বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সমাজের এলিট শ্রেণি যদি তা একবার বুঝত অন্তর দিয়ে, তবে সাগ্রহে মধ্যবিত্তদের গোপনে সহায়তা দিত। কারণ, মধ্যবিত্তরা সহজে কারও কাছে হাত পাতে না লজ্জায়। রাষ্ট্রও বৈরী আচরণ করে মধ্যবিত্তদের সঙ্গে। ভিজিএফ কার্ড বা রেশন কার্ড, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতার কার্ড ইত্যাদি কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ–সুবিধার আওতায় নেই মধ্যবিত্তরা। ছেলেমেয়েদের সেই ক্লাস নাইন থেকে ছাত্র পড়িয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে দেখা যায় অহরহ। এ কেমন উঁচুনিচুর বৈষম্যে তৈরির সমাজ ব্যবস্থা! তবে মধ্যবিত্তের সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি সফল হয়। তখন ধনী ঘরের ছেলে বা মেয়ে বিয়ে দিতে তাদের সঙ্গে ধনীশ্রেণি উঠে পড়ে লাগে। এ তো রত্ন, তারা সহজেই বুঝে যান। তত দিনে তারা মধ্যবিত্তের কালিমামুক্ত হয়ে নব্য এলিট শ্রেণিতে পদার্পণ করে কিনা! অথচ এই অবস্থানে আসতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আসতে হয়েছে। তখন কিন্তু এলিটদের অবহেলার নজরই বেশি ছিল মধ্যবিত্তের পরিবারের দিকে। নাক ছিটকাত, যখন শুনত তাদের সন্তান পড়তে বা খেলতে গিয়ে মধ্যবিত্তের সন্তানদের সঙ্গে মেশে। ছেলে বা মেয়েটা একেবারে উচ্ছন্নে গেল, তখন বলতে বাধত না এলিটদের।এসব তো সমাজে প্রতিনয়ত ঘটছে, চোখে দেখা একেবারে! এই হলো কঠিন বাস্তবতা।

default-image

আমরা কি কখনো ভেবেছি, এই মধ্যবিত্তের ঈদ উৎসবগুলো কেমন কাটে?
সমাজের বিত্তবান যদি এগিয়ে আসে, তবেই মধ্যবিত্ত বেঁচে যায়। কারণ, মধ্যবিত্তদের কখনোই মুখে সহযোগিতা চাইতে দেখা যায় না। তাদের বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না। তাদের আত্মসম্মানে লাগে ভীষণ। ঈদে মধ্যবিত্তদের সন্তানেরা বাবার আসার পথ চেয়ে থাকে। তাঁর হাতে কোনো থলে দেখলে তারা উচ্ছ্বসিত হয়। আজ হয়তো তাদের বাবা ঈদের কাপড় এনেছে। থলে খুলতেই দেখা যায়, কারও জন্য জামা আবার কারও জন্য সস্তা দামের চটি জুতা এনে কোনরকম বুঝ দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের কেউ কেউ তা মানতে চায় না। কারণ, পাশের বাড়ির আলমগীর তার ক্লাসে পড়ে সহপাঠী, একসঙ্গে মাঠে খেলে, খেলার সাথী। সে ভালো জামা–জুতা পেল, আর নিজের ভাগ্যের কী হাল! তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের অধিকাংশ সন্তানেরা বাবা–মায়ের আয়ের অবস্থা, পরিস্থিতি দেখে চুপটি মেরে থাকে। কিছু বলার মতো সাহস কোথায় ওদের! দুবেলা ডাল–ভাত খেয়ে মাদুর পেতে কোনোরকম খাতা–কলম–বই জোগাড় করে পড়তে পারে, স্কুলে যেতে পারে এই ঢের! পরিবারে আরও সদস্য আছেন, যাঁরা বয়স্ক মানুষ, ফুফু-বাবা-চাচা। তাদেরও কিছু না কিছু ঈদে কিনে দেওয়া সমীচীন। এসব জোগান দিতে দিতে পরিবারের রোজগারকারী নিজের জন্য ঈদের কাপড় আর কিনতে পারেন না। যদি কেউ বলে, ‘এবার তুমি নিজের জন্য কিছু কেনো?’ তখন কর্তা ধমকের সুরে বলেন, ‘কী দরকার বাপু। গত বছরের পাঞ্জাবিটা ধোলাই করে পরলেই হবে। বুড়ো বয়সে এত আর কে দেখে? আর চটিজোড়া পালিশ করিয়ে নিলেই হবে। চকচক করবে দেখো।’ তার মানে নিজেই রোজগার করে সংসারের সবার খুশির জন্য নিজের শখ, ইচ্ছা, খুশির বলিদান করেন মধ্যবিত্তের কর্তাকর্ত্রীরা, যা কাউকেই বুঝতে দেন না। মধ্যবিত্তের পরিবারের একমাত্র প্রশান্তি শুধু সততা ও স্বচ্ছতার হাসিটুকু, যা পৃথিবীতে অমূল্য। রাজার ঘরেও এমন সুখশান্তি মেলা ভার। অভাবে থেকেও মধ্যবিত্তরা মন খুলে হাসতে পারেন। কারণ, তাদের ভেতর কপটতা, মিথ্যাচার আর ধনসম্পদের প্রাচুর্য নেই। আজগুবি কালোটাকা, সম্পদের হিসাবও তাই রাখা লাগে না। একেবারে ওই দিকে চিন্তামুক্ত।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত। সেখানে যে কয়টা পরিবার মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লিখিয়েছে, তাদের অবস্থা বর্তমান চড়া বাজারদরে জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম অভাবের তাড়নায় স্বামী স্ত্রী দুজনেই আত্মহত্যা করেছে। কী মর্মান্তিক সমাজের বাস্তবিক প্রেক্ষাপট! দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। রাস্তাঘাট, উড়ালসেতু, পদ্মা সেতু বা কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফোরজি, ফাইভজি, মেট্রোরেল হচ্ছে। বাস্তবে অন্ন জোগান, অর্থের সংকট, জীবনমানের অধোগতি রয়েই গেছে। ক্ষুধার তাড়নায় শিশু স্কুলে আসলে ছটফট করে, যা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি। এসবের সমাধান কী তবে?

মানুষের জীবন, জীবিকার দায়িত্ব রাষ্ট্র যতক্ষণ নেবে না, মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন যতক্ষণ রাষ্ট্র কর্তৃক জাতীয়করণ হবে না, ততক্ষণ আলতা বানুর ফুল বিক্রির টাকায় পানি পানও কষ্টকর। তারা উড়ালসেতু নয়, পেটে দুমুঠো ভাত চায়। ঈদে একটা ভালো কাপড় চায়, ঈদের দিন ভালোমন্দ খুশি মনে খেতে চায়। ঈদের একটি দিন অন্তত নতুন কাপড় পরে ঈদগাহে যেতে চায়। সবার সঙ্গে কোলাকুলি করতে চায়। ঈদের দিনটিতে আনন্দমুখর সুখে–শান্তিতে কাটাতে চায় দরিদ্র, নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। রাষ্ট্র কি তা উপহার দেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

লেখক: পারভীন আকতার, শিক্ষক ও কবি, চট্টগ্রাম।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন