কাজী নজরুল ইসলামের জীবনসঙ্গী প্রমীলা নজরুল
‘অধর নিসপিস
নধর কিসমিস
রাতুল তুলতুল কপোল;
ঝরল ফুল-কুল,
করল গুল ভুল
বাতুল বুলবুল চপল।
নাসায় তিলফুল হাসায় বিলকুল,
নয়ান ছলছল উদাস,
দৃষ্টি চোর-চোর
মিষ্টি ঘোর-ঘোর,
বয়ান ঢলঢল হুতাশ।’
কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ‘প্রিয়ার রূপ’ কবিতা যাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন, তিনি হলেন কবির জীবনসঙ্গী প্রমীলা দেবী। মা–বাবার দেওয়া নাম হলো আশালতা সেনগুপ্তা। ডাক নাম দোলন বা দুলি। নজরুলের দীর্ঘদিনের প্রাণপ্রিয় সঙ্গী ছিলেন। আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট কিংবা অভাবের সংসারের সঙ্গী ছিলেন প্রমীলা। খুব অল্প বয়সে নজরুলকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। সমাজের নানা গুঞ্জনা উপেক্ষা করে নজরুল প্রমীলাকে বিয়ে করেন ধর্মান্তরিত না হয়ে। একটি বৈবাহিক চুক্তির মাধ্যমে এই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। নজরুলের বয়স তখন ২৩ বছর। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে তখন তিনি জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে। আর প্রমীলার বয়স ছিল ১৬ বছর। অর্থাৎ ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল (শুক্রবার ১২ বৈশাখ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ), কলকাতার বেনিয়াপুকুরের ৬ নম্বর হাজী লেনের বাড়িতে নজরুলের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর নজরুল আশালতার নাম দেন প্রমীলা। এই বিয়ে নিয়ে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে চলতে থাকে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কবি এর থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য পথ খুঁজতে থাকেন। অবশেষে কবি মে মাসের শেষে (আষাঢ় মাসের প্রথমার্ধ) কলকাতা ত্যাগ করে হুগলিতে চলে যান। এই সময় প্রমীলার মা গিরিবালাও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।
যেভাবে কবির সঙ্গে পরিচয়
প্রমীলা নজরুল বা আশালতা সেনগুপ্তা ১৯০৮ সালের ১০ মে (রোববার ২৭ বৈশাখ, ১৩১৫ বঙ্গাব্দ) মানিকগঞ্জ জেলার শিবলা উপজেলার তেওতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বসন্তকুমার সেনগুপ্ত, মা গিরিবালা সেনগুপ্তা। শৈশবে পিতৃহারা হলে গিরিবালা সেনগুপ্তা তাঁর কন্যা দুলিকে নিয়ে তাঁর দেবর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে প্রমীলা বেড়ে ওঠেন। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে কবি তাঁর বন্ধু আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লায় আসেন। তখন কবি কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে ওঠেন। গত বছর (২০২৫) এই বাড়ি খুঁজতে গিয়েছিলাম, সেখানে আর সেই সেনগুপ্তের বাড়ি নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেলাম, একটা রাস্তার এককোনায় একটি স্মৃতিফলক। যাহোক, কবি এই সেনগুপ্তা পরিবারে বেশ কিছুদিন ছিলেন। এখানে পরিচয় হয় আশালতার সঙ্গে, তখন আশার বয়স ছিল ১৩ বছর। চাচা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী ছিলেন বিরজাসুন্দরী, নজরুল যাঁকে ‘মা’ সম্বোধন করতেন। গিরিবালা সেনগুপ্তাকে নজরুল মাসিমা বলে ডাকতেন। কান্দিরপাড়ে কিছুদিন থাকার পর ১৯২১ সালের ৫ এপ্রিল (মঙ্গলবার, ২৩ চৈত্র ১৩২৭) আলী আকবর খান নজরুলকে নিয়ে যান তাঁর গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে। সেখানে নজরুলের সঙ্গে দেখা আলী আকবর খানের মেজ বোন আসমাতুন নেসার। তাঁর মেয়ে সৈয়দা খাতুনকে দেখে নজরুল মুগ্ধ হন। পরবর্তীকালে কবি সৈয়দা খাতুনের নাম পরিবর্তন করে দেন ‘নার্গিস’। তাঁদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা বুঝতে পেরে আলী আকবর খান নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের বিবাহের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস, সেই বিয়েতে নজরুলকে শর্ত দেওয়ার কারণে তিনি সেটা আর মেনে নিতে পারেননি। বিয়ের রাতে বিবাহ আসর ত্যাগ করে নজরুল দৌলতপুর থেকে কান্দিরপাড়ে চলে আসেন। এরপর এখান থেকে তিনি আবার ফিরে যান কলকাতায়।
প্রায় আট মাস পর নজরুল আবার কুমিল্লায় আসেন। সেটা ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসের শেষে বা নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে হবে। এ সময়ে কবি ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পুত্র বীরেন সেনগুপ্তের বাড়িতে ওঠেন। সেই সময়ে বীরেন সেনগুপ্ত কুমিল্লা জাতীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
বীরেন সেনগুপ্ত বাড়িতে আবার আশালতার সঙ্গে দেখা হয়। প্রায় এক মাসের বেশি নজরুল এই বাড়িতে ছিলেন। আশালতার সঙ্গে কবির বেশ ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের দিকে নজরুল কলকাতার তাঁর ৩/৪ সি তালতলার বাসায় আসেন। এরপর তিনি আবার কুমিল্লায় যান ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এবারও তিনি কুমিল্লার কান্দরপাড়ে বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের বাড়িতে ওঠেন। এ সময় তিনি প্রায় চার মাস কান্দিরপাড়ে ছিলেন। কবির ২৩তম জন্মদিন (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ, ২৫ মে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ) উদ্যাপন হয় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে। সে সময়ে কবি কুমিল্লার মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধার ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। এই চার মাসে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে আড্ডা, গান কিংবা কবিতায় মানুষজনকে মুগ্ধ করে রাখেন। আশালতার প্রতি মুগ্ধ হয়ে কবি লেখেন ‘প্রিয়ার রূপ’, ‘অভিমানী’ কবিতা। দিন দিন সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে লাগে। প্রথম প্রথম মানুষজন সেটাকে তেমনভাবে আমলে নেয়নি। যখন সম্পর্ক আরও গভীরের দিকে যেতে লাগে, তখন শুরু হয় নানা গুঞ্জন। ধীরে ধীরে এটা ওই এলাকায় একটি প্রাত্যহিক আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। বিষয়টি রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ সহজভাবে মেনে নিতে পারছিল না। তাঁরা হয়ে ওঠেন নজরুল-বিদ্বেষী। এ অবস্থায় কবি জুন মাসের শেষের দিকে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় চলে যান। আর আশালতা ও তাঁর মা গিরিবালা সেখানে থেকে সমস্তিপুরে তাঁর পিতার বাড়িতে চলে আসেন।
এ বছর নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী রচনা প্রকাশের জন্য পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। নজরুল গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য সমস্তিপুরে এসে গিরিবালার আশ্রয়ে এসে উঠেছিলেন। ২২ নভেম্বর (বুধবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৩২৯) নজরুল বিহারের সমস্তিপুর থেকে গিরিবালা দেবী ও আশালতা দেবীকে নিয়ে নজরুল কুমিল্লার পথে রওনা দেন। পথে বেলুরে এক বন্ধুর বাড়িতে দুই দিন ছিলেন। এখানে তিনি আর্য পাবলিশিং হাউসের শরচ্চন্দ্র গুহের কাছ থেকে কিছু টাকা পান। এরপর তিনি গিরিবালা দেবী ও আশালতা দেবীকে নিয়ে কুমিল্লায় চলে যান। ২৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৩২৯) দুপুর ১২টার সময় নজরুলকে পুলিশ ইন্ডিয়ান পেনালকোড ১২৪-ক ধারায় কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার, ২ মাঘ ১৩২৯) নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হুগলি জেলে থাকাকালে জেল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থা, অপমানমূলক আচরণ ও নির্যাতনের পরিমাণ এতটাই তীব্রতর হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত ১৫ এপ্রিল (রোববার, ২ বৈশাখ ১৩৩০) থেকে নজরুলসহ মোট ২১ রাজবন্দী অনশন শুরু করেন। ফলে তিনি প্রায় মরণাপন্ন দশায় চলে যান। পরে ১০ জ্যৈষ্ঠ (২৩ মে) বিরজাসুন্দরী দেবী এসে নজরুলের অনশন ভঙ্গ করেছিলেন। ১৫ ডিসেম্বর (শনিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ), কারাবিধি অনুসারে নজরুল এক মাসের রেয়াত লাভ করেছিলেন। সেই সূত্রে নজরুল মুক্তি লাভ করেন। বহরমপুরে দুই দিন নজরুল কাটান নলিনাক্ষ সান্যালের বাড়িতে। তাঁর প্রেয়সী আশালতার দীর্ঘ-অদর্শনে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। এ সময় আশালতার এবং তাঁর মা গিরিবালা কুমিল্লায় ছিলেন। তাই তিনি ১৮ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার, ২ পৌষ ১৩৩০) বহরমপুর থেকে কুমিল্লায় আসেন। আশালতার সঙ্গে নজরুলের প্রণয়ের বিষয়টি তখন কুমিল্লায় আবার সরব হয়ে ওঠে। ফলে নজরুল এবং আশালতা, গিরিবালা ও পরিবারের অন্যরা বেশ অস্বস্তিতে পড়েন। এ ছাড়া কারাবিধি ভঙ্গের মামলায় ১৯২৪ সালে ৯ জানুয়ারি (বুধবার, ২৪ পৌষ ১৩৩০) আবার আদালতে হাজির হওয়ার কথা ছিল। তাই তিনি শর্তে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। এর কিছুদিন পর আশালতা ও গিরিবালা সমস্তিপুরে ফিরে গিয়েছিলেন।
১৯২৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষার্ধে বা মার্চ মাসের প্রথমার্ধের ভেতরে নজরুল খুব স্বল্প সময়ের জন্য সমস্তিপরে আশালতা, গিরিবালার সঙ্গে দেখা করার জন্য গিয়েছিলেন।
বিয়ের পর যেমন কেটেছিল
প্রেম করতে গিয়ে সমাজের নানা গঞ্জনার পর নজরুল-আশালতার বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। শেষে নজরুল এই পশ্চাৎপদ সমাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে হুগলিতে যান, সেখানে গিয়েও বিড়ম্বনায় পড়লেন তিনি। এ প্রসঙ্গে নাসিরউদ্দীন তাঁর ‘সওগাত যুগে নজরুল ইসলাম’ গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮] লিখেছেন—
‘...হুগলীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা নজরুলকে বাড়ি ভাড়া দিতে অসম্মত হয়। তখন একজন বিপ্লবী দেশসেবক নজরুল পরিবারকে হামুদুন্নবী নামক এক মোক্তারের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।...’
হুগলিতে থাকার সময় প্রমীলা নজরুলও একটু-আধটু লেখালেখি শুরু করেছিলেন। দ্বিমাসিক সাম্যবাদী পত্রিকার বৈশাখ ১৩৩২ (এপ্রিল-মে ১৯২৫) সংখ্যায় প্রমীলার একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। কবিতাটির নাম ছিল ‘শঙ্কিতা’। এই কবিতা দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়েছিল সওগাতের মহিলা সংখ্যায়। এরপর দ্বিমাসিক সাম্যবাদী পত্রিকার আষাঢ় ১৩৩২ (জুন-জুলাই ১৯২৫) সংখ্যায় আরও একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। কবিতাটির শিরোনাম ছিল—‘করুণা’।
১৯২৪ সালে ২২ আগস্ট (শুক্রবার ৬ ভাদ্র ১৩৩১) নজরুলের প্রথম সন্তানের জন্ম। শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন তথা জন্মাষ্টমীতে (কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি) এই পুত্রের জন্ম হয়েছিল, তাই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল কৃষ্ণ মহম্মদ। হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পুত্রের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মহম্মদ। অবশ্য পুত্রের জন্য তিনি আরও একটি ইসলামি নাম রেখেছিলেন—আজাদ কামাল। ডিসেম্বর মাসে আজাদ কামালের মৃত্যু হয়।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে (রোববার, ১৯ পৌষ ১৩৩২) নজরুল ইসলাম হুগলি থেকে বসবাসের জন্য সপরিবার কৃষ্ণনগরে চলে আসেন। আগস্ট মাসে নজরুল কৃষ্ণনগরের গোলাপপট্টির বাসা ছেড়ে চাঁদ সড়ক এলাকার ‘গ্রেস কটেজ’-এ চলে আসেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ডা. আবুল কাসেমের আমন্ত্রণে খুলনায় যান এবং সেখান থেকে তিনি খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, দৌলতপুর, বনগ্রাম প্রভৃতি স্থান ঘুরে কৃষ্ণনগরে ফিরে আসেন ৯ অক্টোবর (শনিবার, ২২ আশ্বিন ১৩৩৩)। এই দিন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদের (বুলবুল) জন্ম হয়। নজরুল বাসায় ফিরে তাঁর সন্তানকে দেখতে পান। এই দিনই তিনি মুরলীধর বসুকে পুত্রসন্তান লাভের সংবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন।
‘প্রিয় মুরলীদা!
আজ সকালে ৬টায় একটি “পুত্ররত্ন” প্রসব করেছেন শ্রীমতী গিন্নি। ছেলেটা খুব “হেলদি” হয়েছে। শ্রীমতীও ভালো। আমি উপস্থিত ছিলাম না। হয়ে যাওয়ার পর এলাম খুলনা হতে। খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, দৌলতপুর, বনগ্রাম প্রভৃতি ঘুরে ফিরলাম আজ।...’
১৯২৭ সালে ১৩ মার্চ (রোববার ২৯ ফাল্গুন ১৩৩৩) কৃষ্ণনগরে পুত্র বুলবুলের অন্নপ্রাশন হয়। ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে নজরুল কণ্ঠের ক্ষত রোগে আক্রান্ত হন। এই কারণে ৬ মার্চ (মঙ্গলবার, ২৩ ফাল্গুন ১৩৩৪) তিনি সপরিবার কলকাতায় চলে আসেন এবং ১৫ জেলিয়াটোলা স্ট্রিটের নলিনীকান্ত সরকারের বাড়িতে ওঠেন। এখানে নানা রকম অসুবিধার কারণে তিনি সওগাত পত্রিকার ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটে অফিসের নিচতলায় ওঠেন। এ সময় নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা সন্তানসম্ভবা ছিলেন। ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটের বাসায় প্রমীলার অসুবিধা হওয়ায় তিনি ১৯২৯ সালের আগস্ট মাসে ৮/১ পানবাগান লেনের একটি দোতলা বাসায় ওঠেন। ১৯২৯ সালে ৯ অক্টোবর (আশ্বিন ১৩৩৬) ৮/১ পানবাগান লেনের দোতলা বাসায় নজরুলের তৃতীয় সন্তান সব্যসাচী জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, চৈনিক দার্শনিক সান ইয়াৎ সানের নামানুসারে নজরুল এই সন্তানের ডাকনাম রেখেছিলেন সানি। ১৯৩০ সালে ৭ মে (বুধবার ২৪ মে ১৯৩০) নজরুল-প্রমীলার দ্বিতীয় সন্তান বুলবুল বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
অসুস্থ প্রমীলা
১৯৩৮ সালে প্রমীলা পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হন। এই বছরের শেষের দিকে তিনি এই রোগে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হন। এ সময় নজরুল স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেও কোনো লাভ হয়নি। স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহের জন্য নজরুল তাঁর শেষ সম্বল বালিগঞ্জের জমি বিক্রি করেন। ১৯৪২ সালে নজরুল নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘকাল চিকিৎসকেরা তাঁর রোগ ধরতে পারেননি। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন (বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৯) প্রমীলা নজরুল কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর মৃতদেহ নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়ায় শরপুকুরের পাশে সমাধিস্থ করা হয়।
আজ ৩০ জুন নজরুলের প্রিয়সী প্রমীলা নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
*লেখক: আবু সাঈদ : কবি, সংগঠক, গবেষক ও প্রকাশক