শুভ্র দেবের সঙ্গে এক দুপুর
২০০০ সালের কথা। তখন দৈনিক মুক্তকণ্ঠ পত্রিকায় জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করি। পত্রিকার তরফ থেকে জানানো হলো, জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে চার পাতার বিশেষ সাময়িকী প্রকাশিত হবে। সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে পত্রিকা অফিসে পাঠালাম। পদ্মাপাড়ের বিক্রমপুর শিরোনামে সাময়িকীর কভার পেজ করা হলো। জেলার আদি ইতিহাস আর ঐতিহ্য ছিল তখন চোখে পড়ার মতো।
আদি ইতিহাস আর ঐতিহ্য দেখে তখনকার সময়ের পত্রিকাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মীর মোস্তাফিজুর রহমান খুবই মুগ্ধ হলেন। বললেন, ‘ফিরোজ আপনার এলাকায় বেড়াতে যাব, সঙ্গে থাকবে কণ্ঠশিল্পী শুভ্র দেব। তবে পুকুরের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা মাছ ধরব।’ নব্বইয়ের দশকের তুমুল জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তখন শুভ্র দেবের জনপ্রিয়তা খুবই তুঙ্গে। আমার এ চোখ পাথর তো নয়, সব ব্যথা ভুলে যাব নীরবে—গানটি তখন সবার মুখে মুখে। তাঁরা পুকুরে মাছ ধরবেন। পুকুরের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই খোঁজ শুরু করলাম কোথায় মাছের পুকুর পাওয়া যায়। অনেক খোঁজার পর পুকুর পাওয়া গেল। তিনি বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী নিরু ভূইয়া। তাঁর বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলায়। তিনি একজন শৌখিন মৎস্যচাষি। তিনি আমাদের কথা শুনে মাছ ধরতে তাঁর পুকুরে আমন্ত্রণ জানালেন। এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। তিনি তাঁর এলাকায় স্কুল-কলেজ তৈরি করে শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি পুকুরে মাছ চাষ করেন শুধু শৌখিন মানুষের জন্য। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে তাঁর পুকুরে মাছ ধরবেন, এতে তিনি আনন্দবোধ করতেন। তা–ও আবার সম্পূর্ণ বিনা খরচে।
ঢাকা থেকে সাংবাদিক বহরের সঙ্গে এলেন শুভ্র দেব আর আমি। মাছ ধরার জন্য পুকুরে চার ফেলা হলো। চারের ঘ্রাণে মাছ গভীর পানি থেকে কাছে ছুটে এল। তখন পুকুরে বড়শি ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই একেকটি মাছ বড়শিতে ধরা পড়তে থাকে। যার কোনো কোনোটির ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত। একটি মাছ ধরার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হয় মাছটিকে ওপরে তোলার জন্য। দুপুরের খাবারের আগপর্যন্ত চলে মাছ ধরা। এলাকাটিতে তখন লোকে লোকারণ্য। পুকুরের মালিক নিরু ভূইয়া সাহেব আমাদের সঙ্গে বসে মাছ ধরার আনন্দটি উপভোগ করলেন। মাছ ধরার ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে শুভ্র দেবের কণ্ঠে সব জনপ্রিয় গান। একেক গান শেষ হয় আর পুকুরের চারপাশ থেকে হাততালির আওয়াজ ভেসে আসে। নিদারুণ এক আনন্দের মধ্য দিয়ে আমাদের মাছ ধরার পর্বটি শেষ হয়। আমরা নিরু ভূইয়ার পুকুর থেকে এক গাড়ি মাছ ধরলাম। সত্যিই বলতে হয়, অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন নিরু ভূইয়া। তিনি বেঁচে নেই। পরকালে তিনি ভালো থাকুক। সাংবাদিকদের সত্যিকারের ভালোবাসা দিতে যিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি, সেই নিরু ভূইয়ার প্রতি রইল অনেক অনেক দোয়া আর ভালোবাসা।