ক্লাসের ব্যস্ততা পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রে এক দুপুর
প্যাথলজি প্রেজেন্টেশন শেষ হয়েছে মাত্র। ঘড়িতে তখন বেলা ১১টা। প্রেজেন্টেশনের পর সবারই একটু ক্লান্ত লাগছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ সিদ্ধান্ত হলো, আজ ব্রহ্মপুত্রে নৌকায় ঘুরতে যাওয়া যাক। খুব বেশি পরিকল্পনা না করেই আট-নয়জন বন্ধু মিলে চলে গেলাম নৌকাঘাটে। সেদিন বেশ রোদ ছিল। বাইরে দাঁড়ালেই গরম লাগছিল। তাই প্রথমে মনে হয়েছিল নৌকায় গিয়ে হয়তো আরও গরম লাগবে। কিন্তু নৌকায় ওঠার পর সেই ধারণা বদলে গেল। নৌকার ছাউনির নিচে বসে নদীর বাতাস খেতে খেতে গরমের কথা অনেকটাই ভুলে গেলাম। যদিও নৌকায় ওঠার সময় একটু বিপত্তি হয়েছিল আমার পা হড়কে যাচ্ছিল, তার আগেই এক বন্ধু ধরে ফেলায় শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক উঠে পড়লাম। নৌকা ছাড়ার পর শুরু হলো গল্প, আড্ডা আর ছবি তোলা। কারও হাতে চিপস, কারও কাছে বিস্কুট, চকলেট কিংবা পানি। খেতে খেতে গল্প চলছিল, আর তার সঙ্গে চলছিল সেলফি, ছবি আর ভিডিও করার পালা। একসময় ফুয়াদ, পলক আর মাহি গান ধরল। নদীর বাতাসের মধ্যে গান, হাসাহাসি আর বন্ধুদের আড্ডায় মুহূর্তেই জমে উঠল নৌকাভ্রমণ। ব্রহ্মপুত্রের দুই পারের দৃশ্যও ছিল বেশ সুন্দর।
চারপাশে গাছপালা, কোথাও কোথাও নতুন কাশফুল ফুটতে শুরু করেছে। নদীতে তখন প্রচণ্ড বাতাস, ফলে নৌকার সঙ্গে সঙ্গে ঢেউও দুলছিল। আশপাশে মাঝিদের অনেক নৌকাও দেখা যাচ্ছিল। পরিচিত ক্যাম্পাসের মধ্যেই এমন একটা পরিবেশ যেন প্রতিদিনের ব্যস্ততার বাইরে আলাদা এক অনুভূতি তৈরি করেছিল। তবে আনন্দের সঙ্গে ভয়ও ছিল কয়েকজনের। মিলা, দ্রুতি আর অর্থি বেশ ভয় পাচ্ছিল। অর্থি তো বারবার বকছিল, ‘তোরা এত কথা বলিস, আমি আর আসব না।’ তার ওপর তানবিন আর রাফি বারবার নৌকা দোলানোর চেষ্টা করছিল। এতে অর্থির ভয় আরও বেড়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই দিগন্তকে নিয়ে আরেক দফা হাসাহাসি শুরু হলো। দিগন্ত নৌকার যে পাশেই বসছিল, নৌকাটাও যেন সেই পাশেই হেলে পড়ছিল। একসময় নৌকাটা একটু বেশি হেলে গেলে মাঝি মুতাসসিমকে বেশ জোরে ধমক দিয়ে মাঝখানে বসিয়ে দিলেন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে সবাই হেসে ফেললাম। ভয় পাওয়া কয়েকজনের কাছে অবশ্য বিষয়টা তখন মোটেও হাসির ছিল না। প্রায় এক ঘণ্টা ব্রহ্মপুত্রের বুকে ঘোরার পর আমাদের আবার ফিরতে হলো। সামনে ক্লাস ছিল, তাই বেশি সময় থাকার সুযোগ ছিল না। নৌকা থেকে নেমে আবার ফিরে গেলাম ক্লাসে। কিন্তু এই এক ঘণ্টার ছোট্ট বিরতিটুকুই যেন দিনের সব ক্লান্তি অনেকটা দূর করে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন মানেই ক্লাস, ল্যাব, টিউশন, প্র্যাকটিক্যাল আর প্রেজেন্টেশনের ব্যস্ততা। এর মধ্যেও বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ করে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আনন্দটা অন্য রকম। এর জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কয়েকজন বন্ধু, একটা নৌকা আর অল্প কিছু সময়ই যথেষ্ট হয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্রের বুকে কাটানো সেই এক ঘণ্টা হয়তো খুব বড় কোনো ভ্রমণ নয়। কিন্তু গান, গল্প, ছবি, দুষ্টুমি আর একটু ভয়—সব মিলিয়ে এই ছোট্ট নৌভ্রমণটুকুই হয়তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্মৃতির পাতায় আলাদা করে জায়গা করে নেবে।
*মাহফুজা আক্তার ইমা, শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ—দ্বিতীয় বর্ষ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ