বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬: প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
ভ্রমণে যাওয়ার আনন্দটা শুরু হয় গন্তব্যে পৌঁছানোর অনেক আগেই। কোথায় যাবেন, কী দেখবেন, পরিবারের সঙ্গে কীভাবে সময় কাটাবেন—এসব ভাবতে ভাবতেই তৈরি হয় একধরনের আনন্দ ও প্রত্যাশা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক সময় মিল থাকে না। যেখানে থাকার কথা প্রশান্তি, সেখানে ভিড়; যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার কথা, সেখানে নানা ধরনের বিড়ম্বনা; যেখানে পরিবারের সঙ্গে কিছু নিরিবিলি সময় কাটানোর কথা, সেখানে শুরু হয় অনবরত ডাকাডাকি ও বেচাকেনা। ফলে যাওয়ার সময় যে আনন্দ থাকে, অনেক সময় ফেরার পথে সেটি আর থাকে না। বরং মনে হয়, একটু স্বস্তির জন্যই যেন এত দূর আসা!
বছরে দু-একবার পরিবার নিয়ে কক্সবাজার যাওয়া হয়। আবার দুই-তিন মাস পরপর দেশের অন্য কোনো প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক বা দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়। প্রতিবারই যাওয়ার আগে থাকে আলাদা এক উত্তেজনা। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর অতিরিক্ত ভাড়া, যানজট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, খাবারের মান ও দামের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কিংবা প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতি অনেক সময় সেই আনন্দকে ম্লান করে দেয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করছি, নাকি শুধু পর্যটক জড়ো করার জায়গা তৈরি করছি?
এই প্রশ্ন এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের ভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। প্রযুক্তির মাধ্যমে গন্তব্য নির্বাচন, ভ্রমণ পরিকল্পনা, টিকিট ও হোটেল বুকিং, আবহাওয়ার তথ্য, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সহজ করা সম্ভব।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে—আমাদের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কি সেই প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? অ্যাপের পর্দায় একটি সৈকতকে যতই পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ দেখানো হোক, বাস্তবে যদি পর্যটককে ভাঙাচোরা সড়ক, অনিয়ন্ত্রিত বেচাকেনা, অতিরিক্ত ভাড়া কিংবা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত পর্যটনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বদলাতে পারবে না।
কারণ, একটি পর্যটনকেন্দ্রের সাফল্য শুধু কতজন পর্যটক সেখানে গেলেন, কতটি হোটেল-রিসোর্ট হলো কিংবা কত টাকা বিনিয়োগ হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। পর্যটক সেখানে কতটা নিরাপদ ছিলেন, কতটা স্বস্তি পেয়েছেন, পরিবেশ কতটা পরিচ্ছন্ন ছিল, সেবার মান ও দাম কতটা যুক্তিসংগত ছিল এবং ফিরে এসে তিনি আবার সেখানে যেতে চাইলেন কি না—এসবও পর্যটনের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কক্সবাজার তার বড় উদাহরণ। সমুদ্রের বিশালতা, দীর্ঘ সৈকত আর প্রকৃতির সৌন্দর্য কক্সবাজারকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু সৈকতের ছাতার নিচে চৌকিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখার সময়টুকু একটু স্বস্তিতে বসতে গেলেই চারদিক থেকে শুরু হয় হকারদের আনাগোনা। চা, কফি, ডিম, চানাচুর, ঝালমুড়ি, বাদাম, কলা, জুস, কোমল পানীয়সহ নানা পণ্য নিয়ে একের পর এক বিক্রেতার ডাকাডাকি চলে।
এর সঙ্গে যোগ হয় ভিক্ষুকের আনাগোনা, উচ্চ শব্দে সাউন্ডবক্সে গানবাজনা, শরীর ম্যাসাজের প্রস্তাব, ছবি তোলার আহ্বান কিংবা বিচ বাইকের দাপট। ফলে যে সৈকতে মানুষ মানসিক প্রশান্তির জন্য আসে, সেখানেই একপর্যায়ে তৈরি হয় বিরক্তি।
কক্সবাজারের এ সমস্যার সমাধান উচ্ছেদে নয়, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা দরকার। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট বিক্রয় এলাকা, পরিচয়পত্র, মূল্যতালিকা ও আচরণবিধি করা যেতে পারে। সৈকতের কিছু অংশকে ‘কোয়ায়েট জোন’ হিসেবে নির্ধারণ করা গেলে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকেরা কিছুটা নিরিবিলি সময় পাবেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, সতর্কতামূলক পতাকা, ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা জোরদার করা প্রয়োজন। এতে পর্যটকের নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় মানুষের জীবিকার পথও অযথা বন্ধ হবে না।
কক্সবাজারের পর্যটন অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সন্ধ্যার পরের সময়। মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি, রামুর বৌদ্ধপল্লি, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক কিংবা মহেশখালী ঘুরে সন্ধ্যার পর অনেক পর্যটকের হাতে তেমন কিছু থাকে না। অথচ এই সময়টিই হতে পারে স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার বড় সুযোগ। রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা, স্থানীয় সংগীত ও নৃত্য, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, সাংস্কৃতিক মেলা কিংবা উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন পর্যটকের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। এতে শুধু পর্যটকই আনন্দ পাবে না, স্থানীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
বাংলাদেশের পর্যটনে কৃষিও হতে পারে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ভাবুন, শহরের একটি শিশু প্রথমবার পাকা ধানের মাঠে হাঁটছে, গাছ থেকে আম-লিচু তুলছে, পুকুরে মাছ চাষ দেখছে কিংবা কৃষকের সঙ্গে সবজি তুলছে—এটিও হতে পারে ভ্রমণের আনন্দ। ধানের খেত, ফলের বাগান, ফুলের মাঠ, চা-বাগান, মাছের খামার ও সমন্বিত কৃষি খামারকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে কৃষি পর্যটন। তবে এর জন্য প্রয়োজন ভালো যাতায়াত, নিরাপদ পানি, শৌচাগার, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও নিরাপত্তা। কৃষকের কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকা ও সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের সহায়তায় অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষি পর্যটন একদিকে মানুষের নতুন অভিজ্ঞতা দেবে, অন্যদিকে কৃষকের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও পর্যটনের বড় সম্পদ। পাহাড়-হ্রদের পার্বত্য অঞ্চল, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের চা-বাগান ও হাওর, কুয়াকাটার সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, নদী ও চরাঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা—প্রতিটি জায়গার রয়েছে আলাদা গল্প। এসব জায়গাকে শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে নয়, আলাদা আলাদা পর্যটন অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরতে হবে। ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় স্থানগুলোর উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের বৈচিত্র্য তুলে ধরা জরুরি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে কানারাজার গুহা বা কুদুম গুহার মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং নতুন নতুন সুন্দর স্থানকে পর্যটকদের কাছে পরিচিত করে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের বৈচিত্র্য তুলে ধরতে আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে সুপরিকল্পিত বিপণন পরিচালনা করা সময়ের দাবি।
কৃষি পর্যটনের মতোই দেশের পাহাড়, হাওর, সুন্দরবন, নদী, চা-বাগান ও প্রত্নস্থলকে ঘিরেও নতুন নতুন পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পর্যটন উন্নয়ন মানে শুধু হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ নয়। প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন টয়লেট, নিরাপদ পানি, বিশ্রামের স্থান, তথ্যকেন্দ্র, ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত আলো, প্রশিক্ষিত গাইড, লাইফগার্ড ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
এখানেই প্রযুক্তির প্রকৃত ভূমিকা। একটি সমন্বিত ডিজিটাল পর্যটন প্ল্যাটফর্মে গন্তব্যের তথ্য, আবাসন, পরিবহন, খাবারের মূল্য, আবহাওয়া, ভিড়ের অবস্থা, জরুরি নম্বর ও নিরাপত্তা সতর্কতা পাওয়া যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পর্যটকের চাহিদা, মৌসুমি ভিড় ও ভ্রমণপ্রবণতা বিশ্লেষণ করে সেবার পরিকল্পনা করা সম্ভব। কোনো এলাকায় পর্যটকের চাপ বেড়ে গেলে আগাম সতর্কতা দেওয়া, বিকল্প গন্তব্যের তথ্য দেওয়া কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজও প্রযুক্তির মাধ্যমে করা যায়।
তবে প্রযুক্তি যেন শুধু প্রচারণার হাতিয়ার না হয়। একটি সুন্দর ছবি, আকর্ষণীয় ভিডিও কিংবা স্মার্ট অ্যাপ পর্যটককে গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে; কিন্তু সেখানে তাকে স্বস্তি দেওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভালো অভিজ্ঞতা দেওয়ার দায়িত্ব মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার। অর্থাৎ ডিজিটাল পর্যটনের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব পর্যটন ব্যবস্থার মানের ওপর।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, পর্যটন একক কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। পর্যটনসংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ বিভাগ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া টেকসই পর্যটন সম্ভব নয়। পর্যটককে শুধু রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না; তাকে দিতে হবে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও স্বার্থকেও পর্যটন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রকৃতি আমাদের অসাধারণ এক সম্পদ। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী ও হাওরের পাশাপাশি ধানখেত, ফলের বাগান, ফুলের মাঠ, পুকুর, খামার এবং কৃষকের জীবনও হতে পারে আমাদের পর্যটনের নতুন গল্প। বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ তাই শুধু প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার দিন নয়; প্রযুক্তির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে মিলিয়ে দেখারও সময়।
পর্যটনের সাফল্য শুধু কতজন মানুষ একটি জায়গায় গেল, তা দিয়ে মাপা যায় না। সাফল্য তখনই, যখন একজন পর্যটক নিরাপদে, স্বস্তিতে ও আনন্দ নিয়ে ঘুরে ফিরে এসে বলে—‘আবারও এখানে আসতে চাই।’ ভ্রমণের শুরুতে যে আনন্দ থাকে, যাত্রা শেষে যদি সেই আনন্দ আরও বড় হয়ে ফিরে আসে, তবেই বলা যাবে—আমরা সত্যিকার অর্থে পর্যটনের পথে এগোচ্ছি।
* লেখক: মো. বশিরুল ইসলাম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়