বন্ধুর ডাকে প্রাণীর সেবায়

পঞ্চাশোর্ধ্ব ছকিনা বেগম, চারটি ছাগলের উপার্জিত অর্থেই চলে সংসার। হঠাৎ নিজ গ্রামে প্রাণীর চিকিৎসাসেবার ক্যাম্পেইন দেখে ছুটে আসেন। লাগাতার বলতে থাকেন, ‘আমাকে কিছু ওষুধ দেন, ওষুধ দেন।’ কান্নার কণ্ঠে নানা সমস্যা বর্ণনা করে বলেন, ‘গত বছর টাকার অভাবে একটা ছাগল চিকিৎসা করাতে না পারায় মারা গেছে। আমার টাকা বে‌শি নাই, কম রাখবেন ওষু‌ধের দাম?’

ছকিনা বেগমের এই প্রশ্ন শুনে ক্যাম্পেইনের সদস্যরা কিছুটা অবাক হন। অবশেষে তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন যে চি‌কিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ বিনা মূল্যে করা হচ্ছে। উত্তরটা শুনে তাঁর চোখেমুখে প্রশান্তির ছাপ। ঠোঁটের কোণে হাসির ঝলকই প্রমাণ করে কতটা উপকৃত হয়েছেন।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিনা মূল্যে প্রাণীর চিকিৎসাসেবা দিতে প্রথম আলো বন্ধুসভার আয়োজনে বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে এই ক্যাম্পেইন। ক্যাম্পেইনটি করা হয় ব্রহ্মপুত্র নদের জলে প্লাবিত ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপ‌জেলার বয়ড়া ইউনিয়নের আলগী গ্রা‌মে।

আরেক কৃষক আবদুর রহিম, হাতে ও পায়ে কাদামাটি, শরীরে এক সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। সহজেই অনুমেয়, ক্যাম্পেইনে সেবা নিতে ধানের খেত থেকে ছুটে এসেছেন। শুরুতেই বলেন, ‘আমার পাঁচটা গরু, তিনটা গাভি, দুটি বাছুর। আমারেও কিছু ওষুধ দেন।’ বর্ণনা শুনে ও গবাদিপশুর পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম অপুষ্টি ও কৃমির সমস্যায় ভুগছে। সেই অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হলে খুশিতে আত্মহারা তিনি। খুশিতে বলেই ফেললেন, ‘আমার বাড়িতে আসিয়েন ভাই, দাওয়াত রইল। একবার হলেও ঘুরে যাবেন।’

শুধু ছকিনা ও রহিম নন, দেড় শতাধিক অসহায় লোককে সেবা দেওয়া হয়েছে। কারও–বা গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল দুটি, কারও আবার পাঁচটি।

দুপুর থেকেই ক্যাম্পেইনে ছিল মানুষ ও গবাদিপশুর উপচে পড়া ভিড়। সামাল দিতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছিল। ভিড় সামাল দি‌তে অনেকের নাম লিপিবদ্ধ না করেই সেবা প্রদান করা হয়েছে।

ক্যাম্পেইন শুরু করার আগে অনেকটা মানসিকভাবে অপ্রস্তুত ছিলাম। কীভাবে কী করব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দলের সব সদস্যের প্রচেষ্টায় আমরা তা সমাধান করেছি।

গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য সকাল থেকেই চলছিল প্রস্তুতি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসের কয়েক কিলোমিটার দূরবর্তী নদের বিপরীত দিকেই বন্যায় প্লাবিত অঞ্চল বয়ড়া। সেখানে যাওয়ার জন্য প্রথমে অটোরিকশায় নদের ঘাটে যাই। তারপর ঘাট থেকে আধা ঘণ্টা নৌকায় চড়ে সেই অঞ্চলে পৌঁছাই।

যাত্রাপথে চারদিকে স্বচ্ছ জলরাশি ও নদের পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা বেশ রোমাঞ্চকর। কেউ নদের পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরছিলেন, আবার কেউ গোসল করতে ব্যস্ত। নদের নাব্যতা–সংকট দূরীকরণে ড্রেজার দিয়ে নদ খনন করতেও দেখা গেছে।

ক্যাম্পেইন সফল করতে সেই অঞ্চলের লোকজনের আচরণও ছিল সহযোগিতাপূর্ণ। তাঁদের সরল ভাষা বেশ শ্রুতিমধুর ছিল। তাঁদের সেবা দিতে সদস্যরাও বেশ কৌতূহলী ছিলেন। কেউ সাদা অ্যাপ্রন গায়ে থার্মোমিটার, সিরিঞ্জ হাতে গবাদিপশুর দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন, আবার কেউ প্রেসক্রিপশন ও ওষুধ বিতরণে ব্যস্ত। কী দারুণ সেই সময়!

ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণকারী ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থী তাবের জোবায়ের জানান, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সেবামূলক কাজের জন্য এই ধরনের ক্যাম্পেইনের বিকল্প নেই। কৃষকের সঙ্গে মেশার ও তাঁদের গল্প শোনার এটিই সেরা সুযোগ। সেবা নেওয়ার লোকজনের সংখ্যাও অনেক বেশি, তবে চাহিদার কিছুটা কমতি ছিল। প্রথম আলো যদি ইচ্ছা করে পবিত্র রমজান মাসের ভেতর বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যাম্পেইন করতে পারে, তাহলে প্রান্তিক লোকজন সেবামূলক কাজে কিছুটা উপকৃত হবেন।

মাহফুজুর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কার্যক্রম তাঁদের নেতৃত্ব ও চারিত্রিক গঠনে সহায়তা করবে। প্রান্তিক মানুষের দুঃখ শোনার মনমানসিকতা তৈরি হবে। তবে এটি চলমান রাখতে হবে এবং সেবামূলক কাজে নিয়মিত জড়িত থাকতে হবে।

*লেখক: মো. রিয়াজ হোসাইন