নাইওর
‘পূবালী বাতাসে। আমি বাদাম দেইখা চাইয়া থাকি। আমার নি কেও আসে রে। আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে...।’ এই গান শোনলে হালানির মন কেমন করে। মনে চায় সবকিছু ছাইড়াছুইড়া বাপের বাড়ি চইলা যাইতে। গত কোরবানির ঈদে হালানির বিবাহ হইছে। বিয়ার কথা হোনলে বেবাক মাইয়্যার মতন হালানির মনেও পুলক জাগছে। বাড়ির ঘাটায় পুকুরপাড়ের কলমিগাছের কলমি ফুল দুই কানে গুঁইজা সেও পুরা গ্রাম খুশির আনন্দে ঘুইরা বেড়াইছে। আহ্, বিয়া যে কত্ত মজা। জামাই, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, দেওর কত নতুন নতুন সম্বন্ধ। হালানি মনে মনে শ্বশুরবাড়ির একটা ছবি আঁকে। একটা ছোট ঘর, ঘরের পাশে রান্নাঘর, একটা চাপকল, দুইটা গাভি, একটা নাড়া পাড়া, ছোট্ট পুকুর। হালানি যত্ন কইরা সংসারের কাম করব। ভোর–বিহানে ঘুম থেইকা ওঠব। গোয়ালঘরেতন গরুগুলা বাহির করব। গরুর গামলায় খৈল–ভুসি মিশাইয়া দিব, কিছু নাড়া কুচি কুচি কইরা কাইটা গামলায় দিব। গরুগুলা মজা কইরা সেই নাড়া খাইব। তারপর গোবর দিয়া উঠান লেপব, বাকি গোবর দিয়া মুইট্ট্যা বানাইব। কাম শেষ হইলে চ্যাপা ভর্তা কইরা পান্তা দিয়া স্বামীরে ভাত দিব। স্বামীর খাওয়া শেষ হইলে বগা কাঁচি হাতে ধরাইয়া কামে পাঠাইব। স্বামী চকে যাইব নিড়াইতে। হালানি গরম ভাত রানব। ভাতে দুইডা আলু ও একটা কাপড়ে কিছু ডাইল সিদ্ধ করব। দুপুর বেলা চিকন পাড়ের তাঁতের শাড়ি পইরা গরম ভাত, ডাইলভর্তা, আলুভর্তা ও পোড়া মরিচ লইয়া স্বামীর লইগা নিয়া যাইব। খেতের আলে বইয়া স্বামীরে সে ভাত বাইড়া দিব। স্বামী কইব—‘নেও, তুমিও কয়ডা খাও।’ খেতের আলে বড় কলমিগাছের ছায়ায় তারা বইব। একটা চিল আকাশে ওইড়া ওইড়া দূর থেকে তাগোর খাওন দেখব। একটা ঢোল কাউয়া দুইডা ভাতের আশায় তাগো আশেপাশে ঘুরঘুর করব। খাওয়া শেষ হইলে স্বামী কইব, ‘খারাও, তোমার লাইগা কিছু ঠোয়া পুটকি ফল পাইছি।’ নীল নীল ও লাল লাল ছোট ছোট বুনবুনির মতন ফলগুলা দেইখা হালানি খুশি হইব। বাড়ি আইসা হালানি গোসল করব। নাইকল তেল চুলে দিব, সরিষা তেল গায়ে মাখব। কাঁকই দিয়া সুন্দর কইরা চুলগুলা আঁচড়াইব। যখন রাইত হইব স্বামীর লগে সুখ–দুঃখের গল্প করব। বেড়ার ফাঁক দিয়া তাগোর মুখে চান্দের আলো পড়ব। চান্দের আলোয় হালানির রূপ দেইখা তার স্বামী কইব—‘বউ, তুমি বড়ই সুন্দর, বড়ই সুন্দর।’
আজ হালানির বিবাহ। বর আসব রূপসাগর গ্রাম থেকে। সেই গ্রাম অনেক দূরের পথ। ডিঙি নৌকায় করে বরযাত্রী আসবে হালানিগো বাড়িতে। বিবাহ উপলক্ষে বাড়িতে সাজসাজ রব। ঘরে হালানিকে সাজানো হচ্ছে। চুড়ি, নাকফুল, বালা, স্নো, পাউডার, আলতা, চুল বাঁধার ফিতা আর লাল টকটকে এক শাড়ি। হালানির মুখ থেকে হাসি আর সরে না। মা আসে, বাবা আসে, ছোট ছোট ভাই–বোন আসে। সবাই আজ খুশি। বাড়ির গাছগুলো চুনকাম করা হয়েছে। একটা কাগজের গেট লাগানো হইছে। মাটির হাঁড়িতে চড়ানো হয়েছে বালাম চাল, রুই মাছ, ডাল আর মিষ্টান্ন। সাথে আছে নানা রকম পিঠা। বর আসে। চারদিকে হইচই। গেইটে বাচ্চাদের চেঁচামেচি। হালানির মন আজ কানায় কানায় পূর্ণ। খাওয়ার আগে বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়। শুরুটা ভালো হয়। কিন্তু জামাইরে কী দিব, এইটা নিয়া একটা খুব তর্কবিতর্ক হয়। সমাধানে আসা যায় না। দুই পক্ষই অনড়। ‘পোলায় কি আমার ভাইস্যা আইছেনি। একটা সাইকেল, রেডিও আর একটা স্বর্ণের চেইন। এইডা কি খুব বেশি চাইছিনি। হেইডা দিতে না পারলে মাইয়া বিয়া দিব ক্যামতে। ওঠ, চল সবাই। আর এক মুহূর্তও এইখানে থাকন যাইব না।’ একটা হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। ভেতর থেকে হালানি কেঁপে ওঠে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। ‘আরে করেন কী, করেন কী?’ গ্রামের মাতবর সাব সবাইকে থামায়। ‘আরে যৌতুক দেওনের সময় কি ফুরায় যায়নি। এখন আষাঢ় মাস, আগামী আষাঢ় মাসের আগেই হালানির বাপ সব ব্যবস্থা করব। কী কও হালানির বাপ? হালানির বাপ কথা কও না ক্যান।’
‘আপনে যা ভালো মনে করেন মাতবর সাব।’
‘তয় তো হইয়াই গেল। কাজি সাব, বিয়া পড়ান।’
হালানির শ্বশুরবাড়ি ম্যালা দূরের পথ। হুগনার দিনে পুরা দুই দিনের হাঁটাপথ। বর্ষাকালে নৌকা দিয়া আইতে বেশি সময় লাগে না। সকাল সকাল রওনা দিলে বিয়ালে বাড়ির ঘাডায় গিয়া উডন যায়। হালানি বাড়িরতন বিদায়ের সময় শক্তই আছিল; কিন্তু যখন বাপের সামনে দাঁড়াইয়া তার হুগনা মুখের দিকে চাইল তখন আর নিজেরে ধইরা রাখতে পারে নাই। বাপের বুকে ঝাঁপাই পইড়া কানছে। বাপ কান্দে নাই। হাসি মুখে বিদায় দিছে। ‘দূর পাগল মাইয়া, কান্দস ক্যান। শীঘ্রই তোরে নাইওর আনমু। এইতো আর কয়ডা দিন।’
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
তারপর—ম্যালা দিন চইলা গেছে। বাপজান তার কতা রাখতে পারে নাই। বিয়ার পর অতি বৃষ্টিতে বেবাক ধান তলায় গেছে। যা ধান পাইছে তা দিয়া বছরের খোরাকিই জোগাড় হয় নাই। ধারকর্জ কইরা খাজনার টাকা শোধ দেওন লাগছে। কথা আছিল বিয়ার পর হালানির জামাইরে রেডিও, সাইকেল ও স্বর্ণের চেইন দিব। হালানির বাপ কথা রাখতে পারে নাই। মাইয়ারেও আর নাইওর নিতে পারে নাই। মাইয়া তার পর হইয়া গেল। গরিব বাপের মাইয়া বিয়ার পর আর মাইয়া থাকে না। মাইয়ার দাবি নিয়া আর তার সামনে খাড়ন যায় না।
পুবালি বাতাস বাড়ে। মাঝরাইতে হালানির হাহাকার বাড়ে। মায়ের মুখ, বাপজানের মুখ, ছোট ভাই-বোন, পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনের কথা মনে পড়ে। কিন্তু তাগো দেখনের সামর্থ্য তার নাই। একটা নাও মাঝরাইতে কে জানি বাইয়া যায় হালানির ঘরের পাশ দিয়া। নতুন বর্ষার পানিতে নাওয়ের নিচে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হয়। এমন একটা নায় কইরা হালানির নাইওর যাওনের সাধ জাগে। কিন্তু এই সাধ তার কবে পূরণ হইব, সেই কথা সে জানে না।
*লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর