একতরফা তালাকে নারীদের ভোগান্তি: প্রয়োজন সময়োপযোগী ও সামগ্রিক আইনি সুরক্ষা
বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় একজন মুসলিম পুরুষ চাইলেই কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। একে মুসলিম আইনের পরিভাষায় তালাক বলা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে বিধান হলো তালাক প্রদানে ইচ্ছুক ব্যক্তি বিধিমোতাবেক তালাক রেজিস্ট্রি করবেন এবং তালাকের একটি নোটিশ চেয়ারম্যান বরাবর পাঠাবেন, যেন চেয়ারম্যান তাঁদের উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করতে পারে। তবে সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করা না গেলেও চেয়ারম্যান কর্তৃক নোটিশ গ্রহণের তারিখ থেকে তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে তালাকটি কার্যকর হয়ে যাবে। (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ধারা ৭)। বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় মুসলিম নারীর সরাসরি নিজে থেকে বিবাহবিচ্ছেদের বিধান নেই। একজন মুসলিম নারী নিজে থেকে তখনই বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারবেন, যখন তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক প্রদান করার ক্ষমতা অর্পণ করে থাকবেন। অথবা মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯–এর বিধান অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এখন বেশির ভাগ বিয়ের কাবিননামা প্রস্তুত করার সময়ই কাগজে–কলমে এই ক্ষমতা অর্পণ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ দেখা যায়, বাস্তবিকভাবে নারীরাও চাইলে বর্তমানে যেকোনো সময় তাঁর স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এই নিয়ন্ত্রণহীন একপ্রকার স্বেচ্ছাচারী, কোনো রকম জবাবদিহি ছাড়া প্রদান করা একতরফা তালাক সমাজে সৃষ্টি করছে নানাবিধ জটিলতা। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি বয়ে আনছে সীমাহীন ভোগান্তি।
৫৫ বছর বয়সী লতিফা বেগম (ছদ্মনাম) প্রায় ৩০ বছর ধরে সংসার করছেন। সংসারকালে তাঁর স্বামী তাঁকে প্রতিনিয়তই মারধর করেন। তাঁর স্বামীর বক্তব্য কাপড় ময়লা হলে যেমন মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করতে হয়, তেমনি স্ত্রীকেও মাঝেমধ্যে শাসন না করলে তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়, ব্যবহার উপযোগী রাখা সম্ভব নয় এবং তাঁর স্বতঃপ্রণোদিত স্বীকারোক্তি যে তিনি মাঝেমধ্যেই স্ত্রীকে মারধর করেন। ফরসা মানুষ, মোটা মানুষ, মারধর করলে জখম একটু দেখা যায়, এটাও স্বীকার করেন। এই ৫৫–৫৭ বছর বয়সেও তিনি হুমকি দেন যে স্ত্রীকে তালাক দেবেন। যদি সত্যি সত্যি তালাক দেন, তাহলে এই বয়সে লতিফা বেগম কোথায় যাবেন? উপায় না পেয়ে স্বামীর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি লিগ্যাল এইড অফিসে আসেন সমাধানের আশায়। যদি প্রকৃতপক্ষেই লতিফা বেগমের স্বামী তাঁকে তালাক দেন, তাহলে আমাদের প্রতিষ্ঠিত আইনি ব্যবস্থায় তিনি তাঁর ৩০ বছর আগের নির্ধারিত ১৫ হাজার টাকা মোহরানা প্রাপ্ত হবেন। জীবনের এতগুলো বছর বিনিয়োগ করার পর যখন আজ তিনি শূন্য, নিঃস্ব, তখন এই যৎসামান্য মোহরানার অর্থ প্রাপ্ত হয়েই তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অথচ শুধু স্বামী তালাক দিলেই নয়, বরং স্বামীর নির্যাতনের কারণে তিনি নিজেও যদি তালাক নিতে চান, তবু এ সংসারে তাঁর যে এত বছরের অবদান, তাঁর বর্তমান অবস্থা এসব বিষয় বিবেচনায় তাঁর ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি এবং আজীবন ভরণপোষণ পাওয়ার দাবি একটি মানবিক অধিকার। যদি এই অত্যাবশ্যকীয় আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা যেত, তবে অকারণে তালাক দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কেউ আমাদের নারীসমাজকে একটি নিরাপত্তাহীন জীবনের শঙ্কায় আতঙ্কিত করতে পারত না। শেষ জীবনে এসে তাঁরা এ রকম অসহায় হয়ে পড়ত না।
এ রকম আরেকজন নারী কুলসুম আক্তার (ছদ্মনাম)। তিনি ১৮ বছর ধরে সংসার করছেন, তাঁর এক ছেলে, দুই মেয়ে। তিনি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে তাঁর স্বামীকে বাড়ি নির্মাণ করার জন্য ১৮ লাখ টাকা দিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁর নামে ঋণ গ্রহণ করে বাড়ির কাজ করা হয়েছে। তাঁর সেই স্বামী এখন পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তাঁকে তালাক দিয়েছেন। বাচ্চাসহ কুলসুম এখন বাবার বাড়িতে অসহায় অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কুলসুম প্রতিকারের আশায় আদালতে আদালতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর মোহরানা ভরণপোষণ তো পায়ইনি, বাচ্চাদের ভরণপোষণ, তাঁদের লেখাপড়ার অনিশ্চয়তা, আবাসনের অনিশ্চয়তা, মাথার ওপর বিভিন্ন সংস্থার ঋণ, নিজের যা কিছু ছিল বিক্রি করে নিঃস্ব কুলসুম কার কাছে বিচার চাইবে, কত দিনে সে এসব সমস্যার সমাধানসহ ন্যায়বিচার পাবে? স্বপ্ন ছিল নিজেদের একটা বাড়ি হবে। স্বামীকে যা দেয়, তা কি কেউ কাগজপত্র করে দেয়? এগুলো সে কীভাবে প্রমাণ করবে? সে কি জানত, ভাগ্য তাঁর সঙ্গে এমন কঠিন পরিহাস করবে? স্বামী তালাক দিয়ে তাঁর এত কষ্টের সংসারে, এত কষ্টে বানানো নতুন বাড়িতে নতুন বউ নিয়ে সংসার করছে। অথচ তাঁকেই সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে প্রতিকারের আশায় আদালতে আদালতে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। কুলসুম সামনে তাকিয়ে কোনো আশার আলো দেখতে পান না। আমরাও পাই না। যদি না তাঁর স্বামী আপসের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করতে সম্মত হন। কারণ, মামলার রাস্তায় গন্তব্য বহুদূর। খালি চোখে দেখা যায় না। যে সম্পদ দুজনে মিলে তৈরি করল, রাতদিন সে–ও পরিশ্রম করে যে সংসার গড়ে তুলল, তার সবকিছু একজনের হয়ে গেল।
আমাদের আইনি ব্যবস্থায় স্ত্রীর পরিশ্রম, ত্যাগ, বিনিয়োগের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই, সুরক্ষা নেই। পৃথিবীর অসংখ্য দেশে দাম্পত্যকালীন অর্জিত সম্পদে স্বামী–স্ত্রীর সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং যদি তাঁদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়, তবে বিচ্ছেদের পূর্বেই এই সম্পদ হিসাব করে সঠিকভাবে বণ্টনের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা আছে। যদি তালাক দেওয়ার পূর্বেই এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার বাধ্যতামূলক আইনি ব্যবস্থা থাকত, তবে আজকে অসহায় হয়ে কুলসুমকে আদালতে আদালতে ঘুরে বেড়াতে হতো না। তাঁর স্বামী তালাক দেওয়ার পূর্বেই এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে বাধ্য হতেন। হয়তো নিজে থেকেই আপসে বিষয়গুলোর সমাধান করে নিতেন।
নাইমা রহমান (ছদ্মনাম), বয়স ২৫ বছর। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সহপাঠীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। একসঙ্গে দুই বছর সংসার করেছেন। পড়াশোনা শেষ হলে স্বামী বাড়ি ফিরে যান। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দেন। নাইমা সংসার করতে চান। সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় তিনি আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কেন তাঁর স্বামী তাঁকে কোনো কিছু না জানিয়ে তালাক প্রদান করেছেন। তিনি জানতে চান, তাঁর অপরাধ কী? এই জানতে চাওয়ার অধিকার তো একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। অথচ তাঁর জন্য নাইমাকে আদালতে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।
সুফিয়া (ছদ্মনাম), দুই মাসের একটি শিশুসন্তানসহ তিন সন্তানের জননী। তাঁর স্বামী অন্য নারীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক করে তাঁকে তালাক দিয়েছেন। নিজে পোশাক কারখানায় চাকরি করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে সংসার ১২ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, সেই সংসার চোখের সামনে অন্যের হয়ে যাবে, তা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি পাগলপ্রায়। মোহরানার টাকায় তিনি কী করবেন! এই একতরফা তালাক নাইমা, সুফিয়ার মতো হাজারো নারীদের যে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তার মূল্য, সে যন্ত্রণার পরিমাণ কি অনির্ধারিতই থেকে যাবে?
বিয়ে একটি সামাজিক চুক্তি। সেই চুক্তি ভঙ্গের কারণে নাইমা, সুফিয়ার মতো অসংখ্য নারী যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোনো ব্যবস্থা আমাদের আইনি কাঠামোতে নেই। বিয়ের সময় তা ১০ বছর আগেই হোক আর ২০ বছর আগেই হোক, যে মোহরানা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পরিশোধ করে ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ পরিশোধ করে দিলেই আইনত সব ঝামেলা মিটে গেল। অনেক ক্ষেত্রে এই টাকাও পরিশোধ করা হয় না। এলাকায় একটি সালিস বৈঠকে বসে দেখা যায়, নির্ধারিত মোহরানার অর্ধেক কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার থেকেও কম পরিশোধ করে এটি মিটিয়ে ফেলা হয়। নারীরা বাধ্য হন নানা রকম হয়রানির ভয়ে এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে। কিন্তু যদি এই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং পরিশোধের আইনগত ব্যবস্থা থাকত, তবে তালাক দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে শতবার ভাবতে হতো। তালাকের সিদ্ধান্ত তুলনামূলক যৌক্তিক হতো, নিয়ন্ত্রিত হতো।
মিমের (ছদ্মনাম) বয়স দুই মাস। সে তার মায়ের কোলে চেপে আদালতে এসেছে তার বাবার নিকট থেকে ভরণপোষণ আদায়ের দাবি নিয়ে। কী বীভৎস এই দৃশ্য! তার বাবা তার জন্মের দ্বিতীয় দিনে তার মাকে তালাক প্রদান করেছে। মিমের মা এখন এই নবজাতককে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি উপযুক্ত সংস্থানের আশায়, প্রতিকারের অপেক্ষায়। তার মোহরানা আর এই নবজাতক সন্তানের ভরণপোষণ প্রাপ্তির আশায়। এই বীভৎস দৃশ্যের জন্য দায়ী যিনি, তিনি নতুন স্ত্রী নিয়ে সুখেই দিন কাটাচ্ছেন। তার আর চিন্তা কী! তালাক দিয়েছেন। ঝামেলা মিটে গেছে। অথচ এই সমস্যাগুলোর সমাধান অসম্ভব কিছু নয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এই সমস্যাগুলো সমাধানের সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের পূর্বেই পক্ষদের সংশ্লিষ্ট সব বিষয় সমাধান করে বিবাহবিচ্ছেদের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এসব ঘটনা নতুন নয়, একটি–দুইটি না; এ রকম অসংখ্য নারীর বেদনার আহাজারিতে বাংলাদেশের আদালতপাড়ার বাতাস প্রতিনিয়ত ভারী হয়ে ওঠে। তাঁরা প্রশ্ন করেন, তাঁদের অপরাধ কী? কেন তাঁদের ছেড়ে দিলেন? এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁরা এখন কোথায় যাবেন? বাচ্চাদের কী ব্যবস্থা হবে? জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় বিনিয়োগ করে এখন তাঁরা শূন্য হাতে অসহায় হয়ে নিজের ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজন পূরণের আশায় বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
পুরুষেরা তালাক দিয়েই নতুন বিয়ে করে অনেকে সংসার শুরু করেন। আর এই তালাকপ্রাপ্ত মা তাঁর দুই মাসের সন্তানকে ফেলে, তাঁর তিন–চারটি সন্তানকে পর করে দিয়ে চাইলেই নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন না। তাঁকে এই বাচ্চার ভরণপোষণ আদায়ের জন্য, তাঁর প্রাপ্য মোহরানা আদায়ের জন্য বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়। এটিই আমাদের বাস্তবতা। অথচ এটি কোনো কঠিন বিষয় নয়। তালাক প্রদানের পূর্বেই তালাক প্রদানের উপযুক্ত কারণ আছে কি না এবং তা থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলো বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্তে আসার এখতিয়ার পারিবারিক আদালতকে প্রদান করা হলে এ সমস্যার সহজেই বস্তুনিষ্ঠ সময়োপযোগী সমাধান করা সম্ভব। এটি কোনো নতুন ধারণা নয়। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই বিবাহবিচ্ছেদ আদালতের মাধ্যমে হয়। পক্ষরা যদি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সব বিষয় সমাধান করে সম্মিলিতভাবে আদালতে আবেদন দাখিল করে, তাহলে খুব সহজেই আদালত এই বিবাহবিচ্ছেদের আদেশসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করতে পারে। তবে যদি তাঁদের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ থাকে, তবে মামলার মাধ্যমে সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ ও পর্যালোচনা করে সেগুলো সমাধানের পর বিবাহবিচ্ছেদ হতে হবে। বিভিন্ন মুসলিম দেশেও আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের কার্যক্রম শুরু করার আইন প্রচলিত আছে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া এর মধ্যে অন্যতম।
মুসলিম বিবাহ একটি সামাজিক চুক্তি। অতএব এ চুক্তি ভঙ্গ করার পূর্বেই এ থেকে উদ্ভূত সব পারিবারিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান–নিয়মকানুন থাকা অবশ্যই জরুরি। যিনি চুক্তি ভঙ্গ করছেন, তিনি আয়েশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথচ সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থাপনার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রতিকারের আশায় দিশাহারা। এটি কোনো সভ্য সমাজব্যবস্থার, রাষ্ট্রব্যবস্থার চিত্র হতে পারে না। একটি সুস্থ সমাজে প্রত্যেকের অধিকার সংরক্ষণ করার, আদায় করার সঠিক, যথোপযুক্ত, সময়োপযোগী আইনি ব্যবস্থাপনা থাকাই হচ্ছে সভ্যতা ও সুস্থতার নিয়ামক। যিনি মনে করছেন, বিবাহের চুক্তি পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তাঁকে অবশ্যই কেন সম্ভব নয়, এর কারণ অপর পক্ষকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে জানাতে হবে এবং এর ফলে উদ্ভূত উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির ধরন, পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কার কতটুকু দায়িত্ব–কর্তব্য, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণপূর্বক প্রতিপালন করার সঠিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিবাহবিচ্ছেদ হতে হবে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে। বিবাহবিচ্ছেদ থেকে উদ্ভূত সব সমস্যা একই মামলায় সমাধান করে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর করতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ, বকেয়া ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পরিশোধ, সন্তানদের অভিভাবকত্ব নির্ধারণ, প্রতিপালনের অধিকার নির্ধারণ, সন্তানদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সন্তান লালন–পালনকারী হিসেবে বিবাহবিচ্ছেদ–পরবর্তী সময়ে সন্তানের মায়ের সাময়িক এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্থায়ী ভরণপোষণ প্রদান, বৃদ্ধ বয়সে তালাকের ক্ষেত্রে তাঁর আজীবন ভরণপোষণ, বিবাহকালীন অর্জিত সম্পদের সমান অংশে সুষ্ঠু বণ্টন, বিবাহবিচ্ছেদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের যুক্তিসংগত ক্ষতিপূরণ প্রদান, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর সন্তানদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত না করার আইনত বলবৎযোগ্য ঘোষণা প্রদান ইত্যাদি। যিনি বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করবেন, এসব বিষয় সমাধান হওয়ার পরেই বিবাহবিচ্ছেদের বিষয় কার্যকর করতে হবে। দেশে বিচ্ছেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে দাম্পত্য সম্পর্ক চলাকালে অন্য নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দ্বিতীয় সম্পর্কে জড়িয়ে প্রথমে স্ত্রীকে তালাক দেন। এ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ একজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবেন না, সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট বিধান সংযোজন করা প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কখন দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করা যাবে, সেটিও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। আর কেউ যদি আইন নির্ধারিত কারণে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে তাঁকে অবশ্যই প্রথম পক্ষের স্ত্রী ও সন্তানদের মৌলিক চাহিদাসমূহ সঠিকভাবে পূরণ করার আইনত বলবৎযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক সব প্রকার নিরাপত্তা প্রদানের আইনত বলবৎযোগ্য ঘোষণা দিতে হবে। তাঁদের সঙ্গে বৈষম্য–অবিচার করা যাবে না, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার মতো কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না—সে ব্যাপারে আদালতে বলবৎযোগ্য প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ক্যানসারে আক্রান্ত এক চাকরিজীবী নারীর তিন সন্তান। দীর্ঘদিন রোগাক্রান্ত থাকার পর তিনি দুজন নাবালক সন্তানসহ তিন সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর জানা যায়, স্বামী মৃত্যুর ঠিক দুই দিন পূর্বে প্রায় অচেতন অবস্থায় তাঁর স্বাক্ষর গ্রহণ করে সম্পূর্ণ গোপনে স্ত্রীর অফিসের এবং ব্যাংক হিসাবের সব কাগজপত্রের নমিনি হিসেবে সন্তানদের নাম পরিবর্তন করে শুধু নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। যাঁর সঙ্গে স্ত্রীর মৃত্যুর পূর্ব থেকেই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। মৃত্যুর পরপরই তাঁর স্ত্রীর অফিসের এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সব টাকাপয়সা গোপনে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। তাঁর নাবালক সন্তানেরা বণ্টন, নিরাপত্তা ও ভরণপোষণ আদায়ের আবেদন নিয়ে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। এই অসহায় সন্তানদের চোখের দিকে তাকানো যায় না। আমরা তাদের কী জবাব দেব? শুনানির সময় জানা গেল, ওই ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে, অফিসের সব কাগজপত্রে নমিনির নাম থেকে তাঁর সন্তানদের নাম কর্তন করে তাঁর নতুন স্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কাকে বিশ্বাস করবেন? জন্মদাতা বাবার বিরুদ্ধেও অভিযোগ নিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াতে হয়। কোনো কোনো কন্যাসন্তানের বাবা দ্বিতীয় সংসারে পুত্রসন্তান হলে আগের সংসারের কন্যাদের সব সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। যেসব ঘটনা বর্ণনা করেছি, তার প্রতিটি সমাজে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা। এগুলো একটি নয়, দুটি নয়, শত শত লাখে লাখে ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে। তাই কোনো ব্যক্তির ওপরে বিশ্বাস নয়, বরং আমাদের অধিকার রক্ষায় আইনি বন্দোবস্তকে পাকাপোক্ত করতে হবে। পারিবারিক জীবনের সব বঞ্চনা ও অন্যায়ের সব সম্ভাবনার বিরুদ্ধে আমাদের একটি সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা তৈরি করতে হবে। প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে যে তালাকের বিষয়টি পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত করা হলে বিপুলসংখ্যক মামলার চাপ পারিবারিক আদালতের জন্য কষ্টসাধ্য হবে।
তবে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, তালাকের বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য একই মামলায় আনুষঙ্গিক সব বিষয় যখন নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, তখন আদালতগুলোতে অনেকগুলো মামলা এমনিতেই কমে যাবে। একটি পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা, একটি যৌতুক নিরোধ আইনের অধীন মামলা, একটি মোহরানা ভরণপোষণ আদায়ের মামলা, দ্বিতীয় বিবাহ–সংক্রান্ত মামলা, সন্তানদের অভিভাবকত্বের মামলা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য ফৌজদারি মামলা যেমন দণ্ডবিধির ধারা ৪০৬, ৪২০, ৩৭৯–এর অধীন মামলা হতে আমরা দেখতে পাই। এসব মামলার মূল উদ্দেশ্য থাকে পারিবারিক বিরোধের সমাধান করে শান্তিপূর্ণ সংসারে ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি করা, অথবা স্ত্রীর যে পাওনাদি আছে, সেগুলো প্রাপ্ত হওয়া। এখন দেখা যাচ্ছে, যদি একটি মামলায় তালাকের বিষয় নিষ্পত্তি করতে গিয়ে অন্য সব বিষয় নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কমবেশি পাঁচ থেকে ছয়টি মামলা আমাদের আদালতগুলোর হিসাব থেকে কমে যাবে। পক্ষদের নানা রকম হয়রানি, ভোগান্তি কমে যাবে। মামলার সংখ্যা ও কমতে থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের আইনি সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত আছে, চর্চিত আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের পাশেই রয়েছে বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া। তাদের পারিবারিক আইনে এসব পারিবারিক বিরোধের সব সমাধান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। ‘দ্য ফ্যামিলি ল অব দ্য রিপাবলিক অব ইন্দোনেশিয়া’র আর্টিকেল ৯ ও ৪–এ বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি একজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় অন্য কাউকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর পূর্বের স্ত্রী তাঁর দায়িত্ব পালনে অক্ষম না হবেন, তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম না হবেন, অথবা অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত না হবেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম না হবেন।’ আর্টিকেল ৫–এ বলা হয়েছে, ‘কেউ যদি দ্বিতীয় বিবাহ করতে চান, তবে তাঁকে অবশ্যই প্রথম স্ত্রী বা স্ত্রীদের অনুমতি নিতে হবে। তাঁকে নিশ্চয়তা দিতে হবে, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার এবং তাঁদের সঙ্গে কোনো রকম অবিচারমূলক আচরণ করবেন না—সে বিষয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।’
এ ছাড়া আর্টিকেল ৩৫-এ বলা হয়েছে, ‘বিয়ে বলবৎ থাকাকালীন অর্জিত সম্পত্তি স্বামী–স্ত্রীর যৌথ সম্পত্তি হবে।’ আর্টিকেল ৪১-এ বলা হয়েছে, ‘আদালত চাইলে স্বামীকে তাঁর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিচ্ছেদ–পরবর্তী ভরণপোষণ প্রদান করার জন্য নির্দেশ দিতে পারবেন।’ পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও অগ্রসর হতে হবে। আমাদের পারিবারিক আদালতগুলোকে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় পৃথক পারিবারিক আদালত ও পারিবারিক আপিল আদালত প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র জনদুর্ভোগ কমিয়ে জনকল্যাণ নিশ্চিতকরণের সব উপায়কে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এখনই উপযুক্ত সময় যুগ যুগ ধরে এ দেশের নারীদের যে নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে, তার একটি সময়োপযোগী কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করার।
সবশেষে বলতে চাই, এ সমাজের নিপীড়িত মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলো সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ় হোক। নিপীড়িত নারী–শিশুসহ সবার ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের ব্যবস্থাপনা আরও সহজ, সুষ্ঠু, সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও মানবিক হোক। জীবনের সূচনালগ্নে আমাদের সন্তানদের, জীবনের ক্রান্তিলগ্নে আমাদের মায়েদের, বিশেষভাবে এই রাষ্ট্র যেন পরিপূর্ণ দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিক জবাবদিহির সঙ্গে সুরক্ষিত রাখতে পারে এই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।
*লেখক: ফাতিমা খাতুন, যুগ্ম জেলা জজ, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস