বিয়ে: হারিয়ে যাওয়া দিনের রঙিন স্মৃতি

ছবি: লেখকের পাঠানো

অনেক বছর আগের কথা। এক আত্মীয়ের বিয়ের একটি ছবি আজও চোখে ভাসে—বর আর কনে পাশাপাশি। মনে পড়ে, পরিচিত একজনই ছবিটি তুলে দিয়েছিল। সেই বিয়েতে আমাদের আনন্দের যেন কোনো শেষ ছিল না।

বাড়িটি ছিল চৌচালা টিনের ঘর। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হতো দ্বিতীয় তলায়। সামনে একটি বারান্দা, চারপাশে গাছপালা—সম্ভবত নারিকেলগাছও ছিল। বাড়ির সামনে সিঁড়িতে বসে চলত গল্পের আসর। বারান্দা পেরিয়ে মাঝের ঘর, তারপর আবার আরেকটি বারান্দা—গ্রামের বাড়ির সেই সহজ-সুন্দর গঠন আজও মনে দাগ কেটে আছে।

তখনকার বিয়েগুলোতে বাবুর্চি এনে রান্না করা হতো। সেই রান্নার ঘ্রাণ যেন এখনো নাকে লেগে আছে—মনে হতো শুধু ঘ্রাণেই পেট ভরে যাবে! মুরব্বিরা বাবুর্চিকে নির্দেশনা দিতেন। এক পাশে গরু, অন্য পাশে খাসি জবাই—পুরো আয়োজনেই ছিল উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে ‘শুভ বিবাহ’ লেখা গেট, আর বর আসার পর গেট ধরা নিয়ে হাসিঠাট্টা, তর্কবিতর্ক—সব মিলিয়ে এক অন্য রকম আনন্দ। জামাই বেচারাকে মুখে রুমাল চেপে দাঁড়িয়ে সব সহ্য করতে হতো। আজ ভাবলে প্রশ্ন জাগে—এই রুমালের রহস্যটা আসলে কী ছিল?

লবণ-মরিচ মিশিয়ে শরবত খাওয়ানোর চেষ্টা, গেটের টাকা আদায়—এসব ছিল নিয়মিত রীতি। আমিও গেটের টাকার বেশ কিছু ভাগ পেয়েছি, যদিও সেটা কতটা ন্যায্য ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেছে!

বিয়েবাড়িতে জরি ছিটানো ছিল এক অন্য রকম আনন্দ। চিকচিক করা জরিতে সবার মাথা, গাল ঝলমল করত। কসমেটিকসের দোকানে জরি পাওয়া যেত। কেউ কেউ রং দিত—যদিও তাতে অনেকেই বিরক্ত হতেন। তবে হলুদের সময় কাদা মাখামাখি—এ যেন ছিল আনন্দের চূড়ান্ত প্রকাশ।

ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজত গান—ফিতাওয়ালা সেই ক্যাসেট এখন ইতিহাস। কেউ কেউ আজান শুনে গান বন্ধ করতে বলতেন, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই তারাই গানের তালে পা নাচাতেন—মানুষের এই দ্বৈত রূপও ছিল বেশ মজার।

ছবি: লেখকের পাঠানো

উপহার হিসেবে তখন থালাবাটি, কাঁসার জিনিস, সিলভারের কলস, কোরআন শরিফ, প্রাইজবন্ড দেওয়া হতো বেশি। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ সোনার গয়না দিতেন। নগদ টাকা দেওয়ার প্রচলন ছিল খুবই কম। উপহার তালিকা করে রাখার জন্য দুই পক্ষ থেকেই বিশ্বস্ত লোক বসানো হতো। উপহার নিয়ে ঝগড়াও কম হতো না! অনেক সময় বিয়েই ভেঙে যেত উপহার নিয়ে ঝগড়ায়।

বাসর ঘরে ঢোকা ছিল জামাইয়ের জন্য সবচেয়ে বড় ‘পরীক্ষা’। আবার গেট, আবার টাকা। এরপর নামাজ, দুধ খাওয়ানো—সব মিলিয়ে জামাই প্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। এর মাঝেই কিছু মুরব্বি এসে অপ্রয়োজনীয় গল্প করে সময় নষ্ট করতেন।

টিনের ঘরের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা, দরজার পাশে কান পেতে শোনা—দুষ্টু ছেলেদের কাণ্ডকারখানা ছিল দেখার মতো। গ্রামের বয়স্ক মহিলারা তো আরও সরাসরি—নিজেদের অভিজ্ঞতা শুনিয়ে নতুন বউকে পরামর্শ দিতেন, যা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যেত।

তখন এত বিউটি পারলার ছিল না। বাড়িতেই কনে সাজানো হতো। গ্রামের কিছু মেয়ে এই কাজে দক্ষ ছিল। কিন্তু বিদায়ের সময় কনের কান্নায় মেকআপ সব মুছে যেত—আনন্দের মধ্যে বিষাদের এক গভীর ছোঁয়া।

ছবি: লেখকের পাঠানো

বিয়েবাড়ির প্যান্ডেলে ছোট ছোট টেবিল, ৮-১০ জন করে বসে খাওয়া। পরিবেশনের জন্য আলাদা দল—আমি ছিলাম সেই দলের একজন। পরিবেশন করতে গিয়ে একটু-আধটু চেখে দেখতাম—এটা না বললেই নয়! সবার শেষে আমরা খেতাম, আর তখন ছিল যেন অবারিত ভোজ। চাচাতো ভাইয়ের বিয়েতে প্রায় এক কেজি গরুর মাংস, ছয় পিস রোস্ট আর এক হাঁড়ি দই খেয়েছিলাম—এটা গল্প নয়, একেবারে সত্যি!

ঢাকায় চাচাতো বোনের বিয়েতে ১৬ পিস রোস্ট খাওয়ার সাক্ষীও আছে—ভাগ্নে মাসহুর এনায়েত, হিরু ভাই। মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে তো আস্ত মুরগি আর এক হাঁড়ি দই শেষ করেছিলাম—সাক্ষী আছেন ছোট মামা!

বিয়েবাড়ি ছিল অনেকের প্রেমের শুরু। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখাচোখি, এক-আধটু কথা—মোবাইলবিহীন সেই সময়ের সবচেয়ে বড় যোগাযোগ ছিল এটাই। অচেনা মানুষও অল্প সময়েই আপন হয়ে উঠত। আমারও তেমনই এক মিষ্টি স্মৃতি আছে। কেয়া নামের একটি মেয়েকে বিয়েবাড়িতে খুব ভালো লেগেছিল। না, সেটাকে হয়তো প্রেম বলা যাবে না—কিন্তু এক ধরনের অদ্ভুত টান ছিল, অকারণ ভালো লাগা। তার চোখে, তার হাসিতে যেন কিছু একটা ছিল, যা মনকে অস্থির করে দিয়েছিল।

দুঃখের বিষয়, বৌভাতে যাওয়া হয়নি। তাই আর দেখা হয়নি তার সঙ্গে, হয়নি কোনো কথাও। সময় তার মতো করেই এগিয়ে গেছে। কিন্তু পরে শুনেছিলাম—সে নাকি আমাকে খুঁজেছিল। কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠেছিল। ভাবতে ভালো লাগে—হয়তো সেই ক্ষণিকের ভালো লাগা শুধু আমার একার ছিল না, তার মনেও হয়তো একই রকম কোনো অজানা অনুভূতি দোলা দিয়েছিল। না হলে এত মানুষের ভিড়ে, এত মুখের মাঝে, অল্প সময়ের জন্য দেখা একজনকে খুঁজবে কেন?

কেয়ার প্রতি সেই অদ্ভুত ভালো লাগা অনেক দিন আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কোনো নাম না পাওয়া অনুভূতি, না বলা কিছু কথা, আর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার এক নিঃশব্দ বেদনা—সব মিলিয়ে সে স্মৃতিটা আজও রয়ে গেছে মনের গভীরে। সময় অনেক কিছু বদলে দেয়, তবু কিছু অনুভূতি থেকে যায়—নীরবে, অমলিন হয়ে।

জামাইয়ের জুতা চুরি—এটাও ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ‘মিশন’। টাকা দিয়ে জুতা ছাড়াতে হতো। তিন দফা টাকা দিতে দিতে জামাইয়ের পকেট প্রায় খালি হয়ে যেত। নতুন বউকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হতো—ভারী শাড়ি, গয়না পরে যা ছিল বেশ কষ্টকর। আর মুখে মিষ্টি গুঁজে দেওয়ার সেই রীতি—নতুন বউয়ের জন্য একধরনের মিষ্টি ‘অত্যাচার’ই ছিল।

আজকের আধুনিক আয়োজনের বিয়ের ভিড়ে সেই সহজ-সরল, প্রাণবন্ত দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতির ভাঁজে তারা এখনো জীবন্ত—হাসি, কান্না, দুষ্টুমি আর ভালোবাসার মিশেলে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]