নিবেদন
রোজ ভোরে ফুল কুড়াতাম আমরা দুজন। দুজন মানে দীপক আর আমি। মালা গেঁথে দীপকের হাতে দিয়ে তারপর এসে পড়তে বসতাম। সেই স্মৃতিগুলো আজ আমার স্বপ্নের দরজায় এসে আঘাত হেনে যায়। দীপক ছিল আমার পাশের বাড়ির। দিনে দিনে আমরা বড় হতে থাকলাম।
আমাদের স্বপ্ন সবই দিগন্তের মতো পাখা মেলতে শুরু করল। সেই স্বপ্নঘেরা ও মধুময় দিনগুলো হারিয়ে গেল। পাড়ভাঙা নদীর মতো, আমার জীবন-নদীতেও কষ্টের কলধ্বনি। আমি ভুলব কী করে সেসব কথা! স্কুল-কলেজ ডিঙিয়ে আমি ও দীপক এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা, হলের বান্ধবীদের হাস্যোজ্জ্বল দীপ্তিভরা মুখ। মনে পড়ে আর একখানি স্বপ্নপূর্ণ কমলের মতো ফুটন্ত মুখ। সে মুখ যে জীবন্ত হয়ে ফুটে আছে আমার বুকের আধারে। পড়ন্ত বিকেলে হলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে থাকতাম আমি—কখন দীপক আসবে। দীপক এসে বলে, ‘একটু দেরি হয়ে গেল সাথী, রাগ করোনি তো?’ হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে যাই আমরা। পথে নাম না-জানা অনেক মুখচেনা বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। পথের বন্ধুরা একটু চাপা হাসি উপহার দিয়ে চলে যায় যে যার গন্তব্যে। আমরা দুজন হাঁটছি আর হাঁটছি ক্লান্তিহীন পদযাত্রায়। মনে আমাদের অফুরন্ত আনন্দের ফল্গুধারা। এভাবে দিন চলে যায় আমাদের।
কয়েক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্তি বিরাজ করছে একটা শত্রুর গন্ডগোলের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুকুরপাড়ে শান-বাঁধানো ঘাটে বসে আছি আমি, দীপক আর দীপকের কয়েকজন বন্ধু। সবারই মুখ থমথমে ভাব। মেঘলা আকাশের মতো ছেয়ে আছে সবারই মনের আকাশ। আমার আতঙ্কিত মুখের দিকে চেয়ে দীপক বলল, ‘তুমি হলে চলে যাও সাথী, সাবধানে থেকো। বিপদ বুঝলে নিরাপদ স্থানে চলে যেয়ো।’
আমি বললাম, ‘তুমি?’
‘আমাদের পালালে তো চলবে না সাথী। এসবের মোকাবিলা তো আমাদেরই করতে হবে।’
‘তোমাকে নিয়ে আমার বড় ভয় দীপক। তুমি অন্য কোথাও চলে যাও। আমি অনুরোধ করছি তোমাকে। এই ক্যাম্পাস ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাও। তোমাকে আমি হারাতে চাই না দীপক। তোমাকে হারালে আমার এ পৃথিবীতে আর কেউই থাকবে না।’
‘আমরা তো ন্যায়ের পক্ষে লড়ছি সাথী। ভালোবাসি এই দেশকে, এই দেশের মানুষকে।’
‘তোমার যদি কিছু হয়ে যায় দীপক, আমি বাঁচব কী নিয়ে?’
‘কেন, থাকবে আমার ভালোবাসা—থাকবে আমার অসমাপ্ত কাজ। বেঁচে থাকার কাজ সেই দেখাবে।’
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
হলে ফিরে এলাম, পড়াশোনায় মন দিতে পারলাম না। কখন যে কী হয়, সে চিন্তায় সারা রাত কাটিয়ে দিলাম। সকালে গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল। রণক্ষেত্রে পরিণত হলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এলোপাতাড়ি ঢিল পড়ছে অসংখ্য। মাঝে মাঝে গুলির শব্দ। মেয়েরা হলের দরজা বন্ধ করে কান্নাকাটি করছি আর আল্লাহকে ডাকছি বারবার। শুনলাম অনেক ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। তখনো হলের দরজা খোলার উপায় নেই। বন্ধ দরজার ওপাশে বিষণ্ন মনে বসে আছি সব মেয়ে। একেকটি ঘণ্টা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে একেকটি যুগ। দীপকের কোনো খবর না পাওয়ায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
দীপককে পাওয়া গেল। গতকাল যে শান-বাঁধানো পুকুরপাড়ে বসেছিলাম, সেইখানে—প্রাণহীন দীপক রক্তাক্ত লাশ হয়ে। আমি চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। কিছুক্ষণ পর আমার বান্ধবীরা আমাকে টেনে এনে বসাল দীপকের খাটিয়ার পাশে। বন্ধুরা কী সুন্দর করে সাজিয়েছে আমার দীপককে! ফুলের আবরণে ঢেকে গেছে দীপকের সমস্ত শরীর। খাটিয়ার চারপাশে দীপকের অগণিত বন্ধুর ভিড়। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে আছে সবাই দীপকের মুখের দিকে। কী অপরূপ ফুল দিয়ে ঢাকা দীপকের মুখ! আস্তে করে হাত রাখলাম দীপকের মাথায়। একরাশ ঘন কোঁকড়ানো চুলে হাত বোলাচ্ছি আমি। এবার স্পর্শ করলাম ওই ললাট, কপোলে বেয়ে হাত নেমে এল আরও নিচে। হঠাৎ আমার মাথা নিচু হয়ে এল দীপকের মুখের ওপরে। আমার নয়ন জলে ভেসে গেল দীপকের মুখ। ওর ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রাখলাম। পরম আদরে, পরম সোহাগে ওর ঠোঁটে এঁকে দিলাম শেষবিদায়ের শেষ চুম্বনটুকু। আমাকে নিয়ে যে কল্পনার বাসর রচনা করেছিল দীপক, আমাকে ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে নিক্ষেপ করে একাই চলল সে বাসরে। আমার এ শূন্য জীবন দীপকের সহস্র স্মৃতি বহন করে চলছে। ঘুমভাঙা রাতে আজও আমার বুকে কষ্টের পাহাড় ভাঙে, প্লাবিত হয় আমার হৃদয়। ওর সেই শান্ত ফুলে ঢাকা মুখখানি আমার চেতনার দুয়ারে আঘাত হানে বারবার। আমি কি কোনো দিন ভুলতে পারব ওকে? দীপক আমার জীবনে এক অনন্য প্রদীপ্ত। আমার এ হৃদয় শূন্য করে কোথায় পালালে তুমি? কেন শুনিয়েছিলে জীবনের গান? কেন দিয়েছিলে ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান? তোমাকে ছাড়া আমার এ পৃথিবীতে দম বন্ধ হয়ে আসে দীপক। অমৃত কেন পান করিয়েছিলে? আজ আমার কষ্টের সাগর মন্থনে উঠে আসা গরল পানে নীল কষ্ট হয়ে গেছি।
এক মাস বাড়িতে এসেছি, কিছুই ভালো লাগে না আমার। বাবা বললেন, ‘আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যা মা, পড়াশোনায় মন দে।’ যেদিকে তাকাই সেদিকেই আমার দীপকের ছবি ভেসে ওঠে। যেখানে যাই সেখানে সবকিছুই আছে, নেই শুধু আমার দীপক। পড়ন্ত বেলায় বসলাম সেই পুকুরঘাটে, যেখানে দীপকের দেহ পড়ে ছিল।
‘কেমন আছ সাথী?’ জিজ্ঞাসা করল দীপকের বন্ধু জয়।
‘ভালো আছি, তুমি কেমন আছ জয়?’
‘ভালো। একটা চিঠি আছে সাথী আমার কাছে, এই নাও।’
...তুমি দীপকের বন্ধু, আমারও বন্ধু তুমি। দীপকের অসমাপ্ত কাজগুলো করে যাবে। আমিও তোমার পাশাপাশি থেকে দীপকের কাজগুলো করে যাব।
দীপকের কাজে আজ থেকে নিবেদন করলাম আমার প্রাণ।
জয় হাত বাড়াল সাথীর দিকে। জয়ের হাতের ওপর হাত রাখল সাথী। দুজন চেয়ে আছে দুজনের মুখের দিকে। দুজনেরই মুখে আজ প্রশান্তির হাসি।