প্রথাগত বিকল্প নেতৃত্বের পাঠ: খালেদা জিয়ার জীবন

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াফাইল ছবি: প্রথম আলো

আমাদের সমাজে শিক্ষা ও সাফল্যের সম্পর্ক নিয়ে একধরনের সরল বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। ভালো শিক্ষা মানেই ভালো ভবিষ্যৎ, ভালো ডিগ্রি মানেই নেতৃত্বের যোগ্যতা এই ধারণা এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে আমরা প্রায় ভুলেই যাই, জীবন সব সময় এই সরল সূত্র মেনে চলে না। বিশেষ করে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার মতো ক্ষেত্রে এই ধারণা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। খালেদা জিয়ার জীবন সেই চ্যালেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রথাগত শিক্ষায় সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনিবার্য চরিত্র হয়ে উঠলেন, সেই প্রশ্ন আমাদের শিক্ষা, নেতৃত্ব ও সফলতার সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

খালেদা জিয়ার প্রথাগত শিক্ষাজীবন দীর্ঘ বা উচ্চতর ছিল না। তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ একাডেমিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেননি, রাজনৈতিক দর্শন বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠও তার জীবনের অংশ ছিল না। এই বাস্তবতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বহুবার আলোচনায় এসেছে, অনেক সময় তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা এ বিষয়ে বিদ্রূপের সঙ্গে সমালোচনা করত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সীমিত প্রথাগত শিক্ষা তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, রাজপথে থেকে তিনি শিখেছেন গণমুখী শিক্ষার পাঠ এবং দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তাঁকে একজন শক্ত অবস্থানের রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত করেছে।

খালেদা জিয়ার জীবনের প্রথম অধ্যায় ছিল নিভৃত, ব্যক্তিগত এবং গৃহকেন্দ্রিক। একজন গৃহিণী হিসেবে তাঁর জীবন আবর্তিত হতো পরিবারকে ঘিরে। সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার কাছাকাছি ছিলেন, কিন্তু সক্রিয় রাজনীতির মঞ্চে থাকার কোনো প্রস্তুতি তখনো তাঁর ছিল না।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার সামনে এক গভীর সংকটের সময় আসে। একদিকে ব্যক্তিগত শোক, অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ ও একটি দেশের অস্থির সময় এই তিনের সম্মিলন তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি কোনো সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে। বরং সময়, বাস্তবতা ও দায়িত্ববোধ তাঁকে এই কঠিন দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করেছে। এই জায়গাতেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। রাজপথের আন্দোলন সংগঠিত করা, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দমনমূলক বাস্তবতার ভেতর টিকে থাকা সহজ কাজ ছিল না। এখানে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাঁকে পথ দেখায়নি। পথ দেখিয়েছে অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শেখা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। রাজনীতি থেকে রাজনীতি শেখার এই প্রক্রিয়াই তাঁকে ধীরে ধীরে একজন পরিণত রাজনৈতিক নেত্রীতে রূপান্তরিত করে।

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনকারী বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল জটিল ও সংবেদনশীল কাজ। তাঁর শাসনামল নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে অবস্থান করেছেন। ক্ষমতায় থাকুন কিংবা বিরোধী দলে, তিনি রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে ছিলেন না। এই ধারাবাহিক উপস্থিতি একজন নেতার বড় শক্তি, যা কেবল প্রথাগত শিক্ষা দিয়ে অর্জন করা যায় না।

  • লেখক: মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান, পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়