ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে না পারলেও বিশ্বকাপই যেন বাংলাদেশের মানুষের প্রাণ
ফুটবল বিশ্বকাপে গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উন্মাদনার কমতি নেই। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত না খেলতে পারলেও প্রতি চার বছর পরপর এ দেশের মানুষ বিশ্বকাপকে বরণ করে নেয় পরম ভালোবাসায়। তাইতো ছোট থেকে বড় প্রায় সবারই কোনো না কোনো প্রিয় দল আছেই বিশ্বকাপে। এ জন্য প্রিয় দল নিয়ে ভক্তদের কত উন্মাদনা আমরা টিভি, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দেখতে পাই। প্রিয় দল গোল করলে ও জিতলে ভক্তদের ব্যাপক উল্লাস পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রায় সব স্তরে।
গত ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের পর্দা নামবে আর কয়েক দিন পরেই আগামী ২০ তারিখে। তবে এক মাসের বেশি সময়ের এই টুর্নামেন্টে প্রিয় দলকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আবেগের বাধাহীন বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। প্রিয় দল বলতে বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ভক্তদের যেমন ছড়াছড়ি, তেমনি রয়েছে জার্মানি-পর্তুগাল-স্পেনসহ আরও কয়েকটি দেশের ভক্ত। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, সংখ্যার বিচারে এ দেশে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার ভক্তরা এগিয়ে থাকলেও নেইমারের ব্রাজিলের ভক্তরাও পিছিয়ে নেই। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা উভয় দলের ভক্তদের বেশ কিছু শোভাযাত্রা দেখা গেছে। দেশের শহরাঞ্চলগুলো থেকে শুরু করে প্রায় সব মফস্সল-গ্রামাঞ্চলে ছেয়ে গেছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকায়। পিছিয়ে নেই জার্মানির ভক্তরাও, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নিউজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে জার্মান ভক্তদের কয়েকটি অনুষ্ঠান ও র্যালির খবর। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার তুলনায় কম হলেও জামাল মুসিয়ালার জার্মানির পতাকা দেখা গেছে দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই। তাইতো ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতদের মতো জার্মানির রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশি জার্মান ফুটবল ভক্তদের ভালোবাসা দেখে ভক্তদের উদ্দেশে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছেন। তা ছাড়া আগের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় এবার পর্তুগালের সমর্থকদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ বলে তাঁর অনেক ভক্তকেই দেখা গেছে পর্তুগালের পতাকা-জার্সি-র্যালি করে তাদের সমর্থন জানান দিতে। এ ছাড়া ইরান, মরক্কো, স্পেন, ফ্রান্স, সৌদি আরব, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর সমর্থকদেরও দেখা গেছে ফুটবল উন্মাদনায় শামিল হতে। পাশাপাশি আর্জেন্টিনা, নরওয়েসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতকে দেখা গেছে উন্মুক্ত স্থানে সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে বিশ্বকাপের খেলা উপভোগ করতে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের সময়টাতে চলছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রিয় দলের খেলা দেখার পাশাপাশি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের খেলার দিনে তাদের প্রতিপক্ষকে সমর্থন দেওয়া—এসবই ভক্তদের উন্মাদনার অংশ। মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে, কেইন নাকি হলান্ড—কে এগিয়ে আছে তা নিয়ে ভক্তদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও যুক্তিতর্কের যেন শেষ নেই।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোতে বড় পর্দার পাশাপাশি অধিকাংশ স্থানেই প্রিয় খেলা দেখতে ভক্তদের ব্যাপক সমাগম ফুটে উঠছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বুয়েট, নর্থসাউথ, ব্র্যাক, আইইউবিসহ দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দেখা গেছে প্রিয় দলের পতাকা ওড়াতে, ফ্ল্যাশমব এবং বড় স্ক্রিনে খেলা উপভোগ করতে। গ্রাম-শহরের বড়-ছোট মাঠে শিশু-কিশোর-যুবক, এমনকি মধ্যবয়স্ক মানুষগুলোকেও দেখা যাচ্ছে ফুটবল খেলতে। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপের সময়টাতেই মানুষ যেন মেতে ওঠে ফুটবলের উন্মাদনায়। একটি ছোট শিশু যেমন পেছনে মেসির নাম লেখা জার্সি পরে ফুটবল খেলছে, তেমনি রোনালদোর নাম লেখা জার্সিতে ফুটবল মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন কোনো যুবক। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে এক কিশোর গোল করে সবাইকে দেখাচ্ছে তার জার্সির পেছনে নেইমারের নাম। সবাই নিজেদের আইডলদের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য মেসি-রোনালদো-নেইমারদের খেলা দেখে বড় হওয়া এক প্রজন্ম হয়তো বুঝে গেছে, এটাই তাদের আইডলদের শেষ বিশ্বকাপ। তাই অনেক ফুটবল ভক্তই তাদের আইডলদের শেষ বিশ্বকাপ নিয়ে আবেগাপ্লুত বলা যায়। যদিও নতুন প্রজন্মের আইডল হিসেবে এমবাপ্পে, হলান্ড, ইয়ামাল, বেলিংহামদের কথাও উঠে আসছে।
সবশেষে একটাই কথা, বিশ্বকাপ যে দলই জিতুক—দিনশেষে জয় হোক ফুটবলের, ভক্তদের। সবাই উৎসব করুক নিজেদের প্রিয় দলের জয়ের খুশিতে। আর ফুটবল প্রিয় কোটি কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশও অচিরেই একদিন ফুটবল বিশ্বকাপ খেলুক—সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
*লেখক: তাওহীদ জানান অভিক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]