আর মিকি ওয়াতানাবের যেন একসঙ্গে দুই কাজ হলো। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের দেওয়া ‘ধন্যবাদ’ জীবনের এক বড় প্রাপ্তি। সেই লক্ষেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নার্সিং কেয়ার হোম, বৃদ্ধদের জন্য ক্যাটারিং সার্ভিস, কৃষিখামারসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘স্কুল এইড জাপান’ কর্তৃক নেপাল ও কম্বোডিয়ায় পরিচালিত হয় অসংখ্য স্কুল। জীবনে সংগ্রাম করে বড় হওয়া মিকি ওয়াতানাবে যেন সব শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বোনা আর স্বপ্ন পূরণের পথ দেখানোর এক আদর্শ পথপ্রদর্শক।

তাঁরই পরিচালনায় ও জাপানের ‘ইকুবুনকান ইউমে গাকুয়েন’–এর এক শিক্ষক কাৎসুশি ফুরুসাওয়ার নির্দেশনায় স্বপ্নের স্কুল এগিয়ে যেতে লাগল। এ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রিন্সিপাল কাৎসুশি ফুরুসাওয়ার ত্যাগটাও অনেক। দশ-দশটা বছর তাঁকে বাংলাদেশে থাকতে হয়েছে। আর এর ফলাফলটাও চমৎকার। ১০ বছর আগেকার টিনশেড ভবনের সেই ছোট্ট স্কুল আজ বিশাল এক খেলার মাঠ, ইনডোরসহ পাঁচতলা ভবন নিয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।

এখানেও ‘ইকুবুনকান ইউমে গাকুয়েন’–এর মতো স্বপ্নজয়ী মানুষেরা আসেন তাঁদের স্বপ্ন পূরণের কথা বলতে আর শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে। স্কুলে ঢুকতেই ‘ড্রিম স্পিকারদের’ যে বোর্ডটি চোখে পড়ে, তাতে দেখা যায়, সাংবাদিক ও কৃষি উন্নয়নকর্মী শাইখ সিরাজ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত, সাহিত্যিক ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকসহ আরও অনেক সুপরিচিত ব্যক্তিদের, যাঁরা এই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে এসে অবাক হয়েছেন এত সুন্দর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখে।

আনিসুল হকের সরল স্বীকারোক্তি এই প্রতিষ্ঠানের জন্য এক বড় প্রাপ্তি। তিনি বললেন, ‘কিআর সম্পাদক হওয়ার কারণে আমাকে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। জাপানি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এত সুন্দর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সত্যিই আমি এর আগে দেখিনি।’ ইনডোর উদ্বোধনকালে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এখানে না এলে আমি জানতামই না, আমাদের দেশে এত সুন্দর একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে।’

এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে, স্বপ্ন অন্বেষণ করতে এবং স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করা। স্বপ্নের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাক—এ প্রত্যাশা এখানকার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্য সবার। আর এই একাগ্রতা দেখেই কিছুদিন আগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোল্লা নজরুল ইসলাম আশা ব্যক্ত করলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান আছে বলেই আমরা তাহলে আশা করতে পারি, কয়েক বছর পরে এখানকার প্রত্যেক শিক্ষার্থী একেকজন জাপানিজ হয়ে বের হবে।’

এই প্রতিষ্ঠানের ক্রীড়া উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটাও যেন শিক্ষণীয় এবং একটু ভিন্ন ধাঁচের। এই দুই অনুষ্ঠানে কোনো ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা থাকে না। সবাই মিলে কীভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়, তারই এক শিক্ষাক্ষেত্র যেন এখানকার ক্রীড়া উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিবছরই জাপান এবং বাংলাদেশের শিল্পী, কলাকুশলীদের অংশগ্রহণে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় ড্রিম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইনডোর স্টেডিয়ামে। এ যেন স্বপ্নকে ছোঁয়ার লক্ষ্যে জাপান বাংলাদেশের সংস্কৃতি মিলে এক মহোৎসব। সুযোগ পেলে মিকি ওয়াতানাবেও হাজির হন এই উৎসবে।

এখানকার প্রত্যেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন ডায়েরি লেখে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে প্রতিদিনই সামনে এগিয়ে যেতে থাকে স্বপ্ন পূরণের নিমিত্তে। জাপানের টোকিওর ইকুবুনকান উচ্চবিদ্যালয়ের নিয়মকানুন ও পরিচালনাপদ্ধতি অনুসারে জাতীয় পাঠ্যক্রম এবং অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, সংগীত, জাপানি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে এবং মহাত্মা মিকি ওয়াতানাবের অভিভাবকত্বেই এগিয়ে চলছে ড্রিম স্কুলের শিক্ষার্থীরা। জাপান থেকে প্রায় তিন হাজার মাইল দূরে গড়ে ওঠা ড্রিম স্কুল যেন বাংলাদেশের বুকে এক টুকরা জাপান।

লেখক: প্রভাষক, জাপান ইন্টারন্যাশনাল ড্রিম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গাজীপুর।