সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: তাঁর চলে যাওয়া
শুধু কি বিদায়ের সুর অনুরণিত হবে আমাদের হৃদয়তন্ত্রীতে? এক এক করে চারপাশে থেকে চলে যাচ্ছেন জাতির আইকনরা। মৃত্যু এক অমোঘ সত্য। আমাদের এই রৌদ্রছায়াময় নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কে তাকে রুধিবারে পারে? সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, এক বিশিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তা চলে গেলেন অনন্তের উদ্দেশে ১২ মার্চ ২০২৫। তিনি শুধু শিল্প উদ্যোক্তা ছিলেন না, জাতি গঠন ও সমাজসেবায় তাঁর অনন্য ভূমিকা ছিল। বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রূপকার ছিলেন। দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি (এমটিবি), এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড, এমটিবি সিকিউরিটিজ পিএলসির চেয়ারম্যান এবং ট্যানারির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চামড়া ব্যবসায় তাঁর প্রবেশ ছিল উল্লেখযোগ্য। হাজারীবাগ এলাকায় গড়ে তোলেন চামড়া রপ্তানির প্রতিষ্ঠান।
বহুজাতিক টোব্যাকো কোম্পানি, যা ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো নামে পরিচিত, তা থেকে তাঁর কর্মজীবন শুরু। মোটা বেতন ও সুবিধা ছেড়ে তিনি এ দেশে ফিরে মনোনিবেশ করেন ব্যবসায়। ১৯৭০ সালে উত্তাল সময় তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। তাঁকে মাঝে একবার ইংল্যান্ড যেতে হয়েছিল। চামড়া ব্যবসায় নিজের নামে কোম্পানি খুলে চামড়া শিল্পের যাত্রা শুরু করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে ১২ লাখ ২২ হাজার টাকায় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন ওরিয়েন্ট ট্যানারি ক্রয় করেন। জাপানি প্রতিষ্ঠান মিজুজে তাঁর কাছ থেকে প্রথম চামড়ার সরবরাহ নেয়। গাজীপুর ৫০ বিঘা জমিতে তিনি গড়ে তোলেন জুতা তৈরির কারখানা। ১৯৯১ সালে ১৫০ জন শ্রমিক নিয়োগ করে দৈনিক এক হাজার জোড়া জুতা তৈরির কাজ ক্রমে বাড়তে বাড়তে বৃহৎ রপ্তানি কারখানায় রূপান্তরিত হয়। ব্যবসায় ধাক্কা লাগে একসময়। প্রচণ্ড মনোবলের অধিকারী সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী দমে যাওয়ার পাত্র নন। এর মধ্যে জাপানি কোম্পানি মারুটোমি ও মিজুজের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ পান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেন গিনস বার্গ পরামর্শক হিসেবে। জাপানের মন্দা তাঁর জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়। তিনি এ সময় ইতালি যান। এ সময় অ্যাডলকি নামক শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে পরিচয় হয়, তাঁকে বাংলাদেশ আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি অ্যাপেক্স ওয়ারে পরামর্শক নিয়োগ দেন। ব্যবসায় নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। তাইওয়ানের সঙ্গে যৌথভাবে সৈয়দ মঞ্জুর ব্লুওশান ফুটওয়ার গড়ে তোলেন। সফিপুরে যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের জন্য জুতা তৈরির কারখানা চালু হলো। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী প্রতিষ্ঠা করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এক এক করে সম্প্রসারিত হয় অ্যাপেক্স ফার্মা, অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ, অ্যাপেক্স ইনভেস্টমেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাঁর ছিল বিজ্ঞাপনী সংস্থা গ্রে ও কোয়ান্টাম কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশনের অংশীদারত্ব।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি সমাজসেবায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তাঁর স্ত্রী নিলুফার মঞ্জুরকে সানবীমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর কর্মময় জীবন পরিব্যাপ্ত ছিল। মঞ্জুর এলাহী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগ পান। এ ছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক , বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে তাঁর কর্মপরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স ও রাঁচির বিশপ ওয়েস্ট কট স্কুলে লেখাপড়া শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ১৯৬২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর হন। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে প্রবেশ ও খ্যাতি লাভ ছিল তাঁর অসামান্য যোগ্যতা। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক কর্মবীর। ২০২৫ সালের ১২ মার্চ সিঙ্গাপুর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু একটি অধ্যায়ে সমাপ্তি ঘটায়।
১৯৮৩ বছরের তাঁর একটি পরিণত জীবন অনেক উদোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর শেষ কথা ‘আমাকে ঘরে নিয়ে চলো—এটাই তোমার কর্তব্য। জীবনো যা কিছু করো আগে দেশ, তার পরে ধর্ম, তারপর ধর্ম। মুসলমান হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। কিন্তু অন্য সব ধর্মের প্রতিও আমি শ্রদ্ধাশীল। কারণ, আমাদের রক্ত এক। ধর্ম যার যার নিজের, মানুষ হিসেবে কোনো ভেদাভেদ নেই।’
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ধারণা উঁচু ছিল। নীতিনির্ধারণী তাঁর মতামত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। বাজেট প্রণয়ণ–সংক্রান্ত তাঁর মতামত ছিল তাৎপর্যময়। শুধু ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, মানুষ মঞ্জুর এলাহী একজন মানবিক গুণে ভরপুর ছিলেন। দেশের বিকাশমান শিল্পের তিনি ছিলেন অগ্রবর্তী উদ্যোক্তা। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর জীবনাবসান অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁর পথ অনুসরণ করে আমাদের শিল্প, অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি অনুসরণীয় ও প্রেরণাদাতা।
*লেখক: সাইফুজ্জামান: প্রাবন্ধিক ও গবেষক