তুমি রবে নীরবে
এই তো সেদিন স্কুল ও কলেজজীবনের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি পরীক্ষা নামের যুদ্ধের মাধ্যমে পদার্পণ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। দেখতে দেখতে কেটে গেল তিনটি বছর।
একসময় বিস্ময়ের তুঙ্গে বিরাজ করা সবুজে ঘেরা, ছায়া ঢাকা ও পাখি ডাকা ক্যাম্পাসের অলিগলি এখন নখদর্পণে। শুরুর অপরিচিত ও অজানা মানুষগুলো এখন হৃদয়ে বিশেষ জায়গার দাবিদার। ক্যাম্পাসের ভ্যানচালক, চা–দোকানি, হোটেল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সহপাঠী, বন্ধু, অগ্রজ, অনুজ ও শিক্ষকদের সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শুক্রবারে জামাতে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে দল বেঁধে কেন্দ্রীয় মসজিদ পানে ছোটা, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে প্রিয় শিক্ষকের ক্লাস করা, ক্লাসের বিরতিতে চায়ের দোকানে বসে গল্পে মেতে ওঠা, প্রিয় বন্ধুর জন্মদিনকে ঘিরে আনন্দ, লাল ডাবল-ডেকারের দোতলায় বসে বসন্তে শিমুল আর বর্ষায় রক্তিম কৃষ্ণচূড়া ফুলের অভিবাদনের ভঙ্গিতে হাইওয়ের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখতে দেখতে কুষ্টিয়া শহর অভিমুখে চলা, একঘেয়েমি দূর করতে হঠাৎ বন্ধুরা মিলে দূরের কিংবা কাছের দর্শনীয় জায়গায় গিয়ে প্রকৃতির মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেলা, ছুটির দিনে উদরপূর্তি করতে আকস্মিক পরিকল্পনায় বাজার-সদাই শেষে কাঁচা হাতে রান্না করা, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া ও আনন্দে মেতে ওঠা—এসব স্মৃতি কি কখনো ভোলার? মনে হয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে অদৃশ্য এক মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়েছি নিজের অজান্তেই। নিজ বাড়ির পরে এখন বসবাসের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। যৌবনের কত শত স্মৃতি আর ভালো লাগা, মন্দ লাগার উৎপত্তিস্থল এই ক্যাম্পাস, তার সাক্ষী¦প্রাক্তন ও বর্তমান সব ছাত্র।
কিন্তু ভাবতেই চোখ অশ্রুসিক্ত হয় যে পরীক্ষার হলে নির্ধারিত সময়ের পরে খাতা জমা দেওয়ার মতো ক্যাম্পাস থেকেও একটা সময় বেরিয়ে যেতে হবে। হৃদয়ের মণিকোঠায় ভালোবাসায় বাড়তে থাকা বৃক্ষটি হঠাৎ একদিন আলো-বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। অন্যত্র নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার বাস্তবতায় প্রিয়তমা ক্যাম্পাসের সঙ্গে বিচ্ছেদ দৃশ্যের আবেগঘন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তৈরি হবে সময় ও দূরত্বের এক অদৃশ্য দেয়াল। কথায় আছে, অত্যন্ত সুখের সময়টুকু মানুষ কখনো ভোলে না।
ক্ষণে ক্ষণে সুখস্মৃতিগুলো মনের উঠানে উঁকি দেয়। তেমনি ক্যাম্পাসে কাটানো সোনালি সময় স্মৃতির পাখায় ভর করিয়ে বারবার অতীতে ভ্রমণে নিয়ে আসবে। হৃদয়ে ভালো লাগার মৃদু বাতাস বয়ে যাবে। আবেগী মন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়বে। এই স্মৃতিগুলোই জীবন গাড়ির জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে।
যখন বিকেলে পশ্চিম আকাশে হেলতে থাকা সূর্যের সঙ্গে একতালে ক্যাম্পাসের পথ ধরে হাঁটি, অথবা সন্ধ্যায় আদা-লং দিয়ে বানানো এক কাপ চা নিয়ে হলে ছোট্ট বেলকনিতে বসে ভাবুক মনের বাঁধন ছেড়ে দিই; মন তখন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে যেন ঘড়ির কাঁটাকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের দোরগোড়ায় গিয়ে হাজির হয়। চোখের সামনে আবির্ভূত হয় ভাবী বিদায়ের লগ্ন। বুকের বাঁ পাশে হঠাৎ চিনচিন করে ওঠে।
মনের বারান্দায় দুঃখের বর্ষণ শুরু হয়। পরক্ষণেই মনকে শান্ত¡না দিই। বলি, চলে যেতে হবে, এই মায়ার বাঁধন উপেক্ষা করে চলে যাওয়াই যে নিয়ম। মনে পড়ে যায় কবি সুকান্তের কথা, “এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান”। হ্যাঁ, প্রতিবছরই নতুন ছাত্রছাত্রীর আগমন হয় এই ক্যাম্পাসে আর পুরোনোরা নির্ধারিত সীমানার কাছে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। এ যেন শরৎ আর বসন্তে পুষ্পবৃক্ষের দুই ভিন্ন রূপ। ফুল ফোটা এবং ঝরে যাওয়ার মতো চক্রাকারে চলে নতুন আর পুরোনোর আসা–যাওয়া।
বলা যায়, এটাই ক্যাম্পাসের অন্যতম সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যকে সাদরে গ্রহণ করে একদিন ছেড়ে যাব ভালো লাগার, ভালোবাসার, ভালো থাকার এই ক্যাম্পাসকে। তবে, চিত্রশিল্পীর রংতুলিতে আঁকা ছবির মতোই বিচিত্র এই ক্যাম্পাসের অপরূপ দৃশ্য রয়ে যাবে মনের দেয়ালে; যা দেখে হাসব আবার কখনো বা কাঁদব!
*লেখক: মো. রাসেল মিয়া, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া