বঙ্গবাজারে আগুন: খোলাচিঠি
সকাল প্রায় সোয়া ছয়টা। চারদিকে ‘আগুন, আগুন’ শব্দে ঘুম ভাঙল। কাচের জানালা দিয়ে বাইরে দেখি— ধোঁয়ার কী এক প্রচণ্ড কুণ্ডলী।
আমার শরীর জানান দিল—আঁতকে ওঠার শিহরণ কত তীব্র! বাসা কাছে হওয়ার পরও জুতা পরার সময় পায়নি আমার পা। কারণ ততক্ষণে আমি তাদের নিয়ে ছুটছি। আমি ছুটছি আগুনের দিকে, যেখানে আমার জীবিকা পুড়ছে, তার সঙ্গে পুড়ছে আমাদের ভাগ্যও।
গিয়ে দেখি, এ যেন অগ্নির এক বিরাট চুল্লি; সে যেন নরকের মতো পুড়ছে, যার প্রায় ৫০ ফুট দূরেও কেউ এগোতে পারছে না। কারণ এ উত্তাপ এত তীব্র!
আমি তাকিয়ে আছি ধোঁয়ার কুণ্ডলীর দিকে। কারণ সে তখন নরকের ধারের বায়ুমণ্ডল বেয়ে আকাশের দিকে ছুটছে। খেয়াল করলাম, আমি চিৎকার করার শক্তি পাচ্ছি না। কারণ বুকে জমাট বেঁধে গেছে সব শব্দ। বুকের সব আর্তনাদ এখন আমার চোখ গড়িয়ে পড়ছে। আমি ভাবছি, আমার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এ নদী কি পারবে থামাতে এ নরকচুল্লি!
পারেনি থামাতে।
বরং চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া সে নদীর কিছু অংশ মিশে গেছে ফায়ার সার্ভিসের পানিতে, আর বাকি অংশ বাষ্প হয়ে গেছে নরকের উত্তাপে। একই সঙ্গে বাষ্প হয়ে গেছে আমাদের ভাগ্য। ধূলিসাৎ হয়ে গেছে আমাদের মতো আরও হাজার মানুষের ভাগ্য।
এদিকটা তো হলোই শেষ। রাস্তার ওপারের মার্কেটে আগুন লাগার আগেই খুব চেষ্টা করছিলাম গোডাউন থেকে মালামাল সরাতে। আমি বই পিঠে নিয়ে অভ্যস্ত মানুষ। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আজ বই নয়, বরং আজ ছুটতে হবে মালামালের বস্তা নিয়ে মাথায়। শুরু করলামও তা-ই। বাবা ও দোকানের কর্মচারীর সঙ্গে আমি এখন বিশাল বড় বস্তা মাথায় নিয়ে ছুটছি। ছুটছে আর সবাই, যেটুকু পারা যায় সম্বলকে বাঁচানোর তাগিদে। পোড়া কিংবা আধপোড়া ভাগ্যকে একটু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায়।
এদিকে দেখলাম, কেউ কেউ বিক্ষুব্ধ হয়ে ফায়ার সার্ভিস অফিসে নিক্ষেপ করছে ইটপাটকেল।
ঠিক এক-দুদিন পর। দেশ-বিদেশ নাকি তোলপাড় হয়ে গেছে এ খবরে। টিভি, পত্রিকার নিয়মিত যে খবর দেখি, আজ আমাদের বাস্তবতাও সে সংবাদের হেডলাইন। চারপাশে অনেক উৎসুক মানুষের ভিড়। যেতে হচ্ছে আমাকেও সে ক্ষত হওয়া স্মৃতির কাছে বারবার।
কিন্তু যখনই সেই ভস্মীভূত স্তূপের কাছে যাচ্ছি, আমি এখনো আঁতকে উঠি। কারণ, ধ্বংসস্তূপের সে ধোঁয়ায় যে মিশে আছে আমাদের ঘাম আর রক্ত পোড়ার গন্ধ, যেখানে আমার মতো আরও হাজারো মানুষের ঘাম আর মাংসপেশির পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল একেকটি দোকান। ধ্বংসস্তূপের ধোঁয়ায় এই উৎসুক জনতা কি টের পাচ্ছে আমাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর রক্ত পোড়ার সে গন্ধ?
এ ঘটনার একটি সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সব ব্যবসায়ীর ক্ষতিপূরণসহ দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও আশা করছি।
বর্নীল রাহমান, শিক্ষার্থী এবং বঙ্গবাজারে দোকান পুড়ে যাওয়া এক ভুক্তভোগী পরিবারের সন্তান