‘বাড়ি চলো’ ক্যাম্পেইন বা প্রচারণা চালাচ্ছেন মূলত রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের নেতারা। তবে প্রথম এই ‘আন্দোলন’ গড়ে তোলেন প্রয়াত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ মাস্টার। মুহিবুল্লাহ নির্মমভাবে খুন হওয়ার ছয় মাস আগে থেকে শুরু করেন এটি। তাঁর মৃত্যুর পর এটি চালিয়ে নিচ্ছেন তাঁরই সহকর্মীরা। তাঁদের এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন তরুণ-যুবা এবং সর্বস্তরের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ইংরেজি, বর্মিজ ও রোহিঙ্গা—তিনটি ভাষায় তাঁরা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘আমরা মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের (বর্তমান রাখাইন রাজ্য) রোহিঙ্গা জাতি। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের আশ্রয়ে আছি। সে থেকেই রোহিঙ্গাদের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার। ফেরত নিয়ে যাওয়ার আইনি সরকারও নেই মিয়ানমারে। সুতরাং আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। চলো বাড়ি ফিরে যাই।’

রোহিঙ্গাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, দীর্ঘ পাঁচ বছর বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে থাকতে থাকতে তাঁদের ধৈর্যের পারদ সীমা অতিক্রম করছে দ্রুতই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা তাঁদের হতাশ করেছে এবং তাঁরা আর সে আশায় থাকতে চাইছেন না। তাই নিচ উদ্যোগেই বাড়ি ফিরতে চান তাঁরা।

সমাবেশ, বিক্ষোভ ও প্রচারণার পাশাপাশি এ ক্যাম্পেইনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা বিশ্ববাসীর কাছে ১৭ দফা দাবিও তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রোহিঙ্গা স্বীকৃতি প্রদান, অবিলম্বে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল, আরটুপির অধীন আরাকানে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থানকাল কমানো এবং প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ উল্লেখযোগ্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সক্রিয় ভূমিকা পালন।

রাজনৈতিকভাবে ক্যাম্পেইনটি রোহিঙ্গাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর রোহিঙ্গাদের নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দিয়েছিল, যা হয়তো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপশক্তিকে বেশ প্রশান্তি দিচ্ছিল। কিন্তু এমন একটি ক্যাম্পেইন চালানোর পর জনগোষ্ঠীটির জন্য সুযোগ রয়েছে নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনার এবং শূন্যতা পূরণ করার। নতুন নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে অবিচল থাকা এবং নাড়ির টানকে ধরে রাখা। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় গ্রহণ সাময়িক, এটি যেন চিরবন্দোবস্ত হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে সচেষ্ট থাকা। নেতৃত্বের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে জাতির ইতিহাস, চেতনা ও স্মৃতিকে আগলে রাখা; তা না হলে স্বকীয়তা হারানোর ভয় থেকেই যাবে।

শরণার্থীশিবিরের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায়ও ক্যাম্পেইনটির জন্য সামনে বেশ বড় সুযোগ রয়েছে ঐক্য প্রতিষ্ঠার। কয়েক বছর ধরেই শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরোত্তর অবনতি ঘটছে। সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা ও সহিংসতা বেড়েই চলছিল। হতাশ ও সুবিধাবঞ্চিত রোহিঙ্গাদের দুর্বলতার সুযোগে বাড়ছিল এসব অসামাজিক কর্মকাণ্ড। রাজনৈতিকভাবে তরুণ প্রজন্মকে এ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা এবং শিবিরে প্রত্যাবর্তনমুখী ঐক্য তৈরি করা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন খুবই সম্ভব। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

ব্যানার প্ল্যাকার্ডে ইংরেজি ও বর্মিজ ভাষার ব্যবহার এবং রোহিঙ্গাদের ১৭ দফা দাবি থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি; বরং তাঁদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ। তাঁদের নিজ উদ্যোগের ঘোষণা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতায় তাঁদের হতাশার বহিঃপ্রকাশমাত্র। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত হবে রোহিঙ্গাদের এই মরিয়া অবস্থাকে আমলে নেওয়া। গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে জান্তা বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করতে। এ ছাড়া তাদের উদ্যোগের অভাবে সমস্যা কেবলই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে প্রায়ই মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বিশ্ববাসী যেন ভুলতেই বসেছে, যার জলজ্যান্ত উদাহরণ হতে পারে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রদত্ত তহবিলের পরিমাণ কমে যাওয়া। দু–তিন বছর ধরেই তহবিল কমে যাচ্ছিল, যার প্রভাব পড়েছে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা ও রোহিঙ্গাদের সহায়তাতেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে এখনো সময় আছে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অনুধাবন করার এবং দ্রুত প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার।

‘বাড়ি চলো’ রোহিঙ্গাদের ক্রমবর্ধমান হতাশার বহিঃপ্রকাশ এবং আমাদের ব্যর্থতার ফলাফল। এটি রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক সচেতনতার উদাহরণ এবং কালেক্টিভ মেমোরিরও চিহ্ন বটে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে গত পাঁচ বছরে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখার একটি প্রবণতাও তৈরি হয়েছে, যেখানে তাঁদের বেশ নেতিবাচকভাবেই বোঝার চেষ্টা করা হয়। এর পেছনে শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে সৃষ্ট নিরাপত্তার বিষয়গুলোই মূলত দায়ী। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ‘বাড়ি চলো’ গণহত্যার শিকার একটি জাতির নাড়ির টান, যাদের গত পাঁচ বছরেও বাড়ি ফেরা হলো না। তাই এটি একটি নিপীড়িত জাতির অধিকারের প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত হবে ক্যাম্পেইনটির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা। মিয়ানমারের গত পাঁচ বছরের কূটনীতির নমুনা বলে তারা আসলে ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়, বরং তাদের লক্ষ্য সমস্যা দীর্ঘায়িত করা, যাতে বিশ্ববাসী একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দেয় বা ভুলে যায়। এর বাইরেও মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার কুশীলব জান্তাপ্রধানদের ছাড় দেওয়া একদমই ঠিক হবে না। তাঁরা ছাড় পেলে এটি বাজে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ইতিহাসে, যা ভবিষ্যৎ অপরাধীদের উদ্বুদ্ধ করবে। তাই এই ক্যাম্পেইনের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাসীর টনক নড়া উচিত। সর্বশেষে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আকুতি মিয়ানমারে পৌঁছাক, সে কামনা করি, যেখানে আজ আপামর জনতা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন দখলদার জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে।

  • লেখক: ডোরিন চৌধুরী, নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল গবেষক

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন