ডিজিটাল মহাজনি ঋণের মরণফাঁদ: যুবসমাজ ও মধ্যবিত্ত বিপন্ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
বাংলাদেশকে বলা হয় ক্ষুদ্রঋণের সূতিকাগার বা মাতৃভূমি। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো (এনজিও/এমএফআই)। বাংলাদেশে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
উদাহরণস্বরূপ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)–এর মতো সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও সদস্যদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও আমানত সংগ্রহ করার আইনগত অনুমোদন এই খাতকে অনন্য করেছে। মূলত, ক্ষুদ্রঋণ হচ্ছে এমন একটি মানবিক ঋণপদ্ধতি, যেখানে কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই সমিতিভুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের বিশ্বাস ও আস্থার ওপর ভিত্তি করে ঋণ প্রদান করা হয়। বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লাখ। এর বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কর্মী। বর্তমানে দেশে মোট সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে আনুমানিক ৬৮৫টি এবং সাময়িক সনদপ্রাপ্ত আছে ৩৪৬টি; অর্থাৎ সব মিলিয়ে এমআরএ-এর অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ১০৩১টি। মূলত গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে প্রাচীন মহাজনি সুদের নির্মম পরিক্রমা থেকে পরিত্রাণ দিতে, সঞ্চয় ও নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে স্বাবলম্বিতা, আর্থিক সচ্ছলতা, শিক্ষা, সচেতনতা ও কাঠামোগত উদ্যোক্তা তৈরি করার কারিগর হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের এই বৈধ ক্ষুদ্রঋণদানকারী সংস্থাগুলো।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে সাম্প্রতিক সময়ে এই ঐতিহ্যবাহী ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশে এক ভয়াবহ ‘ডিজিটাল মহাজনি’ সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে। দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত কিছু অসাধু চক্র সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনিবন্ধিত অনলাইনভিত্তিক লোন অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। গুগল প্লে স্টোরে বিদ্যমান এই অ্যাপগুলো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি) চটকদার ও লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাৎক্ষণিক ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। প্রাচীন আমলের রক্তচোষা মহাজনি সুদের মতোই এই অ্যাপগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ সুদে ঋণ বিতরণ ও আদায় করছে। কতিপয় বহুল আলোচিত অবৈধ অ্যাপের মধ্যে রয়েছে—আস্থা লোন, আশা লোন, র্যাপিড ক্যাশ, ফিন ক্যাশ, পপ ক্যাশ, আমার টাকা, দোস্ত লোন, সুবিধা লোন, ঢাকা ফিন ইত্যাদি। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই চক্রগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে আদায়কৃত বিপুল পরিমাণ টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই ঋণ বিতরণকারী ওয়ালেট বা অ্যাপগুলো বাংলাদেশের সীমানার বাইরে বসে রিমোটলি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যা দেশের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এই অনিবন্ধিত ও অবৈধ অ্যাপগুলোর পেছনে যারা কাজ করছে, তারা মূলত গ্রাম ও মফস্সলের ডিজিটাল জ্ঞানে পিছিয়ে পড়া মানুষকে টার্গেট করছে। তবে এই মরণফাঁদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে দেশের যুবসমাজ। অতি সহজে অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পেয়ে অনেক যুবক এই টাকা উচ্চ সুদে নিয়ে অনলাইন জুয়াভিত্তিক অ্যাপে উড়িয়ে দিচ্ছে। আবার অনেকে জরুরি চিকিৎসার খরচ বা ইমার্জেন্সি টাকার প্রয়োজনে পড়ে একবার এই ফাঁদে পা দিলে তা পরবর্তী সময়ে এক ভয়াবহ অভ্যস্ততায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে এই চক্রের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না চাকরিরত নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও। বর্তমান বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে মাসের অর্ধেক সময় পার হতেই যখন বেতনের টাকা শেষ হয়ে যায়, তখন এই জনগোষ্ঠী জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বাধ্য হয়ে স্বল্প সময়ের এই উচ্চ সুদের ডিজিটাল ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পরবর্তী সময়ে ঋণের টাকা তুলতে না পারলে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ছবি ও কন্টাক্ট লিস্ট চুরি করে ব্ল্যাকমেইল করার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।
বর্তমান যুগে যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) টেকনোলজি, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)–এর অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটেছে, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল সুরক্ষায় রেগুলেটরি তত্ত্বাবধানের আওতায় আনা একটি সময়োপযোগী ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে ডিজিটাল জ্ঞানে পিছিয়ে পড়া মফস্সল ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে একটি নিয়মতান্ত্রিক আইনি কাঠামো নিশ্চিত করে রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের ‘ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট অব প্রাইভেসি’ কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে এই অবৈধ অ্যাপগুলো যেভাবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য বা ডেটা কালেক্ট করছে, তা বন্ধ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধান দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এখানে মনে রাখা জরুরি যে ক্ষুদ্রঋণ খাতের ডিজিটালাইজেশন মানেই কেবল আর্থিক হিসাব কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা নয়; বরং প্রকৃত ডিজিটাল ফাইন্যান্স হতে পারে অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ভেরিফিকেশন বা পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্রঋণ নির্দিষ্ট এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে সরাসরি বিতরণ এবং কালেকশন করা। সম্প্রতি দেশের অনেক ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে আংশিকভাবে ঋণ আদায় শুরু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সে ক্ষেত্রে প্রান্তিক গ্রাহকদের এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করতে বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো এমএফএস ওয়ালেটগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের ‘ক্যাশ আউট চার্জ’ সম্পূর্ণ মওকুফ বা রহিতকরণের মাধ্যমে একটি টেকসই ও গ্রাহকবান্ধব ডিজিটাল সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ন্যানো লোন’ দেওয়ার যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, সেই একই সিদ্ধান্তের আলোকেই দেশের ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর (এমএফআই) জন্য একটি বিশেষায়িত ‘ডিজিটাল ক্ষুদ্রঋণ নীতিমালা’ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালার মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রান্তিক মানুষকে ডিজিটাল মহাজনি মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করা যাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, বিটিআরসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে যৌথভাবে এমএফএস ওয়ালেটগুলোর সন্দেহজনক লেনদেন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অবৈধ লোন অ্যাপের ডিজিটাল জাল রুখতে এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে এখনই বলিষ্ঠ ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আসিফুল হক: ডিএফএস ও সিবিএস বিশেষজ্ঞ