বিশ্বকাপ ফুটবল ও স্কুল পরীক্ষা
আমার বয়স ৫৮, বুড়ো হয়ে গেছি-ই বটে। ছাত্রজীবন ও যৌবনকালের অনেক শখ-আহ্লাদ মৃতপ্রায়। নিজ ও পরিবারের প্রয়োজনে যখন-তখন কোনো জায়গায় যেতে মনের ওপর আঘাত আসে না। যেমন ধরি, আজ টিভিতে যদি প্রতিপক্ষ হয়ে নেইমার আর মেসির খেলা হয়, সেই খেলা পরিহার করে আমি আমার প্রয়োজন জায়গায় চলে যেতে পারব। সেই শক্তির মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে, যা একজন স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে হওয়ার কথা নয়।
আমি তখন প্রাইমারিতে পড়ি। শুনতে পারলাম টিভিতে মোহাম্মদ আলী ক্লে ও লিওন স্পিন্কসের মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হবে, যা সরাসরি বিটিভিতে প্রচার করবে। তখন টিভি কজনের ছিল। আমার স্কুল থেকে এক কিলোমিটার দূরে সব্দালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সবার প্রিয় ও পছন্দের মানুষ মরহুম আবদুস সাত্তার মোল্লা স্যার। তিনি সেই স্কুলে একটা টিভির ব্যবস্থা করেছেন খেলা দেখার জন্য। ১৪ ইঞ্চি, সাদাকালো টিভি। তাঁর সততার গুণে সরকার কর্তৃক পুরস্কার পাওয়া টিভি।
যা–ই হোক, বাতিকওয়ালাদের মধ্যে আমিও একজন, দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেলাম মুষ্টিযুদ্ধ দেখতে। লোকে লোকারণ্য। ছোট মানুষ, ধাক্কাধাক্কি সামলাতে পারি নাই তখন। ভিড়ে খেলা দেখতে পেরেছিলাম না, টিভিও না। তবে একটা বাঁশের মাথায় একটা অ্যানটেনা দেখেছিলাম। কেউ কেউ আমাকে বলেছিল, অ্যানটেনা দিয়ে তার বেঁয়ে মানুষ টিভিতে যায়। তাই শুনে বড় বড় চোখ করে চেয়ে ছিলাম অ্যানটেনার দিকে। মানুষ আর নামে না। মাঝেমধ্যে মানুষের ভিড় থেকে আনন্দ–উল্লাসে শুনতে পাই। তখন মনে করি, এই বুঝি কেউ এল। আশা সঞ্চয় হতে থাকে। পলক নড়ে না।
হঠাৎ ভিড় ভেঙে গেল। মানুষ যার যার বাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। আমি টিভির দিকে এগিয়ে গেলাম। শুনি খেলা শেষ। মনের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হলো অনেক। কখন তারা এল? কখন গেল? আমি তো আসা যাওয়া দেখতে পেলাম না? একটু দূরে তাকিয়ে দেখি একজন মানুষ। গায়ে কাদামাটি, বেশ মোটাসোটা, কালোও কম না, লুঙ্গি মালকাছা দেওয়া। আমার বুঝতে আর বাকি রইল না। এই সেই মোহাম্মদ আলী ক্লে, আজ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ইনি তাহলে অ্যানটিনা দিয়ে টিভিতে এসেছে, যা আমার চোখে পড়েনি।
আমার চোখ এমনই। দাদি একবার ছাগল পাহারা দিতে বলে পান খেতে গেল। ফিরে এসে দেখে ছাগল নেই। কে নিল? আমি দেখি নাই, আমার চোখও দেখে নাই। ঠিক তেমনই আমার চোখ ক্লেকে আসাও দেখেনি।
তবু বীর বাহাদুরের মতো ফুর্তিতে বাড়ি ফিরলাম। স্কুল ফাঁকি দিয়ে অ্যানটেনা দেখে এলাম। মা পান্তা ভাত আর কাঁঠাল খেতে দিল। ফুর্তির আবেগ এতোই গাড় ছিল যে পান্তা ভাত খেতে গরম রোস্ট পোলাওয়ের মতো লাগছিল। খাচ্ছি আর মাকে গল্প শুনচ্ছি। মুষ্টিযুদ্ধ, মোহাম্মদ আলী ক্লে, টিভি, অ্যানটেনা দেখে এলাম। অ্যানটেনা দিয়ে খেলোয়াড় টিভিতে নেমে এল তা–ও দেখলাম। মা বুঝতে পারে নাই যে আমি সত্যি কথার ধারের কাছে না গেলেও মিথ্যা কথা বলছি সের সের। মা গল্প শুনে অবাক। দুনিয়ায় নতুন কিছু এল, তাদের সময় এসব ছিল না, এমন আফসোসই জানান দিল আমার মা।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এমন গল্প আমার বাড়ির আশ পাশের বন্ধুদের নিকট বলেছিলাম। আমার টিভি দেখার গল্প চারদিকে ছড়িয়ে গেল। কিছুদিন আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতো অনেকেই। গল্প শুনতেও আসতো কেউ কেউ।
তারপর স্কুলজীবনে খেলাধুলা নিয়ে কি না করেছি। ফুটবল, হাডুডু, ক্রিকেট, কানামাছি, উতো-বুতো এমন সব খেলায় অংশ গ্রহণ করেছি। বোদ বৃষ্টিকে তোয়াক্কা করিনি। টিভিতে খেলা হলে মিস করিনি। বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটেই ছিল না। তবু প্রয়োজনটা ছাড়াও আরও একটা রিজার্ভ ব্যাটারির ব্যবস্থা থাকত। স্কুলজীবন ছিল বলেই হয়তো এমন বাতিক ছিল। সংসার বা কর্মজীবন এসে গেলে বয়সের তালেতালে তাল মিলিয়ে সেই সব বাতিক জীবন হারাতে থাকে।
দেশে আজ ১ জুলাই থেকে শুরু হলো বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অন্যদিকে বলছে বিশ্বকাপ ফুটবল। আমাদের দেশে রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত খেলা চলে। বড় বড় পর্দা, রঙিন টিভি চারদিকে ছড়াছড়ি, প্রজেক্টরও বেশ কয়েকটি পাড়ায় পাড়ায় দেখা যায়। খেলা চলছে। দর্শকদের হইহল্লা তো আছেই। চানাচুর মুড়ি চা চলছে, মাঝেমধ্যে খিচুড়ি। চারদিকে উৎসব। এটা তো বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎসব, যা চার বছর পর পর আসে। ডা হলে এত বড় উৎসবের মধ্যে ক্লাসের মধ্য পরীক্ষা কেন?
পরীক্ষাটি কি ফুটবল উৎসব শুরু হওয়ার আগে শেষ করা যেত না? তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? পড়াশোনার টেবিলে মন বসানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য। মেসির ভক্তরা মেসির খেলা না দেখে থাকতে পারে না। থাকলেও তাদের মনে কতটা আঘাত নিয়ে থাকতে হয়, তা অন্যদের জানার কথা নয়। ঠিক তেমনি আছে রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পেসহ অনেক ভক্তরা।
চার বছর পরপর দিন–দুনিয়ার সর্ববৃহৎ উৎসবটি আসে। এমন অনেক খেলোয়াড় আছে, যাদের খেলা এই আসরের পর আর দেখা যাবে না। এমনো শোনা যাচ্ছে, কোনো এক মেসি ভক্ত নাকি বলেছে যে, মেসি খেলার দিন সে পরীক্ষা দিতেই যাবে না। তার যুক্তি পরীক্ষা পরে দেওয়া যাবে। কিন্তু মেসির খেলা আর দেখা যাবে না। তাহলে কয়েক দিনের জন্য এই সমস্ত কোমলমতি শিশুদের মস্তিষ্কে বা মনে এত বড় আঘাত না দিলেও তো চলে। পরীক্ষাটা খেলা শুরু হওয়ার আগেই শেষ করা হলে কি বেশি ক্ষতি হয়ে যেত?
*লেখক মাহফুজার রহমান, শ্রীপুর, মাগুরা