বোনাস লাইফ
আমাদের যৌথ পরিবার। আমার আব্বা ও ফুফু। দুই ভাই–বোন। আরও দুই ভাই–বোন ছিলেন। গত শতকের বিশের দশকে কলেরায় ওনারা মারা যান। আব্বা ছোট। ফুফু বড়। আব্বার বয়স যখন তিন কি চার, তখন আমার দাদা মারা যান। বিশাল তালুকদারি তদারকি আমার দাদির পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই আমার ফুফুকে বিয়ে দিয়ে ফুফাকে ঘরজামাই হিসেবে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। গোটা সংসারের গৃহস্থালির দায়িত্ব ফুফার ওপর বর্তায়। তিনি আব্বাকে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য তাগিদ দেন। ফুফা আমৃত্যু আব্বাকে গৃহস্থালি কোনো কাজে সম্পৃক্ত করেননি। পরিণত বয়সে আব্বাকে বিয়ে করান। আমার মা শহুরে মেয়ে। গ্রামের সমাজ–সংস্কৃতি তখনো বোঝেন না। আমার দাদি ও ফুফুর কাছে সংসারের নানা কাজ শেখেন আর মনে মনে নিজের ঘর গোছানোর স্বপ্ন আঁকেন। তাই ব্যক্তিগতভাবে গরু–ছাগল, হাঁস–মুরগি পালনের কথাও ভাবেন। তখনকার সময় নিজের একটা গরু থাকা বা ছাগল থাকা বিরাট ব্যাপার। হাঁস-মুরগি পালনও শখের, আনন্দের এবং আর্থিকভাবে লাভবানও হওয়া যায়। ফলে পরিবার স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কেনাকাটা করতেও বেগ পেতে হয় না। যৌথ পরিবারে গরু, ছাগল, হাঁস মুরগি তো আছেই। এর বাইরে আমার ফুফুর ব্যক্তিগত ছাগল আছে, হাঁস-মুরগি আছে। ফুফুকে ব্যক্তিগত হাঁস-মুরগি পালন করতে দেখে আমার মা-ও আগ্রহী হন। তিনিও হাঁস–মুরগি পালন শুরু করলেন। মুরগির বাচ্চার খাবারের জন্য তেমন চিন্তা করতে হয় না। ঘরে-বাইরে ঘোরেফেরে, এটা-ওটা খায়। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। মা সারা দিন কাজে ব্যস্ত থাকেন। ভোর থেকে রাত অবধি। তাই হাঁসের বাচ্চার খাবার জোগাড় করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
যৌথ পরিবারে প্রতি বেলা ২৫-৩০ জন মানুষের রান্না করছেন মা। রান্না শেষে ৮–১০ কেজি ওজনের পাতিলের ভাতের মাড় গালতে মা বাঁকা হয়ে যেতেন। মায়ের সারা দিনের ক্লান্তি শেষে তাঁর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ দেখতাম। মায়ের কষ্ট দেখে আমার ছোট্ট মনে ভীষণ খারাপ লাগত। তখন আমি মায়ের কষ্ট লাঘব করার জন্য নিজ থেকেই ঘর ঝাড়ু দিতাম, আলনা গুছিয়ে রাখতাম, বিছানা ঝেড়ে দিতাম। মায়ের শতব্যস্ততার মাঝে কানে কানে গিয়ে বলতাম, মা, আমি এটা-ওটা করেছি। মা খুশি হতেন।
দিন শেষে কখনো কখনো মাকে বলতে শুনতাম, ‘আহা রে! আজ সারা দিন হাঁসের বাচ্চাগুলোর দিকে খেয়াল দিতে পারিনি। কী খেলো, কী না খেলো।’ আমি তখন ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়ছি। মায়ের কথাগুলো আমার ভেতরটা নাড়া দিত। আমি তখন সুযোগ পেলেই হাঁসের বাচ্চাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করি। ছোট ছোট কচুরিপানা, শামুক, ডানকিনে মাছ ইত্যাদি। উদ্দেশ্য মাকে খুশি করা।
সময়টা বর্ষার শেষ। শরতের শুরু। আমাদের বাড়ির আশপাশের নিচু জায়গাগুলোতে তখন কাদা আর পানির মাখামাখি। এমনই একদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে আমি সেখানে গেলাম। ছুটে চলা মাছগুলো ধরতে এক পাশে কাদার বাঁধ দিয়ে পানি সেচ দিলাম। তারপর মাছ আর শামুক নিয়ে যখন ঘরে ফিরি, তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। এদিকে মায়ের ডাক, রাত হয়ে যাচ্ছে আমি কোথায়! হাত–মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হবে। উল্লেখ্য, আমাদের বাড়ির আশপাশে একসময় ঝোপজঙ্গলে ঠাসা ছিল। বিষধর সাপের উপদ্রবও খুব বেশি ছিল। ঘরে ফিরেছি। হাত–মুখ ধুয়ে পড়তেও বসেছি। রাত নয়টায় খাবার খেয়েছি। রাত দশটায় ঘুমিয়ে গেছি।
আব্বা শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সমাজসংস্কারক ছিলেন। খুব সম্ভবত আব্বা তখন নাঙ্গলকোট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। অথবা নাঙ্গলকোট বাজার কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি একটু রাত করেই বাড়ি ফিরতেন। সেদিনও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আব্বা গভীর রাতে বাড়ি ফিরলেন। গোটা বাড়ি গভীর ঘুমে নিমগ্ন। বাড়ির অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাতে আব্বা সাইকেলের বেল না বাজিয়ে মাকে মৃদুস্বরে ডেকে তুললেন। মা প্রতিদিনের মতো দরজা খুলে দিলেন। আব্বা সাইকেল ঘরে তুলে রাখলেন। মাকে হাত–মুখ ধোয়ার পানি দিতে বললেন। অন্য দিন মা অন্ধকারেই মাটির কলসি থেকে জগে পানি ঢেলে আব্বাকে দিতেন। সেদিন মায়ের গা ভার ভার লাগছিল। তাই মা আব্বাকে বললেন টর্চ জ্বালাতে। টর্চের আলোতে কী যেন চিকচিক করে উঠল কলসির পাশে। ঘরের ভেতরের বেড়ার ওপাশে আমি ঘুমিয়ে, এপাশে কলসির সঙ্গে সাপ প্যাঁচানো। রাগে ফুঁসে থাকা সাপ। মা সাপ বলে চিৎকার করে উঠলেন; কিন্তু সাপ নড়ছে না। গোটা বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। পাশের বাড়ি থেকে লোকজন এলেন। আমাদের বাড়ির সবাই তো আছেনই। সাপ সরছে না। সবাই চিন্তিত। আমি অঘোর ঘুমে। আমাকে জাগাচ্ছেন না। সাপ কলসির পাশ দিয়ে ঘরের কাঠের দরজার নিচ দিয়ে ঢুকে আমার বালিশের পেছন দিক দিয়ে চেষ্টা করছে বালিশ সরিয়ে চৌকিতে ওঠার। কিন্তু বালিশ বেড়ার সঙ্গে এমন শক্তভাবে লেগে ছিল যে সাপ চৌকিতে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়ে যায়। সবার মধ্যে ভীষণ টেনশন কাজ করছিল। কীভাবে সাপ মারা যায়। সব ভাবনাচিন্তার মধ্যেই পাশের বাড়ির লতিফ চাচা একটা লাঠি দিয়ে এত জোরে কলসির ওপর দিয়ে সাপকে আঘাত করেন যে কলসি ভেঙে সারা ঘর পানিতে ভেসে যায় এবং সাপও নিচে মাথা নামায়। এরপর টেনে বের করে আমাদের বাড়ির উঠানে রাখেন। কয়েক হাত লম্বা সাপ। রাতে আর আমাকে কেউ জাগাননি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই আমাকে নিয়ে বসলেন। আমি কোথায় কোথায় গিয়েছি সেই খবর নিলেন। তারপর বুঝতে পারলেন, আমার সেই সন্ধ্যাবেলার শামুক কুড়ানো জায়গায় সাপকে ব্যথা দিয়ে এসেছি। সেই রাগে আমাদের ঘরে ঢুকে আমাকে কামড় দিতে এসেছে হয়তো। আমার আব্বার দেরিতে ঘরে ফেরা এবং মা আলো জ্বালিয়ে পানি ঢালতে যাওয়ায়, মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় আজ থেকে ৫০ বছর আগে মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছি। মহান আল্লাহর প্রতি সেই কৃতজ্ঞতা আছে, থাকবে আমৃত্যু। তাই আমি মনে করি, আজকের এই আমি বোনাস লাইফেই আছি।
লেখক: ড. শামসুদ্দীন শিশির, শিক্ষক প্রশিক্ষক