পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের কি দেখার কেউ নেই
গত ১২ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সকে তিন বছরে নামিয়ে আনার কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী যে যুক্তি দিয়েছেন, তা অযৌক্তিক এবং একেবারে অগ্রহণযোগ্য। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে যুক্তি দেখিয়েছেন, অভিভাবকদের অর্থ অপচয় রোধে এটি তিন বছর করা উচিত। কিন্তু যেখানে অধিকাংশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে তিনি শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হল দিতে পারেননি, শিক্ষকসংকট দূর করতে পারেননি, সেখানে শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্য শুনতে চাই না।
এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১৩ বছরে কারিগরি শিক্ষাকে যতটা আধুনিকায়ন করেছে, দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর গত ৫ বছরে কারিগরি শিক্ষাকে এর চেয়ে বেশি অবহেলা ও ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছেন।
২০১৯ সালে প্রথম শিফটের নিয়োগ দিয়ে বিনা বেতনে দ্বিতীয় শিফটের কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দিয়ে শিক্ষকদের ক্লাসের প্রতি অনীহা করতে বাধ্য করে। এতে চরম অবহেলায় পড়ে দ্বিতীয় শিফটের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে স্টেপ প্রকল্পে ৭৭৭ জন শিক্ষককে দিয়ে ১০ বছর শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে, তাঁদের মধ্যে অনেককে বিদেশে প্রশিক্ষণ দিয়েও আর রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করেনি। এতে রাষ্ট্রের যেমন অপচয় হয়েছে, তেমন ৭৭৭ জন শিক্ষক মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন। ২০২০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত বেতন-ভাতাদি না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অর্থকষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাকে যে একধরনের জগাখিচুড়ি বানানো হচ্ছে, তার প্রমাণ হয় শিক্ষামন্ত্রী ও কারিগরি বোর্ড কর্মকর্তাদের পলিটেকনিক ভর্তিতে বয়সসীমা ওঠানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সবার আছে; কিন্তু তাই বলে ডিপ্লোমা শিক্ষাকে সমাজে এমন হেয় প্রতিপন্ন করার অধিকার শিক্ষামন্ত্রীর থাকতে পারে না। নির্দিষ্ট বয়স পার করার পর যদি কোনো ব্যক্তির মনে হয়, তাঁর কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এ জন্য তিন কিংবা ছয়মাস মেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো রয়েছে।
কিন্তু এখন হয়েছে বিপরীত চিত্র।
পলিটেকনিকগুলোতে শিক্ষকসংকট ও ল্যাবের অব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের বাইরের ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা অবলীলায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভুল ও বিবেকহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ল্যাবগুলো আগে পরিচালনা হতো এইচএসসি (ভক) পাসকৃত ও দক্ষ প্রশিক্ষকৃত জনবল দিয়ে। কিন্তু করোনার সময় একধরনের গোপনে এই পদে জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রিধারী জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাঁদের টেকনোলজির যন্ত্রপাতির ওপর কোনো ধারণা নেই। এতে শিক্ষার্থীরা ল্যাবে কিছুই শিখতে পারছে না।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের অধিকার এই দেশে অন্যদের থাকলেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ক্ষেত্রে তা সীমিত।
বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার বের হলেও তাঁদের উচ্চশিক্ষার জন্য রয়েছে ৬৫০ আসনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। কয়েক বছর থেকে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সমমান কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানানো হলেও সরকারের টনক নড়েনি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও ডিপ্লোমা কোর্সের সঙ্গে এমন বৈষম্য উদ্বেগজনক। মিষ্টি কথায় ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের অভিভূত করা হলেও বাস্তব চিত্রে দেশে ডিপ্লোমা নিয়ে ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাব্যবস্থা চার থেকে তিন বছরে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। আশা করি, শিক্ষামন্ত্রী এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাবেন।
*লেখক: ইয়াসিন আরাফাত হৃদয়, শিক্ষার্থী, সেশন (২০১৮-১৯), লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট