বাড়িভাড়ায় ভোগান্তি
বাংলাদেশের আবাসনসংকটের প্রেক্ষাপটে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এক বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের মুদ্রাস্ফীতি টানা কয়েক মাস ধরে ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার এখন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাড়িওয়ালারা কেবল গতানুগতিক ১০ শতাংশ নয়, বরং ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ দিচ্ছেন, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকটের প্রভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। বাড়িওয়ালারা এই বর্ধিত সেবামূল্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভাড়ার অঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, একজন চাকরিজীবীর বেতনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। বাকি ৪০ শতাংশ দিয়ে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ‘ব্যাচেলর’ বা ছোট পরিবারগুলোর আবাসনসংকট। মেস বা সাবলেট ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি না থাকায় শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলা হলেও আবাসন খাতের এই বিশৃঙ্খলা ডিজিটাল বা স্মার্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আসেনি। এখনো অধিকাংশ ভাড়া লেনদেন হয় নগদে, যার ফলে সরকারের বিশাল একটি অংশ রাজস্ব হারায় এবং বাড়িওয়ালারা আয়ের সঠিক হিসাব গোপন করার সুযোগ পান। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ভাড়া আদান-প্রদান বাধ্যতামূলক করা হলে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা আসবে, অন্যদিকে সরকারও বড় অঙ্কের কর আদায় করতে পারবে।
বিশেষ করে ঢাকা শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোয় ‘গ্যাসের চুলা বাড়ানো’ বা ‘লিফট সংস্কার’-এর মতো ঠুনকো অজুহাতে মাঝবছরেও ভাড়া বৃদ্ধির সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত সিকিউরিটি মানি বা অগ্রিম গ্রহণের বোঝা।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর অকার্যকারিতা নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে একাধিকবার নির্দেশনা এলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এমনকি প্রতিটি থানায় ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে ভাড়ার পরিমাণ বা ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি তদারক করার কোনো এখতিয়ার রাখা হয়নি। এই আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে বাড়িওয়ালারা একপ্রকার ‘জমিদারি প্রথা’ কায়েম করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কারণ ছাড়াই শুধু ‘নতুন বছরের ট্রেন্ড’ বজায় রাখতে ভাড়া বাড়ানো হয়।
বহুমুখী সংকটে সবচেয়ে অবহেলিত দিকটি হলো ভাড়াটে ও বাড়িওয়ালার মধ্যকার ভারসাম্যহীন চুক্তিপ্রথা। দেশের সিংহভাগ বাড়িতেই কোনো লিখিত ভাড়ার চুক্তি থাকে না, আর থাকলেও তা কেবল বাড়িওয়ালার স্বার্থ সুরক্ষায় তৈরি করা হয়। ফলে একজন ভাড়াটে আইনি সুরক্ষা তো দূর, প্রতিবাদ করার ন্যূনতম সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেন। বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটেকে এক বা দুই মাস সময় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাড়িওয়ালারা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে ঘর খালি করার হুমকি দেন। বিশেষ করে ঢাকা শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোয় ‘গ্যাসের চুলা বাড়ানো’ বা ‘লিফট সংস্কার’-এর মতো ঠুনকো অজুহাতে মাঝবছরেও ভাড়া বৃদ্ধির সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত সিকিউরিটি মানি বা অগ্রিম গ্রহণের বোঝা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুই থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া জমা রাখতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সঞ্চয়টুকুও হারিয়ে ফেলে, যা জরুরি প্রয়োজনে বা চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করার মতো কোনো অর্থ তাদের হাতে রাখছে না।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শহরের এই নীরব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা। রাজউক ও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষকে কেবল উচ্চবিত্তের জন্য প্লট বরাদ্দ না দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ার ফ্ল্যাট প্রকল্প বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিটি বাড়ির জন্য একটি ইউনিক আইডি এবং ভাড়ার সিলিং (সর্বোচ্চ সীমা) নির্ধারণ করে দেওয়া সময়ের দাবি। অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে যদি বাড়িভাড়ার লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হবে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, আবাসন কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নই পারে সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে। নইলে এই আবাসন ব্যয় একদিন পুরো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
*লেখক: মালিহা মেহনাজ, শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়