কুমিল্লার অভিশাপ জলাবদ্ধতা, সমাধানের নাগরিক ভাবনা

প্লাস্টিকের নৌকায় এইচএসসি পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা। গতকাল কুমিল্লায়ছবি: প্রথম আলো

নাগরিক–৩

সেকশন: , নাগরিক সংবাদ

ট্যাগ: , , , , , ,

ছবি:

মেটা ও এক্সসার্প্ট:

ব্লার্ব:

১৪ জুলাই প্রথম আলো পত্রিকায় পড়েছি, কুমিল্লায় জলাবদ্ধতা: পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের জন্য দুঃখপ্রকাশ শিক্ষা বোর্ডের। (প্রথম আলো: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/jfgggoml22) আধুনিক নাগরিক সভ্যতার অন্যতম বড় অনুষঙ্গ হওয়ার কথা ছিল পরিকল্পিত এবং স্বস্তিদায়ক জীবনযাত্রা। কিন্তু বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের প্রায় সবকটি বিভাগীয় শহর এবং উপশহরের বাসিন্দাদের কাছে বর্ষা মানেই এক আতঙ্কের নাম। আমার নিজের শহর কুমিল্লা। এখানে সামান্য বৃষ্টি হলেই বুক দুরুদুরু করে ওঠে নগরবাসীর। মনে ভিড় করে হাজারো প্রশ্ন—বাইরে পানির গভীরতা কতটুকু হলো? রাস্তা দিয়ে নিরাপদে হেঁটে বাড়ি ফেরা যাবে তো? খোলা ম্যানহোল বা ডোবায় পড়ে কোনো পথচারী কিংবা শিশুর প্রাণহানি ঘটবে না তো? বিদ্যুতের খুঁটি থেকে লিক হওয়া পানিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না তো? বহুতল ভবনের নিচতলায় পানি ঢুকে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না তো? এই প্রশ্নগুলো কোনো কাল্পনিক ভীতি নয়, প্রতি বর্ষায় এ দেশের কোটি মানুষের রূঢ় বাস্তবতার প্রতিফলন।

পর্যাপ্ত বৃষ্টি যেকোনো দেশের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও, আমাদের দূরদর্শিতার অভাব ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তা আজ মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন অল্প সময়ে তীব্র বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকায় মাত্র ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা কয়েক ঘণ্টার জন্য জলমগ্ন হয়ে পড়ে। আর বৃষ্টি যদি ১০০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে যায়, তবে সেই দুর্ভোগ স্থায়ী হয় কয়েক দিন পর্যন্ত। এই চিত্র শুধু ঢাকার নয়; চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, সিলেট কিংবা কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরের উপশহরের বাসিন্দারাও আজ এই একই কষ্টের অংশীদার।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কুমিল্লায় সংকটের মূলে যে কারণগুলো

জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি মূলত মানবসৃষ্ট এবং কাঠামোগত ত্রুটির ফসল। এর পেছনের প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামগ্রিক খামখেয়ালিপনার এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে:

ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা ও নির্মাণ ত্রুটি: কুমিল্লাসহ আমাদের দেশের বিভিন্ন শহরগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল এবং জরাজীর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে ড্রেনগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সরু। ফলে অতিরিক্ত পানির চাপ নেওয়ার ক্ষমতা এগুলোর নেই। এর ওপর অপরিকল্পিতভাবে বক্স কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আইন অমান্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব: সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনকানুন মানার ক্ষেত্রে তীব্র অনীহা দেখা যায়। যত্রতত্র প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে ড্রেন ও নালাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বাসাবাড়ির কিচেনের বর্জ্য এবং শুকনা মৌসুমে মানব মলমূত্র জমে ড্রেনের তলদেশ ভরাট হয়ে থাকে। আমি নিজে কুমিল্লা শহরে এসব দেখে আসছি অনেক বছর ধরে। কোনো নাগরিক সচেতনতা নেই।

ব্যবসায়িক ও শিল্প বর্জ্য: কুমিল্লাসহ বিভিন্ন শহরের আশপাশে দেখা যায় পোলট্রি ফার্মের মুরগির মলমূত্র, বাজারের মাছের উচ্ছিষ্ট এবং বিভিন্ন ছোট-বড় কারখানার অপরিশোধিত ময়লা সরাসরি নালায় ফেলার কারণে পানি চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

নির্মাণসামগ্রীর অব্যবস্থাপনা: শহরজুড়ে প্রতিনিয়ত বহুতল ভবন নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। কিন্তু নির্মাণাধীন এসব ভবনের ইট, বালু ও সিমেন্ট রাস্তার ওপর উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই এই বালু ও সিমেন্ট ধুয়ে গিয়ে ড্রেনের ভেতরে জমাট বেঁধে কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে যায়।

প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল দখল: একটি আদর্শ শহরের অন্তত ১০ থেকে ১২ শতাংশ জলাভূমি বা খাল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের নদী ও খালগুলো আজ দখলদারদের কবলে। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গাসহ অন্যান্য নদী আজ দূষণ আর দখলে মৃতপ্রায়। শহরের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক খাল ও জলাশয়গুলো ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলা হয়েছে।

সমন্বয়হীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম এলেই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব শুরু হয়, যা জলাবদ্ধতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া সড়ক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের নিয়মিত তদারকি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের গাফিলতি তো রয়েছেই।

টেকসই সমাধানের উপায়গুলো

কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার নরকযন্ত্রণার সমাধান কিন্তু অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা।

প্রথমত, আমাদের বর্জ্য ফেলার অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা নিশ্চিত করতে হবে এবং যত্রতত্র ময়লা ফেললে কঠোর জরিমানার আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে শহরগুলোয় অন্তত ৬ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের প্রশস্ত ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের বালু, ইট ও সিমেন্ট নির্দিষ্ট উপায়ে ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন তা ড্রেনে গিয়ে না জমে। চতুর্থত, রাজউক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে শহরের প্রতিটি প্রাকৃতিক খাল ও জলাশয় অবিলম্বে দখলমুক্ত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বর্ষা মৌসুমে নতুন করে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির অনুমতি দেওয়া যাবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, শুধু সরকারি উদ্যোগের দিকে চেয়ে থাকলে হবে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সচেতনতা বাড়াতে হবে। নিয়ম মেনে চলাই হবে জলাবদ্ধতা নিরসনের একমাত্র প্রধান হাতিয়ার। যে যে কারণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে তার প্রতিটি কারণকে চিহ্নিত করে তার প্রতিকার করলেই এই চিরস্থায়ী ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আমরা যদি নিজেদের চারপাশটা পরিষ্কার না রাখি এবং সরকারি ড্রেন বা খালগুলোকে ডাস্টবিন মনে করি, তবে এই অভিশাপ থেকে কোনো দিন মুক্তি মিলবে না। বহুতল ভবন মালিকদের সচেতন হতে হবে যেন তাদের বালি-সিমেন্ট ড্রেন নষ্ট না করে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং আমাদের নিজেদের নিয়ম মেনে চলার মানসিকতাই পারে একটি পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধতামুক্ত সমাজ উপহার দিতে।

* লেখক: মো. ইউসুফ মিয়া (রনি), সামাজিক অধিকারকর্মী, শিবরামপুর, ৪নং ষোলনল ইউনিয়ন, বুড়িচং, কুমিল্লা