকার ব্যাংক খাতের সমস্যা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা চেষ্টাই করেনি। শুধু লোকদেখানো কিছু সংস্কারের নমুনা চলছে।

কারণ হিসেবে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও লোকসানের পরিমাণ বিপুল অঙ্কের হলেও এখানে গ্রাহকসংখ্যা অল্প। এসব ঋণ বিতরণের সঙ্গে জড়িত পক্ষও অল্প। তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও থমকে আছে।

তাই ব্যাংক খাতে একটি সুষম সংস্কার দরকার। যেখানে রাষ্ট্রায়ত্তসহ সব ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হবে। অপর দিকে অল্প কিছু কর্মকর্তার জন্য পুরো ব্যাংকিং খাতকে শাস্তি দেওয়া উচিত হবে না। কারণ, তৃণমূলের ব্যাংকাররা উৎসাহ হারালে তৃণমূলের জনগণ কাঙ্ক্ষিত ব্যাংকিং সেবা বঞ্চিত হবেন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব রাখবে।

*লেখক: এম এ মাসুদ, ব্যাংকার