মাহারি ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন নকরেক এফসি
গারো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী মাহারি ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে নকরেক এফসি। টাঙ্গাইলের মধুপুরের ধরাটিতে দুই দিনব্যাপী (২৮ ও ২৯ আগস্ট ২০২৬) আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে সারা বাংলাদেশ থেকে গারো মাহারি বা পদবিভিত্তিক মোট ১৬টি শীর্ষ দল অংশ নেয়।
নকআউট পদ্ধতিতে পরিচালিত এই প্রতিযোগিতার ফাইনালে রাংসা মাহারিকে ১-০ গোলে পরাজিত করে নকরেক এফসি চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালের একমাত্র গোলটি করেন নকরেক এফসির অধিনায়ক অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর খেলোয়াড় কমল নকরেক। নকরেক এফসিতে খেলার জন্য নৌবাহিনী, আর্মি ও পুলিশ দলের খেলোয়াড়ও অংশ নিয়েছিলেন। এই জয়ের মাধ্যমে ২০২৬ সালে গারো জনগোষ্ঠীর সেরা ফুটবল দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে নকরেক এফসি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
টুর্নামেন্টটির আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করেন অবিনাশ নকরেক। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজনটির নামকরণ করা হয় ‘সুরেশ কুবি মাহারি ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬’।
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল কুবি, যেত্রা, দফো, দিব্রা, নকরেক, রাংসা, সিমসাং, চিরান, মৃ, মান্দা, হাগিদক, মাজি, দালবত, চাম্বুগং, আতিওয়ারা ও মাংসাং মাহারি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব দল অংশ নিয়ে টুর্নামেন্টকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে এবং গারো জনগোষ্ঠীর ফুটবলপ্রতিভার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত করে। কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল দর্শক গ্যালারি। স্থানীয় লোকজন বলেন, মাহারি ফুটবল টুর্নামেন্ট এখন গারোদের সর্ববৃহৎ মিলনমেলা বলা যায়।
প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করা দফো মাহারি টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে সবার নজর কাড়ে। নকরেক এফসির সঙ্গেও তাদের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচগুলোর মধ্যে ছিল মৃ বনাম নকরেক এবং রাংসা বনাম নকরেক দলের লড়াই।
ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় (ম্যান অব দ্য ফাইনাল) নির্বাচিত হন নকরেক এফসির অধিনায়ক কমল নকরেক। আর পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান উদয় নকরেক (‘মিনি ইয়ামাল’খ্যাত)।
চ্যাম্পিয়ন নকরেক এফসিকে দেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা ও ট্রফি। রানারআপ রাংসা মাহারি পায় ৩০ হাজার টাকা ও ট্রফি। উল্লেখ্য, রাংসা মাহারির প্রায় সব খেলোয়াড় অংশ নিতে আসেন বিরিশিরি নেত্রকোনা থেকে। তারা চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও তাদের টিম স্পিরিট দর্শকের মন জয় করেছে।
দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকা জেমস মাংসাং বলেন, ‘এত সুন্দর মাঠ, আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এমন সুন্দর একটি আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’
আয়োজক ধরাটি একতা ক্লাবের আহ্বায়ক মর্নিংটন চিরান বলেন, জাতীয় নারী ফুটবল দলে মারিয়া মান্দা, শিউলি আজিমদের মতো খেলোয়াড়েরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমরা প্রত্যাশা করি, গারো জনগোষ্ঠীর পুরুষ ফুটবলাররাও একদিন জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পেয়ে দেশের ফুটবলে নেতৃত্ব দেবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসিনি। বরং সহযোগী হিসেবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র।’
পৃষ্ঠপোষক অবিনাশ নকরেক বলেন, ‘আপনারা সবাই কি খুশি? খুশি হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে।’
ঢাকা বিভাগ থেকে নতুন কুঁড়ি জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়ন নাম্বিয়া নকরেক বলেন, ‘এমন আয়োজন সবাইকে একত্র করে। গারোদের এমন মিলনমেলা দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে।’
নকরেক আইটির সিইও সুবীর নকরেক বলেন, গারো জনগোষ্ঠী থেকে সেরা খেলোয়াড় বাছাই এবং ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে নিয়মিত এমন আয়োজন প্রয়োজন। শুধু বছরে একটি টুর্নামেন্ট নয়, বছরে ১০-১২টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা গেলে আরও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসবে। তিনি আরও বলেন, মাহারি ফুটবল টুর্নামেন্ট গারোদের মিলনমেলা হয়েছে ও ভালো খেলোয়াড় তৈরির দিকটি ইতিমধ্যে প্রমাণ দিয়েছে। এ আয়োজনের মাধ্যমে উদয় নকরেক, সকল দফো ও গিত্তেল মৃ, প্রিয় নকরেক, বীরবল নকরেক, মর্নিং সিমসাং জুনিয়র, পিয়াল হাগিদক, ঐতিহ্য হাগিদক, অম্লান চিরান, ইকো নকরেক, দিগন্ত নকরেক, রামিন মাংসাং, শংকর মাংসাং, শুভ রাংসা, অর্ঘ্য রাংসা, আদিত্য রাংসা, তুষার মাজি, অলিত মাজির মতো উদীয়মান খেলোয়াড়েরা নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বিশেষ কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। তবে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়ন নাম্বিয়া নকরেক, নকরেক আইটির সিইও সুবীর নকরেকসহ স্থানীয় ব্যক্তিরা।
টুর্নামেন্টটির উদ্বোধন করেন মধুপুর উপজেলা বিএনপি সভাপতি জাকির হোসেন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। গারো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গ্রীকা, দামা রাং আদুরীর তালে উৎসবে মেতে ওঠেন সব পেশাজীবীর মানুষ এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খেলোয়াড় ও অতিথিদের জন্য ধরাতি ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম মমিনপুর মানক (নিজ মাহারি/পদবি) বাড়িতে থাকা খাওয়ার আয়োজন করা হয়। মধুপুর ধরাতি গ্রামের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে হালুয়াঘাট ও ঝিনাইগাতী মরিয়ম নগরের তরুণেরা উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেন।
ফাইনাল পুরস্কার বিতরণের আগেও জমজমাট নৃত্য ও ফাইনালিস্ট দুই দলের মাঠে নিজ মাহারির স্লোগান ও মাঠ প্রদক্ষিণে পুরো ফাইনাল উৎসবে পরিণত হয়।
আয়োজকদের মতে, সুরেশ কুবি মাহারি ফুটবল টুর্নামেন্ট শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি গারো জনগোষ্ঠীর ঐক্য, সংস্কৃতি ও নতুন প্রজন্মের প্রতিভা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে।