গ্যাস–সংকট নয়, এটি জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট
দেশের কোটি মানুষের রান্নাঘরের চুলা আজ নিবু নিবু। সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত। সরকার জনগণের এই কষ্ট গভীরভাবে অনুভব করে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিদিন জ্বালানি পরিস্থিতি মনিটর করছে। আমরা আশাবাদী, এ সংকট সাময়িক এবং সরকার দ্রুততম সময়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বদ্ধপরিকর এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি আর না হয়, সে লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
এই পরিস্থিতিকে শুধু ‘গ্যাস–সংকট’ বললে ভুল হবে। এটি আসলে ‘জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট’। ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে ওই ঘটনার ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এটিকে নিছক দুর্ঘটনা বললে ভুল হবে, এটি গত দেড় দশক ধরে গড়ে ওঠা আমদানিনির্ভর জ্বালানিকাঠামোর অনিবার্য পরিণতি। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন কোটি কোটি মানুষের রান্নাঘর অচল হবে, এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা।
বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে এক বছর আগেও দেশে গ্যাসের সরবরাহ ছিল প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। ফলে তখনো প্রতিদিন প্রায় ১.০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকত। এই ঘাটতির একটি বড় অংশ পূরণ করা হতো আমদানি করা এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে। গত ২১ জুলাই ২০২৬ কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। এতে টার্মিনালের কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো ইউনিট বন্ধ করে দেয়। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৩০ জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শুধু এলএনজির ঘাটতিই ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে। এতে রাতারাতি জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানীর সাধারণ মানুষ। ঢাকার মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডাসহ প্রায় সব এলাকাতেই বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষেরা মাটির চুলায় ফিরে গেছেন। মধ্যবিত্তরা অনেক ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাঁদের মাসিক বাজেটে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। শিল্পের অবস্থাও খারাপ। বিজিইএমএ ও বিকেইএমএ ইতিমধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে। গ্যাসের অভাবে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। সময়মতো শিপমেন্ট না গেলে ক্রেতা অন্য দেশে চলে যাবে। এর মানে লাখো শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ছে।
একটি দুর্ঘটনায় যদি পুরো দেশের জ্বালানিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটা দুর্ঘটনায় নয়, ব্যবস্থায়। আর এ অব্যবস্থাপনা এক দিনের নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ তিনটি কাঠামোগত ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে। প্রথমত দেশীয় উৎপাদনে ধস ও আমদানিনির্ভরতা, দ্বিতীয়ত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ফেইলিওর’ ঝুঁকি এবং তৃতীয়ত সিস্টেম লস ও অব্যবস্থাপনা।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন গত দেড় দশকে ক্রমাগত কমেছে। বিবিয়ানা, তিতাস, হবিগঞ্জে ও জালালাবাদের মতো বড় ক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ফলে আমাদের নিজস্ব উৎপাদন পেট্রোবাংলার তথ্য আনুযায়ী গত এক বছরে দৈনিক সরবরাহ ২.৮ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ২.৩ বিলিয়ন ঘনফুটের ঘরে এসেছে। এই অতিরিক্ত ঘাটতি এখন এলএনজি দিয়েও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আজ দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। অর্থাৎ আমরা আমাদের রান্নাঘরের চুলা থেকে শিল্পের চাকা—সবকিছুই আমরা বৈদেশিক জ্বালানির ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
বাংলাদেশে এখন দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। দুটিই মহেশখালীতে। একটি চালায় এক্সিলারেট এনার্জি, যার ক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যটি সামিটের, যার ক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সমস্যা হলো, এক্সিলারেটের টার্মিনাল একাই মোট এলএনজি সরবরাহের ৫৫ শতাংশ দেয়। এটি বন্ধ হওয়া মানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ২২ শতাংশ রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়া। জাতীয় নিরাপত্তার ভাষায় একে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ফেইলিওর’ বলে। অর্থাৎ একটি পয়েন্টে আঘাত লাগলে পুরো সিস্টেম কলাপস করে। ২১ জুলাইয়ের ঘটনা সেটাই প্রমাণ করেছে।
দেশে গ্যাসের সিস্টেম লস এখনো প্রায় ১০ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অংশ অবৈধ সংযোগ। একটি হিসাবে দেখা যায়, শুধু অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১০ লাখের বেশি বাসাবাড়ির চাহিদা মেটানো যায়।
দেশে গ্যাসের সিস্টেম লস এখনো প্রায় ১০ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অংশ অবৈধ সংযোগ। একটি হিসাবে দেখা যায়, শুধু অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১০ লাখের বেশি বাসাবাড়ির চাহিদা মেটানো যায়।
এই তিন দুর্বলতা মিলেই আজকের জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট তৈরি করেছে। ২১ জুলাইয়ের আগুন শুধু এই দুর্বলতাকে সবার সামনে উন্মোচিত করেছে। সরকার এই সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও তার কোম্পানিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সাম্প্রতিক সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কারিগরি সমস্যা, আগুন, এলএনজি কার্গোর বিলম্ব কিংবা টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই বাস্তব কারণ। কিন্তু এগুলোকে যদি সংকটের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে আমরা মূল সমস্যাটি এড়িয়ে যাব। বাংলাদেশের গ্যাস-নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দেশীয় উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন। বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদন গত এক বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে অথচ গ্যাসের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতা কমেনি; বরং শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন, সিএনজি ও নগরায়ণের সঙ্গে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে; কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এ জায়গাতেই বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। এই ঘাটতি পূরণ করতে আমরা এলএনজি আমদানি করছি। এটি প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু এলএনজি কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। কারণ, এলএনজি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা লাগে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। সরবরাহকারী দেশে উৎপাদন বা ভূরাজনৈতিক সমস্যা হলে আমাদের সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে। সমুদ্রপথ, এলএনজি carrier, terminal, FSRU, regasification এবং pipeline infrastructure-এর যেকোনো একটি জায়গায় সমস্যা হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। গত সরকারের আমলে এমন একটি জ্বালানিব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে দেশীয় গ্যাসের পতনকে ক্রমবর্ধমান এলএনজি আমদানি দিয়ে পূরণ করার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। তাই বর্তমান সংকট শুধু একটি দুর্ঘটনার ফল নয়। দুর্ঘটনাটি একটি বিদ্যমান দুর্বলতাকে দৃশ্যমান করে দিয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এলএনজি আমদানির বিরোধিতা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি ও গ্যাস-চাহিদার বাস্তবতায় এলএনজি প্রয়োজন। আগামী কয়েক বছরেও প্রয়োজন হবে। আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই সমস্যা এলএনজি নয়; বরং সমস্যা হলো এলএনজিকে দেশীয় অনুসন্ধানের বিকল্প হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া। একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সাধারণত একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় না। দেশীয় উৎপাদন, আমদানি, অবকাঠামো, মজুত, সরবরাহের বৈচিত্র্য, জরুরি পরিকল্পনা এবং বিকল্প জ্বালানিব্যবস্থা মিলেই একটি স্থিতিশীল জ্বালানিব্যবস্থা তৈরি হয়। আমাদের দেশের সম্পদ মাটির নিচে রেখে বা যথাযথ অনুসন্ধান না করে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা আমাদের জন্য এখনো সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। দেশের স্থলভাগে এমন অনেক সম্ভাবনাময় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে, যেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান এখনো সম্পন্ন হয়নি। একই সঙ্গে পুরোনো ও উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নততর সাইসমিক ডেটা এবং নতুন ভূতাত্ত্বিক মডেলের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। পুরোনো তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে নতুন তথ্যের সমন্বয় করে এসব ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুত, নতুন স্তরে গ্যাসের সম্ভাবনা কিংবা বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও খুঁজে দেখা যেতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের সমুদ্রসীমায় অগভীর ও গভীর সমুদ্রে গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানের একটি বড় সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে আমাদের অনুসন্ধান কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ধারাবাহিকতা, গতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি। গ্যাস অনুসন্ধানের ফল রাতারাতি পাওয়া সম্ভব নয়। একটি এলাকায় সাইসমিক জরিপ করে একটি কূপ খনন করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। অর্থাৎ আজ যে অনুসন্ধান শুরু হবে, তার সুফল হয়তো কয়েক বছর পর পাওয়া যাবে। তাই আজকের ঘাটতি পূরণের জন্য শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না, বরং পাঁচ বছর পর আমরা আবার একই প্রশ্ন করব।
গত কয়েক বছরে জ্বালানি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। অথচ সেই বিপুল ব্যয়ের সমান্তরালে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও মজুত বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিনিয়োগ করা গেলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত। আমদানি অবশ্যই জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি চাহিদা মোকাবিলায়। কিন্তু আমদানিনির্ভরতা কখনোই একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। ফলে আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
এখানে বাপেক্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাপেক্সকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোথায় নতুন ২ডি সাইসমিক জরিপ প্রয়োজন, কোথায় ৩ডি সাইসমিক জরিপ করা অধিক যুক্তিযুক্ত, কোন পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার এবং কোন সম্ভাবনাময় কাঠামোয় অনুসন্ধান কূপ খনন করা উচিত এই সিদ্ধান্তগুলো আবেগ নয়, বরং ভূতত্ত্ব ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্যাস অনুসন্ধান কোনো এককালীন উদ্যোগ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একটি কূপ সফল হলো কি না, শুধু তার ভিত্তিতে একটি অনুসন্ধান কর্মসূচির সাফল্য বা ব্যর্থতা বিচার করা উচিত নয়। বরং নিয়মিত সাইসমিক জরিপ, আধুনিক প্রযুক্তিতে ডেটা বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি কূপের সফলতা ও ব্যর্থতা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী অনুসন্ধানে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই অনুসন্ধানের সক্ষমতা বাড়ে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
বর্তমান সরকার মনে করে, জ্বালানি নিরাপত্তা মানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব। যত দিন আমরা রান্নার গ্যাসের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকব, তত দিন আমরা পরনির্ভরতা থেকে মুক্তি পাব না। তাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলো জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জন। সরকার যদি আগামী ছয় মাসে সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে পারে তাহলে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি গ্যাস সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে একটি মাঝারি আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব হবে।
বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কাজ চলমান আছে। সরকার ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি গভীর কূপ খননও রয়েছে। ভোলার গ্যাস নদী পার করে নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। লক্ষ্য হলো, আগামী তিন বছরে দেশীয় উৎপাদন দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানো। দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে নতুন দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) এবং একটি ল্যান্ড-বেজড (স্থলভিত্তিক) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা জয়ের পর আমাদের বিশাল সমুদ্র এলাকায় গ্যাস থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে সরকার কয়লা, পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সেই গ্যাস শিল্প ও বাসাবাড়িতে দেওয়া যাবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপন, সোলার ইনভার্টার উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে সরকারি সহায়তা এবং সৌরবিদ্যুৎকে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও লাভজনক করতে কার্যকর অর্থনৈতিক মডেল প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। জ্বালানিকে তাই শুধু একটি পণ্য হিসেবে নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে একটি সুসমন্বিত ভারসাম্য রেখে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা সম্ভব নয়।
দিন শেষে আমাদের মূল সমস্যা শুধু গ্যাস–সংকট নয়, বরং এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ও টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা, যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন, এলএনজি আমদানি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এ ধরনের বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা সম্ভব হবে।
*লেখক: মোহাম্মদ আনিসুর রহমান রানা, পরিচালক, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ও
সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সোসাইটি