তরুণদের লাগামহীন মোটরসাইকেল রাইডিং: একটি উদ্বেগজনক সংকট
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা যেন কমছেই না। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১ হাজার ৯৬৪ জন তরুণ ও যুবক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আমাদের অসচেতনতাকেই সামনে নিয়ে আসে। দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার হার সর্বাধিক, যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কেও দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
কিশোর-যুবকদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এদের অনেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন নয় বা আইন মানতে অবহেলা করে। দ্রুতগতির প্রতি আসক্তি, প্রতিযোগিতামূলক চালনা এবং সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাব (যেমন: হেলমেট ব্যবহার না করা) দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেলের ৪৫ শতাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ নিয়ন্ত্রণ হারানো। তরুণ চালকদের অভিজ্ঞতার অভাব এবং অল্প বয়সে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানো সড়ক নিরাপত্তার বড় বাধা।
উন্নত দেশগুলো এ সমস্যা সমাধানে নজির স্থাপন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপান সঠিক নিয়মনীতি প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করে মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক এবং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া কঠোর। বাংলাদেশে উল্টো মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু চালকদের আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ছে না। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা শুধু চালক এবং যাত্রীদের প্রাণহানি ঘটায় না; বরং এটি পরিবারের আর্থিক সংকট এবং মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বাস্থ্যসেবা খাতেও এর চাপ অত্যন্ত বেশি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার, অভিভাবক এবং সুশীল সমাজকে একত্রে কাজ করতে হবে। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে তরুণদের ট্রাফিক আইন এবং সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যম, স্কুল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। লাইসেন্স ছাড়া চালনা বন্ধ করতে হবে। চালকদের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আরোপ এবং লাইসেন্সের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড ক্যামেরা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে জরিমানা এবং অন্যান্য শাস্তি আরোপ করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের দায়িত্বশীল চালনা শেখাতে হবে। তাঁদের নিজের সন্তানদের ট্রাফিক আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।
তরুণদের প্রাণ রক্ষা এবং জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সরকার, সুশীল সমাজ এবং অভিভাবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নিয়মনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমানো সম্ভব। একটি নিরাপদ সড়ক আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নিরাপদে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
*লেখক: নুরুন্নবী সোহান, শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
**নাগরিক সংবাদে লেখা, ভিডিও, ছবি, ভ্রমণকাহিনি, গল্প ও নানা আয়োজনের খবর পাঠান [email protected]এ