মাইক থেকে মুঠোফোন: বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারে বিবর্তন ঘটছে যেভাবে
একসময় নির্বাচনী প্রচার মানেই ছিল ভোরের কাকডাকা মাইকের আওয়াজ, সাদা–কালো পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া অলিগলি ও চায়ের কাপে জমে ওঠা দীর্ঘ রাজনৈতিক আড্ডা। ভোট চাইতে প্রার্থী বা কর্মীরা সরাসরি মানুষের দরজায় যেতেন ও বলতেন—ভাই, একটা ভোট দিয়েন। এই সরাসরি আহ্বানই ছিল প্রচারণার মূল শক্তি। যদিও তখন প্রচারণার সীমিত মাধ্যম ছিল, তবু সেখানে ছিল স্বচ্ছতা, মানবিক সংযোগ ও রাজনৈতিক সংলাপের এক অন্য রকম মাধুর্য, যা আজ প্রায় অদৃশ্য।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সবকিছু বদলে গেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই পরিচিত দৃশ্যপটে এখন নতুন একটি ডিজিটাল মাত্রা যুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক লড়াই আর শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা চলে এসেছে আমাদের হাতের তালুতে থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। পোস্টারের পরিবর্তে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ফিল্টার, স্লো-মোশন ভিডিও ও চোখ ধাঁধানো ভিজ্যুয়াল। প্রতিটি দলের নিজস্ব থিম সং মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হচ্ছে টিকটক, ইউটিউব ও ফেসবুকে। রাজনীতি যেন ধীরে ধীরে এক ডিজিটাল প্রদর্শনীতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে দৃশ্যমানতা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় শক্তি।
রাজনৈতিক দলগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার সুযোগকে খুব কৌশলপূর্ণভাবে কাজে লাগাচ্ছে। খবর ও কনটেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে লাখো শ্রোতার আবেগে প্রভাব ফেলতে পারে। এআই ব্যবহার করে বিশেষ করে জেন–জি প্রজন্মকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যারা এবার প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন। নেতাদের বক্তব্য ডিপফেকের মাধ্যমে বিকৃত করা হচ্ছে, ভুয়া ফটোকার্ড ও তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে। ফেসবুকের ভুয়া নিউজ চ্যানেলও এই প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া ফানি মিমসের মাধ্যমে জেন–জি প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে, যেখানে অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে বিনোদন বা ভাইরাল হওয়াই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো শিশুদের ব্যবহার। নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের জড়ানো—যেমন তাদের দিয়ে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া বা আক্রমণাত্মক বক্তব্যে অংশগ্রহণ করানো—শুধু অনৈতিক নয়, এটি শিশুদের অধিকারকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছে। ভোটের রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়ার জন্য তাদের ব্যবহার করলে গণতান্ত্রিক নীতিমালা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এখানে শিশুদের ভবিষ্যৎ নয়, রাজনৈতিক স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা এই নির্বাচনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক।
জেন–জি প্রজন্মের উপস্থিতি এই নির্বাচনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই প্রজন্মের। তারা রাজনীতি বোঝে ফেসবুক পোস্ট, রিলস, ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ এবং ভাইরাল মিমসের মাধ্যমে। প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও রাজনৈতিক সচেতনতার ক্ষেত্রে তারা সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে। সাজানো কনটেন্ট, ভাইরাল ভিডিও ও ফানি নিউজ তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। জুলাই বিপ্লব থেকে দেখা গেছে, জেন–জি প্রজন্ম পরিবর্তন চায় ও একটি স্বচ্ছ, সুন্দর কাঠামোর সরকার চায়। রাজনৈতিক দলগুলো এই পরিবর্তনের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করছে, যা কখনো কখনো বাস্তব আলোচনার চেয়ে প্রভাব বিস্তারে বেশি মনোযোগ দেয়।
তবু সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি তথ্যবহুল এবং সর্বক্ষণ আপডেট থাকা একটি মাধ্যম। কোথায় কখন সংঘর্ষ হচ্ছে বা কে কাকে আক্রমণ করছে—এ ধরনের খবর অনেক সময় প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়। জেন–জি প্রজন্ম প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে। তারা স্ট্যাটাস, পোস্ট ও হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশ করছে, বিশেষ করে নির্বাচন ও সরকারের কাঠামো নিয়ে। সুতরাং, সোশ্যাল মিডিয়া কেবল বিভ্রান্তির হাতিয়ার নয়; এটি অংশগ্রহণ ও সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করছে।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এই নির্বাচনকে বিশ্বের প্রথম জেন–জি প্রভাবিত নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এটি স্পষ্ট করে যে ভোটারদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, তবে গণতন্ত্রের গভীরতা বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তাই ভোটারদের জন্য প্রয়োজন শুধু তথ্য নয়; তাদের সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সঠিক বিশ্লেষণই গুরুত্বপূর্ণ।
আমার মতে, এই ডিজিটাল অভিযোজন তখনই ইতিবাচক হবে, যখন নৈতিকতা ও সততা তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তরুণদের আবেগ নয়, বরং যুক্তি, নীতি ও সত্যের ওপর ভর করে বার্তা পৌঁছানো। নতুন ভোটারদেরও দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করা এবং শালীনভাবে মত প্রকাশ করা। সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রের ভিত্তি যেন কখনো দুর্বল না হয়। না হলে আমরা শুধু চোখ ধাঁধানো কনটেন্টের রাজনীতি দেখব, যেখানে ভোটাররা মূল উদ্দেশ্য এবং নীতি বোঝার সুযোগ হারাবে।
প্রযুক্তির ক্ষমতা ও নির্বাচনী প্রচারণার নতুন কৌশল ব্যবহারের সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব এবং সততা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে, নির্বাচনী অভিযান কেবল ডিজিটাল চেহারায় সজ্জিত থাকবে, কিন্তু নৈতিকতাহীন, বিভ্রান্তিকর ও শিশুদের ব্যবহার করে নির্মিত একটি প্রদর্শনীতে পরিণত হবে।
লেখক: ফারহানা মীম, শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]