এডউইন লুটিয়েনস ও হার্বার্ট বেকারের নকশায় তৈরি এই প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস পৃথিবীর সুন্দরতম ভবনগুলোর অন্যতম। শুধু তা–ই নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সাংবিধানিক প্রধানের এ বাসভবন আকার ও আয়তনে সারা পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবনের চেয়ে বড়। রাষ্ট্রপতি ভবন কমপ্লেক্সটি ৩৩০ একরের সুবিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। চারতলা ভবনটিতে কামরা ৩৪০টি। এ কমপ্লেক্সের ১৯০ একরের বাগানে আছে হাজারো প্রজাতির গাছ।

১৯২৯ সালে যখন ভবনটি তৈরি হয়, তখন এর নাম ছিল ভাইসরয়স হাউস। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এ ভবনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় গভর্নমেন্ট হাউস। পরে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের সময় এর নাম হয় রাষ্ট্রপতি ভবন। ২৯ হাজার লোক ১৭ বছর ধরে ভবনটি তৈরি করেন। সাম্রাজ্যিক আধিপত্য ও ক্ষমতার প্রতীক থেকে, ভবনটি আজ ভারতীয় গণতন্ত্র এবং এর ধর্মনিরপেক্ষ, বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐতিহ্যের প্রতীক।

বাংলাদেশ থেকে আগত ইয়ুথ ডেলিগেটদের সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হবে দরবার হলে। ফোরকোর্ট থেকে দরবার হলে ঢোকার জন্য মাড়াতে হবে প্রশস্ত ৩১ খানা সিঁড়ি। লাল বেলে পাথরের সিঁড়িতে গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে আমাদের জন্য। জীবনে প্রথম লাল গালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর। ভবনের বেদিতে উঠে খানিকটা হেঁটে গেলেই দরবার হল। এই বৃত্তাকার দরবার হলেই মাননীয় রাষ্ট্রপতি উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভারত সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হয় এ দরবার হলেই।

দরবার হলে পা রাখতেই যেন একটা অন্য রকম প্রশান্তির পরশে বুকটা শীতল হয়ে গেল। ভবনের সুউচ্চ ছাদ থেকে ঝোলানো মখমলের লাল পর্দার নিচে পাতা আছে রাষ্ট্রপতির আসন। তার সামনে সারি ধরে পাতা হয়েছে আমাদের জন্য চেয়ার। রাজকীয় চেয়ারে টান হয়ে বসলাম আমরা। কিছুক্ষণ পরই এলেন রাজকীয় ইউনিফর্ম পরা প্রেসিডেন্ট গার্ড। এরপর পিনপতন নীরবতা। খানিক পরেই ঘোষণা করা হলো, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি দরবার হলে প্রবেশ করছেন’। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান জানালাম। প্রবেশদ্বারের পর দ্বিতীয় সারিতে আমার আসন। ঠিক পাশ দিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু হেঁটে গেলেন; এ অনুভূতি একেবারেই ভিন্ন রকম।

আমাদের এই সফরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত ছিল চমকে পরিপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরুর পূর্বে বাংলায় জানতে চাইলেন ‘কেমন আছেন?’ ছোট দুটি শব্দ। প্রতিদিন শতবার শুনি আমরা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি মুর্মুর মুখ থেকে শব্দ দুটি শুনে আবেগপ্রবণ হয়েছি। কর্ণ ইন্দ্রিয় যেন পুলকিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণের পুরোটা সময় বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির প্রশংসা করলেন। জানালেন বাংলাদেশের তরুণদের অগ্রযাত্রায় তাঁর মুগ্ধতার কথা। আগামীতে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় যাবে, দৃঢ়তার সঙ্গে সে আশাবাদও ব্যক্ত করলেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিনয়ী মানুষটির বক্তব্য শুনছিলাম। আট মিনিটের মোহনীয় বক্তব্য যেন নিমেষে শেষ হয়ে গেল।

দরবার হলের অনুষ্ঠান শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় অশোকা হলে। লং ড্রইংরুম আর ব্যাঙ্কুয়েট হলের সামনের করিডর দিয়ে যাওয়া যায় অশোকা হলে। রাষ্ট্রপতি ভবনে যতগুলো করিডর আছে, তা একসঙ্গে হিসাব করলে লম্বায় হবে আড়াই কিলোমিটার! করিডরের দুই পাশের দেয়ালজুড়ে বিখ্যাত সব শিল্পীদের চিত্রকর্ম ঝোলানো। পৃথিবীতে কিছু অভিজ্ঞতা নিজে পরখ না করলে সেই অভিজ্ঞতার সুখানুভূতি অন্যকে ঠিকঠাক বোঝানো যায় না। রাষ্ট্রপতি ভবনের করিডর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা ঠিক এমনই। করিডরের বাঁকে বাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা প্রেসিডেন্ট গার্ডরা। মিষ্টি করে মুচকি হেসে আমাদের সম্ভাষণ জানাচ্ছিলেন তাঁরা।

আশোকা হলে প্রবেশের পর হলের দেয়াল আর ছাদের সুনিপুণ কারুকার্য ও শিল্পকর্ম দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল আমাদের। রাষ্ট্রপতি ভবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সুসজ্জিত হলগুলোর মধ্যে একটি এ অশোকা হল। সুবিশাল ও শৈল্পিকভাবে তৈরি হলটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হয়। এখানেই ভারতে অবস্থিত বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসের প্রধানেরা রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁদের পরিচয়পত্র পেশ করেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজ শুরুর আগে সফররত বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পরিচিতির জন্য আনুষ্ঠানিক স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই অশোকা হল। এই হলেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেলাম আমরা! হলের দুই পাশে একসারি চেয়ার আর তার পেছনে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। সামনের সারির ঠিক মাঝখানে রাষ্ট্রপতির জন্য আসন, তার দুই পাশের দুই চেয়ারে বসবেন দুই সচিব। আমাদের মেয়েরা প্রথমে সামনের সারিতে বসলেন, পরে বাকি ফাঁকা চেয়ারে বসলেন ছেলেরা। পেছনের সারিতে দাঁড়ালাম আমরা বাকি ছেলেরা। দুই দলের দাঁড়ানো শেষ হলে মাননীয় রাষ্টপতি এলেন। ছবি তোলা শেষে সামনে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করলেন। হাস্যোজ্জ্বল মুখে ব্যাঙ্কুয়েট হলে বিকেলের নাশতার আমন্ত্রণ করে জানতে চাইলেন, আমাদের এই সফরে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না। মানুষের সুখস্মৃতি নাকি ব্রেনের হিপ্পোক্যাম্পাসে সংরক্ষিত হয় পরবর্তী সময়ে বারবার মনে করে পুলকিত হওয়ার জন্য। আমাদের এই ক্ষণ যেন হিপ্পোক্যাম্পাসের বড় একটা অংশ দখল করে নিল মুহূর্তেই।

অশোকা হল থেকে বেরিয়ে লুটিয়েনস গ্র্যান্ড স্ট্যায়ারের পাশের করিডর ধরে খানিক হাঁটলেই আসে ব্যাঙ্কুয়েট হল। লম্বায় ১০৪ ফুট, ৩৪ ফুট চওড়া আর ৩৫ ফুট উচ্চতার এ হলের জৌলুস যে কাউকে মুগ্ধ করবে। বার্মিজ সেগুন কাঠের প্যানেলিং কার্নিশ থেকে মেঝে পর্যন্ত নেমে এসেছে। আর দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান, ড. জাকির হোসেন, ভি ভি গিরি, ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ, সঞ্জীব রেড্ডি, গিয়ানি জৈল সিং, আর ভেঙ্কটারমন, ড. শঙ্কর দয়াল শর্মা এবং কে আর নারায়ণনের বিশাল আকৃতির তৈলচিত্র।

রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁদের সফরসঙ্গীদের জন্য ভোজসভার আয়োজন করা হয় এখানেই। হলের মাঝবরাবর পাতা আছে লম্বা টেবিল। দুই পাশে পাতা রাজকীয় চেয়ার। একসঙ্গে ১০৪ জন এ টেবিলে খেতে পারেন। রানি এলিজাবেথসহ বিশ্বের বাঘা বাঘা রাষ্ট্রপ্রধানেরা ভারতের আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসে খেয়েছেন এই টেবিলেই। আজ আমাদের জন্য এ টেবিলজুড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা ধরনের খাবার!  ব্যাঙ্কুয়েট হলে পুরোটা সময় রাষ্ট্রপতির সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের অমায়িক ও বন্ধুবৎসল ব্যবহারে বিমোহিত হয়েছেন আমাদের সবাই।

ইয়ুথ ডেলিগেশনের ফ্ল্যাগ অব ইভেন্টে পূর্বে ভ্রমণ করে যাওয়া ডেলিগেটরা বলেছিলেন, ‘জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাচ্ছেন আপনারা’। তাঁদের প্রতিটি কথার মিল পেয়ে যাচ্ছি নিখুঁতভাবে। এ ট্যুরের প্রতিটি ধাপে যে সম্মান আর সমীহ পেয়েছি, কোনো কিছুর সঙ্গে তার তুলনা হয় না।

খাওয়ার পর আমরা আট–দশজন মিলে ব্যাঙ্কুয়েট হল ঘুরে দেখছি, এমন সময় এগিয়ে এলেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাঞ্জিভ রাই। হাত বাড়িয়ে কুশল বিনিময় করলেন। বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন, কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না। শুনতে চাইলেন ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। জমে উঠল দারুণ আড্ডা। উঠে এল দুই দেশের অভিন্ন কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আর ইতিহাস–ঐতিহ্যের চমৎকার মেলবন্ধনের কথা। প্রাণবন্ত এ আলোচনায় ছেদ পড়ল সন্ধ্যায়। ফেরার সময় হয়েছে। চারপাশে চোখ মেলে দেখলাম, ভবনের বাসিন্দাদের চোখগুলো যেন  বলছিল ‘আর কিছুক্ষণ থেকে যাও’।

‘অতিথি দেব ভব’ তথা অতিথি দেবতার মতো। এসব কথা শুধু ভারতীয় শাস্ত্রে নয়, বাস্তবে প্রমাণ পাওয়া যায় সারা ভারতেই। ভবন থেকে বের হওয়ার সময় করিডর দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার সময় অনুভব করতে পারছিলাম মানুষগুলোর সঙ্গে এ অল্প সময়ে তৈরি হওয়া আত্মার সম্পর্ক। শুধু দুটি লাইনই মনে পড়ছিল বারবার, ‘একটি মুহূর্ত বেঁচে থাকে একটি ক্ষণের তরে, স্মৃতি থেকে যায় আবহমানকাল ধরে।’ রাষ্ট্রপতি ভবনের এই সুখস্মৃতি চিরসবুজ থকবে আজীবন।

লেখক: পরিবেশকর্মী