দেশের চাবি কার হাতে

‘দেশের চাবি আপনার হাতে’—এই স্লোগানে অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট ২০২৬ আয়োজন করতে যাচ্ছে।

নিঃসন্দেহে জুলাই সনদ ফ্যাসিবাদ দূরীকরণে আওয়ামী লীগ ছাড়া সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবিত এযাবৎকালের বড় প্রেসক্রিপশন। যেটি বাস্তবায়নে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গোলাপি ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ গণভোটের মাধ্যমে পাবলিক ম্যান্ডেট নেওয়া হবে।

সরকারি প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে—

• তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।

• সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।

• সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।

• বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন।

• যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।

• সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।

• ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।

• দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।

• আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন: ইন্টারনেট সেবা কখনো বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।

• দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না।

• রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।

জুলাই সনদে বর্ণিত পয়েন্টগুলোয় দ্বিমতের খুব বেশি সুযোগ নেই। আমরা কেউই চাই না ক্ষমতাসীন কোনো একটি দল বা ব্যক্তি একচ্ছত্রভাবে পাওয়ার এক্সারসাইজ করে নিজেকে বা দলকে ফ্যাসিজমের কণ্টক মালা পরাক।

ওপরের বিষয়াবলিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সবকিছু পাওয়া যাবে, ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না—প্রচারপত্রের শেষে এমনটা বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে উপনীত হওয়া জুলাই সনদের বিষয়গুলো মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত। (ক) সংবিধান সংস্কার সাপেক্ষে সংস্কারের বিষয়গুলো এবং (খ) আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়গুলো। প্রথম ভাগে ৪৭টি অনুচ্ছেদ এবং দ্বিতীয় ভাগে ৪৭টি নিয়ে সর্বমোট অনুচ্ছেদ ৯৪টি।

এই অনুচ্ছেদগুলোয় কোনোটি ৩২টি, কোনোটি ৩০, ২৯, ২৫, ২৪, ২৩টি রাজনৈতিক দল বা জোট একমত হয়েছে। কোনো কোনো দল দ্বিমত পোষণ করেছে বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।

ঐকমত্য কমিশনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপির এককভাবে সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে এবং জামায়াতের অভিজ্ঞতা আছে বিএনপির সঙ্গে সহদল হিসেবে। দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতাবিহীন বাকি দলের গণসমর্থন সর্বজনবিদিত নয়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

জুলাই সনদে বর্ণিত পয়েন্টগুলোয় দ্বিমতের খুব বেশি সুযোগ নেই। আমরা কেউই চাই না ক্ষমতাসীন কোনো একটি দল বা ব্যক্তি একচ্ছত্রভাবে পাওয়ার এক্সারসাইজ করে নিজেকে বা দলকে ফ্যাসিজমের কণ্টক মালা পরাক। আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব, নাকি ‘না’ ভোট দেব, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দল অথবা দলগুলো কি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে?

ঐকমত্যের ঘোষণা অনুযায়ী হাজার মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়ানো প্রস্তাবিত জুলাই সনদের ৯৪টি অনুচ্ছেদের ৭১টিতে ‘রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত’ অংশে নোট হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে, তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’

তার মানে দাঁড়াল, সংবিধান সংশোধন বা আইন, অধ্যাদেশ ও বিধি সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বলটি চূড়ান্ত বিচারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কোর্টে রেখে দেওয়া হয়েছে। তাহলে আমরা ন্যায্যতার পক্ষে সত্যিকারের পরিবর্তিত দেশের চাবিটা কার কাছে খুঁজব?

লেখক: সাংবাদিক