'দণ্ড যোগে শূন্য মার্গে উল্লম্ফন'

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

শিরোনাম দেখে চমকাবেন না। সে গল্পে পরে আসছি। তার আগে কৈফিয়ৎ। সারা দিন নিউজ চ্যানেলে ঘোরাফেরা করে মানসিক চাপ নিতে বারণ করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। করোনাকালে মনোবিজ্ঞানীদের কথা শোনা খুবই গুরত্বপূর্ণ। করোনাভাইরাস থেকে যেমন নানা কৌশলে আমরা আমাদের শরীরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, একই রকম গুরুত্ব দিয়ে আমাদের মনকেও বাঁচানো খুব প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা মোটেই ভাবি না। বিশেষ করে সাধারণ বাঙালিরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকার বিষয়টিকে যে খুব একটা গুরুত্ব দেন—এ কথাটি হলফ করে বলা যাবে না । নিউজ চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়াতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের করুণ কাহিনি সবাই মনোযোগ দিয়ে দেখছে ও শুনছে। সংবেদনশীল মানুষ, আক্রান্তদের বিপণ্নতা দেখে নিজেদের অসহায় মনে করছেন। আক্রান্তদের আজকের অবস্থার সঙ্গে নিজের ও নিজ পরিবারের সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে।
মনোবিজ্ঞানীদের উপদেশে প্রভাবিত হয়ে তাই সিরিয়াস কোনো বিষয় নিয়ে আজ কিছু লিখব না বলে স্থির করেছি। হালকা মেজাজে মজার কিছু কথা যদি পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়, তাহলে পাঠকদের উপকার না হলেও নিজের কিছু উপকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যারা মোটেই হাস্যরস করতে জানেন না, তাঁরা নিজে হাসির কথা বলে নিজে নিজেই হাসেন। করোনাকালে সেটা বোকার হাসি হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আমার মেনে নিতে আপত্তি নেই।
নব্বই দশকের গোড়ার কথা, আমি আমার জীবনের দ্বিতীয় চাকরিতে জয়েন করলাম খুলনা শহরে। সংস্থাটি আইরিশ। হেড অফিস আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে। আমার বসও একজন আইরিশ। চার্লি জ্যাকসন নাম, ডাবলিনের ছেলে। ইংল্যান্ডের সাসেক্স ইউনিভার্সিটি থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিতে গ্র্যাজুয়েশন করে আমার বস হিসেবে জয়েন করল। চার্লি প্রোজেক্ট ম্যানেজার, আর আমি ডেপুটি প্রোজেক্ট ম্যানেজার। আমার মতো চার্লির পোস্টিংও খুলনা শহরে আমাদের আরবান প্রোজেক্টে। চার্লি বয়সে আমার ছোট। সাসেক্স ইউনিভার্সিটি ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডি—এই দুইয়ের সমন্বয়ে চার্লি আমার বস। চার্লি মানুষ হিসেবে অসাধারণ। বাংলা ভাষায় কথা বলার অদম্য ইচ্ছা তাঁর। বরিশালে বিদেশিদের বাংলা শেখার একটা স্কুল থেকে ছয় সপ্তাহের কোর্স শেষ করেই সে জয়েন করেছে এই প্রোজেক্টে। ছয় সপ্তাহের কথ্য বাংলার কোর্স করা চার্লি জয়েন করেই অদ্ভুত উচ্চারণে বাংলা বলা শুরু করলেন। বাংলা ভাষায় কথা বলা থেকে তাঁকে দমন করবে সে সাধ্য কার! আমি তাঁকে আকারে–ইঙ্গিতে আরেকটু পোক্ত হয়ে কথা বলা শুরু করার অনুরোধ করি। কিন্তু ওর যুক্তি ফ্রি স্টাইলে বা ভয়ডরহীনভাবে ব্যাট না চালালে যে রকম ক্রিকেটে রান করা যায় না, ফ্রি স্টাইলে কথা বলা শুরু না করলে, সে কখনো ভালো করে বাংলা বলতে পারবে না।
ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ে চার্লির আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ের মতো আরেকটি বিষয়েও চার্লি ভয়ডরহীন। সেটি হলো—খাওয়া–দাওয়া। ফুটপাতের মাছি ভনভন করা পিঠা, ঝালমুড়ি, ডাল–ভাজি দিয়ে পরোটা, পিঁয়াজু, ছোলা ইত্যাদি তাঁর বাংলাদেশি খাদ্যতালিকার মধ্যে প্রিয় খাদ্য। খুলনা শহরে আমাদের অফিসের যথেষ্ট উন্নত মানের একটি গেস্ট হাউস রেখে উইকেন্ডে চার্লি আজ অমুকের বাড়ি তো কাল তমুকের বাড়িতে দাওয়াত খেতে শুরু করল। আমি তাঁকে বহুবার বলেছি, ‘গেস্ট হাউসে এত ভালো কুক আছে, তুমি তাকেই বলতে পার এসব খাওয়া বানিয়ে দিতে।’ চার্লির যুক্তি গেস্ট হাউসের কুক বাংলাদেশি খাদ্যের আধুনিকীকরণ করেছে। তিনি পেতে চান বাংলাদেশি খাদ্যের আসল স্বাদ। আসল স্বাদ পেতে হলে আসল মানুষদের রান্না খেতে হবে। আর আসল মানুষেরা থাকেন ফুটপাতে। চার্লি এই যুক্তিতে দুর্বার গতিতে খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগলেন। আমি তো অবাক চার্লির হজম ক্ষমতা দেখে। সদ্য বাংলাদেশেই শুধু নয়, এশিয়াতে আসা একজন মানুষ ভালো–মন্দ পরিবেশে, এমন খাদ্য খেয়েও দিব্যি সুস্থ আছে। কিন্তু এটা ছিল চার্লির ওয়ার্মআপ পিরিয়ড ,এ পিরিয়ড ছিল দু মাস। তারপরই শুরু হলো নানা ঘটনা।
আমাদের অফিস সকাল ৮টা থেকে। চার্লি ও আমি দুজনই চেষ্টা করতাম ৮টার মধ্যে অফিসে পৌঁছাই। একদিন সকালে চার্লি ৮টার ভেতরে তো এলই না, যখন ৯টা পেরিয়ে গেল আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন হলাম। সাড়ে ৯টার দিকে চার্লি প্রায় দৌড়ুাতে দৌড়ুাতে এসে অফিসে ঢুকে হাত–পা ছুড়ে নৃত্য করতে শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? চার্লি তাঁর পেটে হাত দিয়ে বারবার অদ্ভুত বাংলায় বলতে লগলেন, ‘আমার পেটে কুমির, আমার পেটে কুমির।’ নৃত্য সহযোগে চিৎকার করে কথা বলায়, আমাদের সহকর্মীরা এসে ভিড় করল চার্লির চারপাশে। সবাই বিস্মিত ও বেদনার্ত হয়ে পেটে কী করে কুমির ঢুকল, সে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে সে বলল, সে নিশ্চিত, গেস্ট হাউসের কুক জেমস তাঁকে বলেছে যে, তাঁর পেটে কুমির ঢুকেছে। এ কথা শুনে, জেমসকে ডেকে আনা হলো। জেমস বিশ–বাইশ বছরের তরুণ, বাড়ি রংপুর। চার্লি অবসর সময়ে গেস্ট হাউসে জেমসের কাছ থেকেও বাংলা শেখে। ভদ্র ও বিনয়ী জেমসকে কুমির কাহিনির বিষয়ে সে কী জানে, তা জিজ্ঞেস করা হলো। জেমস যা বললেন, তার মর্মার্থ হলো—মধ্ রাত থেকেই চার্লির নৃত্য এবং অস্থির পায়চারি শুরু হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে জেমস বুঝতে পারেন যে, তাঁর পেটে কৃমি হয়েছে এবং এ কারণে পেটের ভেতরে এবং মলদ্বারে চুলকানি হচ্ছে। এর প্রতীকার হিসেবে চার্লির এই অভিনব নৃত্যকলা।
অবশেষে বোঝা গেল যে, জেমস বলেছে কৃমি, আর চার্লি শুনেছে কুমির। কারণ ক্রকোডাইল যে কুমির এ কথাটি চার্লি দুদিন আগে শিখেছে অফিসের সিকিউরিটি গার্ডের কাছে থেকে। কিন্তু হায় ওর্ম কথাটির অর্থ যে কৃমি, তাই শেখা হয়ে ওঠেনি তাঁর। এ কারণেই জলে বাস করা কুমির ইউরোপিয়ান চার্লির পেটে নির্বিবাদে ঘুরে বেড়ানো শুরু করেছে। যাক পরে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে কুমিরকাণ্ডের সুরাহা করতে হয়েছে চার্লিসহ আমাদের সবার।
পরের ঘটনার জন্য আমার কিছুটা দায় আছে। চার্লির বাংলা শেখা তখন আরও দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছে। আমার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে সে উচ্চারণ শিখছে, রুটি, পরোটা, আমার, তোমার, নিজের, পরের, নিজেরটা, পরেরটা ইত্যাদি শব্দের। এগুলোর শুধু উচ্চারণই শেখেনি, সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয় কীভাবে তাও শিখতে লাগল। শেখে সে ভালোই। কিন্তু ব্যবহার করতে গিয়ে সব তালগোল পাকিয়ে ফেলে। একদিন একটা ছোট রেস্টুরেন্টে ঢুকে চার্লি পরোটার অর্ডার দিতে গিয়ে বলছেন, ‘পরেরটা, পরেরটা দাও।’ রেস্টুরেন্টের যে ছেলেটি টেবিলে টেবিলে খাবার দিচ্ছে, সে অদ্ভুত ভঙ্গিতে উচ্চারিত ‘পরেরটা’ কথার মানে কোনোভাবেই বুঝতে পারছে না। নাছোড়বান্দা চার্লি শেষে আরেকজনের প্লেটের পরোটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আকুল হয়ে বলছে, ‘পরেরটা’, ‘পরেরটা’ ‘। বিদেশি একজন মানুষের আকুল মিনতি শুনে, অতিথিপরায়ণ ও আবেগপ্রবণ সেই বাঙালি ভদ্রলোক, যার প্লেট দেখিয়ে চার্লি বলছিলেন ‘পরেরটা’, ‘পরেরটা’—উনি মনে করলেন পরেরটা মানে তাঁর প্লেটেরটা। তাই তিনি তাঁর প্লেটের দুটি পরোটার মধ্যে একটিতে ভাজি দিয়ে রোলের মতো করে চার্লির হাতে গুঁজে দিলেন। চার্লি এদিন কিছুটা অপমানিত বোধ করলেন। দ্রুত বেগে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আমার বাসায় হাজির। পরোটা ও পরেরটার কাণ্ড শুনে আমি তো প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। পরে আমি পরিবেশ শীতল করে, সবকিছু বুঝিয়ে বললে চার্লি মনে হলো, কিছুটা লজ্জা পেল। চার্লির মুখটি লজ্জায় টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। চার্লির লজ্জা পাওয়া দেখে আমিও ‘বাংলা ভাষার শিক্ষক’ হিসেবে ব্যর্থতার জন্য কিছুটা লজ্জা পেলাম।
পরোটা কাণ্ডের পর চার্লি অফিসের বাইরে বাংলা বলাতে একটু সাবধান হয়ে গেল। ভাবতে লাগল যদি কোনো বাংলার শিক্ষকের কাছে থেকে বাংলা শেখে তাহলে আর এমন বিপদে পড়তে হবে না। সহকর্মীদের সহায়তায় একজন বাংলার শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। চার্লিকে নিয়ে তাঁর বাসায় গিয়ে কথ্য বাংলা শেখানোর জন্য তাঁকে অনুরোধ করলাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক আমাকে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘ভাষা শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টিতে ভিন্ন দক্ষতার প্রয়োজন, যা তাঁর নেই এবং এ জন্য তাঁর পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়।’
আমি চার্লিকে শিক্ষকের অপারগতার কথা বুঝিয়ে বলতেই চার্লি হুট করে আমাকে অবাক করে দিয়ে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আমাকে, একটি খেলার বাংলা নাম কি বলতে পারবে?’ শিক্ষক বললেন, ‘বলো”`।’ চার্লি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি পোল ভোল্ট জাম্প খেলাটিকে বাংলায় কি বলে, দয়া করে বলতে পারবে।’ শিক্ষক গম্ভীর হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে চোখ পিট`পিট করতে করতে বললেন, ‘পোল ভোল্ট জাম্প তো, পোল মানে দণ্ড। তাহলে এর বাংলা নাম হতে পারে ‘দণ্ড যোগে শূন্য মার্গে উল্লম্ফন’। আমি তো এরকম আক্ষরিক বাংলা শোনে নিজেই দন্ডের মতো শক্ত হয়ে গেলাম। চার্লি জানতে চাইলো, শিক্ষক কী বললেন। আমি বললাম, ‘বাংলা ভাষায় এ খেলাটির কোনো নামকরণ করা হয়নি চার্লি।’ চার্লি বলল, হুম। এই পরিবেশে চার্লি হঠাৎ করে এই পোলভোল্ট জ্যাম্পের বাংলা নাম কেন জানতে চাইল, এ কথাটি আমার আর জানা হয়নি। পুরো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে আমি নিজেই দণ্ড যোগে শূন্য মার্গে ভাসতে লাগলাম ।
কিছুদিন পর চার্লি অফিসের টিম মিটিংয়ে দার্শনিকের মতো আরেকটা কথা বলেছিল। কথাটিকে এখন আমার কাছে সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। আমরা আলোচনা করছিলাম, খুলনা অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে। চার্লি প্রথমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে অনেক মুল্যবান কথা বললেন। আমরা সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে তা শুনলাম। কথার একপর্যায়ে সবার উদ্দেশ্যে চোখ বন্ধ করে খুব আত্মবিশ্বাসের সুরে বললেন, ‘খুলনা অঞ্চলের মানুষের জীবনের দাম খুব কম, এমনকি ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষেরও জীবনের দাম কম।’ কথাটি শুনে সহকর্মীরা নড়ে চড়ে উঠল। বিষয়টিকে একটু খোলাসা করে বলতে চার্লিকে অনুরোধ করা হলো। চার্লি এই প্রথম ইংরেজি–বাংলা মিশিয়ে সুন্দরভাবে সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হলো। তাঁর কথাগুলোর ব্যখ্যা হলো, খুলনার কস্ট অব লিভিং অর্থাৎ জীবনের দাম খুব কম এবং বাংলাদেশের কস্ট অব লিভিং ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় কম। এ কথা শোনার পর আমাদের সহকর্মীরা হো হো করে হেসে উঠল। চার্লি সবার হাসি দেখে অবাক ও কিছুটা রাগান্বিত হলো।
আর যা–ই হোক, চার্লি মোটেই অবিবেচক ছিলেন না। জীবনের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের কথা যখন তাকে বুঝিয়ে বলা হলো, তিনি লজ্জায় অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে রাখলেন। আজ করোনার ভয়াল থাবার নিচে যখন সমগ্র পৃথিবী, তখন চার্লির সঙ্গে যোগাযোগ করে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘চার্লি দেখ, পৃথিবীর সব কোণে আজ জীবনের দাম খুব কমে গেছে।’ শুনেছি চার্লি এখন আফ্রিকার একটি দেশে প্রান্তিক মানুষদের উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাসেবায় কাজ করছে। চার্লি তুমি কি দেখতে পাচ্ছ পৃথিবীজুড়ে জীবনের দাম কত দ্রুত নেমে যাচ্ছে। হায় মানুষের না বুঝে বলা কথাও কখনো কখনো সত্য হয়ে যায়। চার্লির নিষ্পাপ সপ্রতিভ চেহারা আজকাল প্রায়ই আমার চোখে ভেসে ওঠে।