কয়েক দিন দেখা হলো নুরু মিয়ার সঙ্গে। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার স্ত্রী কেমন আছেন এখন? জড়ানো গলায় বললেন, ভালো না, খুব খারাপ। যেকোনো সময় কিছু একটা হয়ে যাবে। (আমার লেখে পড়ে সানি দত্ত নামের একজন মহান মানুষ নুরু মিয়াকে দুটি মুঠোফোন কিনে দিয়েছিলেন যেন নুরু মিয়া কাজে এসেও অসুস্থ স্ত্রীর খোঁজখবর নিতে পারেন)।

এই যে একা বাসায় রেখে এসেছেন, কী খাচ্ছেন বা কে দেখছে ওনাকে? এক নাতবউ আছে, সে–ই দেখে। আর রাতে গিয়ে আমি প্রস্রাব–পায়খানা পরিষ্কার করি।

আপনার কষ্ট হয় না? সারা দিন পরিশ্রম করে আবার বাসায় ফিরে এসব করতে? কষ্ট হইলে আর কী করুম কন। আমি ছাড়া তো হের আর কেউ নাই। নুরু মিয়ার কষ্টের কথা শুনেও ভেতরে-ভেতরে এক ভালো লাগা কাজ করল। আমি ছাড়া হের তো আর কেউ নাই। কী প্রেম, কী মায়া! আজকাল এসব খুব একটা দেখা যায় না। এখন তো ঘর না বাঁধতেই ঘর ভেঙে যাওয়ার ভয়। মনে মনে গেয়ে উঠলাম…

‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা
ও মন জানো না
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা।’
সত্যি, জীবনের পড়ন্তবেলায় এমন দায়িত্বশীল একজন মানুষ সব মানুষই যদি পেত, তবে জীবনের সংজ্ঞা বদলে যেত। ভালোবাসার রং দারিদ্রতায় মুছে যায় না।

নুরু চাচা, চাচি মারা গেলে আপনার কী হবে? কী আর হবে মা, এমনেই একদিন আমিও মরে যাব। কথা বলার শক্তিটুকু নিবু নিবু প্রদীপের মতো নিঃশেষ হয়ে বের হচ্ছিল। খুব মায়া হলো আজ নুরু মিয়াকে দেখে। একধরনের সংশয় নিজের ভেতরেও অনুরণিত হলো। জীবন কি তবে এভাবেই ফুরিয়ে আসে? বাস্তবতা-দারিদ্রতা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় তা বোঝা মুশকিল।

পুরো পৃথিবী যেখানে অর্থনৈতিক চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষ কেমন আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিত্যপণ্যের দাম যেখানে আকাশছোঁয়া, সেখানে এ টাকার পাহারাদার নুরু মিয়া মাসে কয় টাকাই–বা রোজগার করেন। ভালোমন্দ খাওয়া তো দূরের কথা, নুন–তেল–সবজি জোগাতেই হয়তো নাভিশ্বাস উঠে যায়।

খুব মায়া হলো আজ নুরু চাচাকে দেখে। বললাম, চাচা, আপনার কি কিছু খেতে ইচ্ছে করে?

বললেন, হ্যাঁ করে (একটু ভেবে)।
কী খেতে ইচ্ছে করে আপনার?
এই একটু মাছ দিয়ে ভাত খাইতে মন চায়।
কী মাছ চাচা?
পাঙাশ মাছ হইলে খাইতাম।

নুরু মিয়ার সঙ্গে কথা বলে বের হয়ে এলাম। মনে মনে ভাবলাম, আমরা যে শহরে থাকি, সেই শহরে মাত্র কয়েক টুকরা পাউরুটির দাম ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত (যাকে বলে পিৎজা), এর কম দামেও এ খাবার মেলে। অথচ নুরু মিয়া সামান্য কয়টা টাকা দিয়ে পাউরুটি আর কলা দিনে নাশতা সারেন, কখনোবা দিনও পার হয়ে যায়। নুরু মিয়ার কেন ইলিশ মাছের কথা মনে না এসে পাঙাশ মাছের কথা কেন মনে হলো, তা বুঝতে পারলাম না। এটা কি তবে অভ্যাসের ভুল। কত রকম বৈষম্য আমাদের। মানুষে মানুষে, ধর্মে–বর্ণে আর ভাবনাচিন্তায় যে কত ব্যবধান, সে যারা কেবল মানুষ চরিয়ে বেড়ায়, তারা জানে।

এ সমাজে কতভাবে টাকার ব্যবহার হয়, তা কি আমরা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখি? কেউ মেয়ের বিয়েতে বিদেশি বাজনাবাদক এনে উগরে দেয় টাকা, আবার কতজন রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পাতে মেয়ের বিয়েতে দুটি খরচ করবে বলে।

ভালো করে তাকিয়ে দেখুন না নুরু মিয়ার ন্যুব্জ হয়ে আসা শরীর আর ঘোলাটে চোখ তো তেমনটাই বলছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়তো তাঁকে পাহারা দিয়ে যেতে হবে এই টাকার মেশিন, যেখানে গোটা চারেক সংখ্যা টিপলেই গলগল করে বেরিয়ে আসে চকচকে অসংখ্য নোট।

নুরু মিয়া নির্বিকার চেয়ে দেখেন আর মনে মনে হয়তো ভাবেন, টাকা থাকলে অন্য রকম হতে পারত জীবনটা। আরাম–আয়েশে বাকি দিনগুলো পার হতো। অসুস্থ বউটাকে ভালো একজন ডাক্তার দেখানো যেত। টাকা থাকলে ছেলেমেয়েরা মূল্যায়ন করত। পাঙাশ মাছের পরিবর্তে বড় বড় পাবদা মাছের ঝোল দিয়ে গরম ভাত খাওয়া যেত। আহা রে টাকা! আহা রে জীবন।

জীবন একদিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ যত দিন বাঁচে, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তবেই সে জীবন পার করতে হয়। হেরে গেলে বা থেমে গেলে চলে না। নুরু মিয়াদের মতো হাজারো মানুষ জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে সৎ পথে টাকা অর্জন করে জীবিকা নির্বাহ করছে এই ইটপাথরের কঠিন শহরে। কজনইবা আমরা তাদের খোঁজ রাখছি। তবু যদি একটুখানি অবসর পাই, তবে দাঁড়াইনা এদের পাশে মানবতার হাত বাড়িয়ে।

ভালো থাকুন নুরু মিয়া। সেরে উঠুন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী।

রোজিনা রাখী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন