শীতের রোদেলা সকাল
ইয়ানার স্কুল ছুটি অনেক আগেই চলে গেল। বাবাকে কত করে বলা হলো পিঠার কথা, রসের কথা; আনল না। ইয়ানার আজ মন খারাপ।
‘কী হলো, মা? হঠাৎ মন খারাপ দেখছি যে! চলো শীতের মিষ্টি রোদে গিয়ে শীতের সময়টা উপভোগ করি। তোমার বাবা আজ বাজারে গেছে। তাকে বলেছি তোমার পছন্দের পায়েস, পিঠা আর কাঁচা খেজুরের রসের সঙ্গে মুড়ির ব্যবস্থা করতে। কেমন হবে?’
‘সত্যি বলছো তো, মাম্মা! আমার অনেক আনন্দ হচ্ছে।’
ইয়ানা শীতের আয়োজন বেশ পছন্দ করে। ঘরের সামনে ফাঁকা, তাই উঠোনে রোদের মেলা। ও বাড়ি, এ বাড়ি থেকেও লোকে এসে রোদ পোহায়। পাশে দাদু পিঁড়িতে বসল, মা চা বানাচ্ছে আর ইয়ানা সূর্যের দিকে পিঠ হেলিয়ে বসেছে। মাকে কিছুক্ষণ পরপর বাবার পথের দিকে ইশারা করে।
‘কই আমার বাবা, মা? নাকি অন্যদিনের মতো এসে বলবে, বাজার আগুন, রসের বদলে গয়না বানিয়ে দিতে রাজি! রসের কথা মুখে যেন না শুনি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বাবাকে দিয়ে বিশ্বাস নেই মোটেও।’
‘তোর বাবার সম্পর্কে তুই-ই ভালো বুঝিস, আমি আর কী বলব। ধৈর্য ধর, আশা করি আজ বিফল হবে না। মেয়েটা রস রস করে মাথা খেয়ে ফেলল।’
ওদিকে দাদি তার ফোকলা দাঁতে হাসছে আর বলছে, ‘আগের মতো দিন এখন নেই দাদু। জানিস, রসের কাঁচা ঘ্রাণ এখনো পাই। তোর দাদা মাত্র তিনটে গাছে সওয়ার হতো, তাতেই মৌমাছির রাজত্ব বসত এই বাড়িতে। আর এখন তো শীত চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেল, রস তো দূরে থাক, মৌমাছি পর্যন্ত চোখে পড়ল না। কী জমানা যে এল!’
‘আম্মা, একদম ঠিক বলেছেন। আমার শ্বশুরের কথা আমার একদম মনে আছে। তিনি মন পুরিয়ে আমাকে খাইয়েছেন। শ্বশুর পেয়েছিলাম বটে, শুকরিয়াহ।’
‘হয়েছে হয়েছে, থামো তোমরা, সবাই যখন খেয়েছ, আমার বাবা আনলে মুখেও দিয়ো না বলে রাখলাম। যত সব চাপাবাজের দল।’
ইয়ানা রেগেমেগে উঠে যায়। রোজ দাদির গল্প তাকে হতাশ করে দেয়। কেন তাদের সময় এত কিছু পাওয়া যায় না, কেন তার বাবা আনে না। দাদির সময়কার দিনগুলোয় বোধ হয় অনেক সুবিধা ছিল। এত আনন্দ–উল্লাসের সুযোগ ইয়ানা হাতছাড়া করেছে। এ জন্য রোদ থেকে উঠে আড়ালে গিয়ে বসে। বাবার অপেক্ষায় বসে থাকে। কিছুক্ষণ বাদেই তার বাবা হাজির। ইয়ানা দৌড়ে এগিয়ে যায়। টোপাভর্তি খেজুরের রস। ইয়ানা উঁচু করতে পারে না, তবু একটা টোপা আনতে এগিয়ে যায়। এটা বাবার কষ্ট লাঘবের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষার মধুরিমা সুখ ও প্রশান্তির অগ্রগতি।
‘শোনো বাবা, ওই দুজনকে একফোঁটাও রস দেবে না, ওনারা বড্ড খারাপ। একজনের শ্বশুর, অন্যজনের স্বামী তাদের মন পুরিয়েছে।’
‘ঠিক আছে, মা। তুমি বরং যাও, গ্লাস নিয়ে এসো। তোমার সবকিছুই আজ একসাথে এনেছি। কাঁচা রস, ভেজা পিঠা—সব হবে। অনেক মজা হবে আজ, তাই না আম্মু?’
‘হ্যাঁ, আব্বু। ধন্যবাদ তোমাকে। এই নাও গ্লাস।’
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
ইয়ানার বাবা দুই টোপা রস এনেছে হাজার টাকার পরিবর্তে। না জানি, পানি আছে কত। রসের দামে যদি পানি কিনতে হয়, এর চেয়ে খারাপ সময় হতে পারে না।
রসের কাছে শীতের খবরদারি উধাও। খাওয়ার পরই শীতে শীতল হয়ে যাবে জানার পরও ইয়ানা কয়েক গ্লাস খেয়ে নিল।
শীতের পিঠা শীতকাল উদ্যাপনের এক বিশেষ পর্ব। কাঁচা রস ভাগাভাগির পর্ব শেষে অবশিষ্ট রস দিয়ে রসের পায়েস, ভেজানো পিঠা বানানোর বায়না ধরল ইয়ানা।
ইয়ানা আজ খুব খুশি। মা আর দাদি দুজনে গরম গরম পিঠা বানাচ্ছে। ইয়ানা চারপাশে ঘোরে আর পিঠা খায়।
‘মা ইয়ানা, ঘর থেকে নারকেলগুলো আর মিঠাই নিয়ে এসো। ভাপা বানাই।’
ইয়ানা দৌড়ে ঘরে যায়। আজ তাদের বাসায় পিঠা উৎসব। ঘরের কর্তাও কোথাও যায়নি। অন্যদিন তো অমাবস্যার চাঁদের মতো লুকিয়ে থাকে কাজের ব্যস্ততায়। ধরাছোঁয়ার বাইরে এই আনন্দের কোনো মাপকাঠি নেই। খুদে হোক, বুড়ো হোক সবাই শীতের পিঠায় এমনিতেই উৎসাহিত হয়। তাই শীতকালকে বলা হয় পিঠাপুলির ঋতু।
পিঠার আয়োজন চলেছে অনেক রাত পর্যন্ত। ইয়ানা ভাপা আর শুকনো চিতই খেতে পারলেও ভেজা পিঠা আর পায়েস খাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে গেছে। সকাল হতেই ইয়ানা রসে ভরা পিঠার ঘ্রাণ পায়। দৌড়ে মায়ের কাছে যায়, সে পায়েস তুলে দিল মাত্র। সকাল সকাল গরম পিঠার স্বাদই অন্য রকম। ইয়ানা বাবার কাছে যায়।
‘ও বাবা, ওঠো না। দেখো, বাড়িসুদ্ধ পিঠার ঘ্রাণ।’
হাতমুখ ধুয়ে সবাই রোদে গিয়ে বসে। পিঠা খায় আর গল্প করে। শীতের দিনে এমন সকাল সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। শীত যেমন শীতল আবহাওয়া নিয়ে আসে, তেমনি হাজির হয় পিঠার আনন্দ আর নতুন নতুন সবজির স্বাদ নিয়ে।
*লেখক: শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়