২৬ জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী প্রত্যাশা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে ভোটারদের লাইনফাইল ছবি

দেশের সর্বস্তরের নাগরিকের সরাসরি ভোটে নবনির্বাচিত সব সংসদ সদস্যকে অভিনন্দন! রাজনৈতিক দল হিসেবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। এই দলের প্রতিও রইল অনেক অভিনন্দন ও শুভকামনা। বিগত পতিত সরকারের ১৭ বছর ধরে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই দলটি গেছে, সেটি অমানবিক। সেই ব্যথা ভুলে, বিশাল হৃদয় নিয়ে সম্প্রীতির ও সুন্দর প্রতিযোগিতার রাজনীতি করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গলই বয়ে নিয়ে আসবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কারণ, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি করলে নিজেকেই নিশ্চিহ্ন করার রাস্তা প্রস্তুত করা হয় এবং একটা সময় পর সেটি সম্পন্নও হয়। আওয়ামী লীগ এর খুবই জ্বলন্ত এবং এখনো টাটকা একটি উদাহরণ। আমার ধারণা, বিষয়টি বিএনপি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। সে জন্যই তারা নির্বাচনী ইশতেহারে ও নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন রাজনীতির কথা বারবার ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একটি অঙ্গীকার করেন, সেটা হলো—‘১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে জনগণের দিন, ইনশা আল্লাহ।’ নির্বাচনকালীন দলটির যে স্লোগান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, সেটাও সাধারণ জনগণের হৃদয়ে বিশাল প্রত্যাশার সঞ্চার করেছে। সবকিছু মিলে বিষয়গুলো যদি এমনই হয় বা তার কাছাকাছিও থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশে আশাজাগানিয়া রাজনীতির নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে। সেখানে অতীতের দুর্নীতিগ্রস্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও ঘৃণার রাজনীতির কোনো ঠাঁই নেই।

তবে যেসব প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে এ রকম রাজনীতি করা যাবে কি না, সেটিই একটি বড় প্রশ্ন। কারণ, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা সত্য যে আমরা দেশের সেরাদের, সেরা রাজনীতিবিদদের এই সংসদে পাচ্ছি না। কারণ, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের মনোনয়নপ্রক্রিয়া এবং মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ অনেকটাই বাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কিন্তু দেশের অস্থিতিশীল অবস্থার আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছিল। অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের প্রতি সাধারণ নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মনে সন্দেহ ও সংশয়ের যথেষ্ট কারণও ছিল। তাই প্রায় সবারই একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল—দ্রুত ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সেটা বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। এটা অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এ জন্য অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এই নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁদের প্রতিও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সব রাজনৈতিক নেতা ও দলকেই প্রমাণ করতে হবে যে তারা সৎ, যোগ্য এবং দেশের গণমানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। কারণ, অতীতের সংসদ সদস্যের অধিকাংশই প্রকৃত অর্থে সে রকম হয়ে উঠতে পারেননি। যা হয়ে উঠতে পেরেছেন, তা দেশের আপামর জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই সেগুলো গ্রহণ করবে না। অধিকন্তু, বিগত সরকারের লজ্জাজনক পতনের পর তরুণদের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছিল, তা অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে চরম হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে। তরুণেরা ‘মব সন্ত্রাস’ থেকে শুরু করে, চরম বৈষম্য, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির যে কুৎসিত চরিত্র জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, সেগুলো অকল্পনীয় ছিল। দেশের মানুষ সেগুলো ভুলে যায়নি। তারপরও ভালো বিকল্প না থাকায় একরকম বাধ্য হয়েই তারা আবার সেই তরুণদেরই সুযোগ দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তরুণ থেকে অগ্রজ—সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমার মনে হয়, এই বোধ বেশ ভালোভাবেই সবার মধ্যে হয়েছে।

পরিশেষে, দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা করতেই পারি, আগামীর বাংলাদেশ হবে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য অপার সম্ভাবনা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ। যেখানে থাকবে না কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং যেকোনো ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ড। সরকারদলীয় কিংবা বিরোধীদলীয়, নির্বাচিত অথবা অনির্বাচিত, দলমত-নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক নেতা যৌক্তিকভাবে একই সঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতা এবং সুন্দর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে দেশকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে পরিচালিত করবেন। আশা রাখি, শপথ নেওয়া নতুন সরকার তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা চর্চার মাধ্যমে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সর্বদা সৎ, নিবেদিত ও তৎপর থাকবে এবং ২৬-এর জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশকে শিক্ষায়, চিকিৎসায়, অর্থনীতিতে, পররাষ্ট্রনীতিতে, গবেষণায়, স্বাধীন বিচারব্যবস্থায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়, আইনশৃঙ্খলায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে, কৃষিতে, প্রযুক্তিতে, বিনিয়োগে, স্বাধীন গণমাধ্যমে, দারিদ্র্য নিরসনে ও সামাজিক সুরক্ষায়, নারীর ক্ষমতায়নে ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক উঁচুতে উন্নীত করবেন।

*লেখক: রিপন কিসকু নমেড, উন্নয়নকর্মী, রাজশাহী