'ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরানসখা বন্ধু হে আমার'

নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে এক প্রদর্শনীতে মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং ও নেলসন ম্যান্ডেলা
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে এক প্রদর্শনীতে মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং ও নেলসন ম্যান্ডেলা

খালি গলায় অর্থাৎ বাদ্যযন্ত্র ছাড়া শাবানা আজমি গাইছিলেন মন ছোঁয়া গান, ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার…’। এটা ছিল রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে শাবানা আজমির ট্রিবিউট টু টেগোর। অভিসার কথাটি মনে হলেই মনে যে অনুভূতি জাগে বা অনুভবে যে দৃশ্য ধরা দেয়, তা হলো দুজন ব্যাকুল হৃদয় ছুটেছে এক অমোঘ আকর্ষণে। যেন দুটি তৃষিত হৃদয় একে অপরের সাক্ষাতের অপার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দুর্গম পারে যেতেও তৈরি। ভীষণ ঝড়ঝঞ্ঝা, অবিরল বর্ষণ, গাঢ় অন্ধকার অতিক্রমেও তারাও পিছ পা হবে না এমনি উতলা হৃদয় মন।

তবে রবিঠাকুরের এই গানে ব্যাকুল হৃদয় একজন বলছে, ‘দুয়ার খুলে বাহির পানে চাই, তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই’। তাহলে? ব্যাপারটা কী? তবে কি একজনই পথে বেরিয়েছে অভিসারে? অন্য কেউ তার অভিসারের পথ কোনদিকে তা নিয়েই ভেবে মরছে? সে পথ সুদূর কোনো নদীর কিনারে বা গহিন কোনো বনের ধারে কি? নাকি গভীর কোনো অন্ধকার পারি দিচ্ছে ‘পরানসখা বন্ধু’।

অভিসারের রাতে আকাশ কেন কাঁদছে হুতাশ সম? গানে গানে তাই-ই বলা হচ্ছে। আর দুয়ার খুলে কেইবা রহস্যময়ী একজন ‘হে প্রিয়তম’ বলে হাহাকার করছে? দুটি হৃদয়ে যেমন তেমনি আকাশেও সে সময়ে আনন্দ বৃষ্টি হওয়ার কথা নয় কি?

কোনো একজন অভিসারে যে যাত্রা করেছে তার জন্য ঘুমহীন অন্য একজনের মানস চোখে ‘নদীর কিনার’, ‘গহিন বনের ধার’, ‘গভীর অন্ধকার’ দৃশ্যমান হয়ে চলেছে।

এখানে ‘পরানসখা’ কোনো অভিযানে যাচ্ছে না, যাচ্ছে সে অভিসারে। অভিসারে যেতে হৃদয়ভরা প্রেম প্রয়োজন। তবেই নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে নির্ভীক চিত্তে ছুটে যাবে অন্ধকার চিড়ে চিড়ে অনেক দূরে।

এমনি একজন পরানসখা যার হৃদয় উপচানো ভালোবাসা কোনো একটি নির্দিষ্ট পাত্রে ঢালার জন্য নয়। এ ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, ভাসিয়ে নেওয়ার জন্য।

এমন পরানসখা আসেন কখনো, কখনো। যখন মানুষ অপমানিত হয়, লাঞ্ছিত হয় তুচ্ছ কারণে, অবদমিত হয় শক্তিমানের হাতে, নিরপরাধ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শয়ে শয়ে, তখন মানবতা কেঁদে মরে সেই পরানসখার প্রত্যাশায়।

বাহুবলে অন্যের ধন সব কেড়ে নেওয়ার জন্য শক্তিমানের যুদ্ধ, সংঘর্ষ বহুকাল ধরে মানব সমাজে আছে। যুগ যুগ ধরে চলছে আগ্রাসন আর নির্যাতন, যা মানবজাতির অজানা কোনো বিষয় নয়। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের থাকে সৈন্যসামন্ত, গোলাবারুদ, কামান, এখন আরও আছে বোমারু বিমান ড্রোন যার খবরও মানুষ জানে। তবে সাজ সাজ রবে নয় চুপি চুপি যা ঘটে তাতো কারওর জ্ঞাত নয়।

এখন সময় ভীষণ অন্ধকার। শুধু সীমান্তে বা যুদ্ধের ময়দানে নয় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে সবখানে। ধর্মশালায়ও মানুষকে বন্দুক দিয়ে গুলি করে পাখির মতো মারতে, বোমা দিয়ে শেষ করে দিতে ইন্ধন জোগায় কে বা কারা? জানা আছে কি কারও?

তাই তো আজ মানবতা ‘আজি ঝড়ের রাতে অভিসার’-এ আবাহন করছে এমনি একজনের। যিনি এগিয়ে আসবেন মানুষকে রক্ষা করতে। ছিলেন সেসব পরানসখা, যাঁরা বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন জনপদে আত্মচিন্তা, স্বার্থচিন্তা এক পাশে ঠেলে ফেলে রেখে মানুষের জন্য হৃদয় উপচানো ভালোবাসা নিয়ে অভিসারে বেরিয়েছেন।

তাঁরা ধর্মপুরুষ নন। তাঁরা মানুষ। মানুষের জন্যই তাঁদের প্রাণ কাঁদে।

অস্ত্র ছাড়াই তাঁরা শক্তিশালী। শুধু ভালোবাসবার অসাধারণ ক্ষমতার জন্যই তাঁরা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে আছেন আজও। থাকবেনও কাল থেকে কালান্তরে। পৃথিবী তাঁদের কখনোই ভুলে যাবে না।

এমন তিনজনের দেখা পাওয়া গেল এক প্রদর্শনীতে। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে ২০১৭ সালে এক অসাধারণ অন্য রকম প্রদর্শনীতে তাঁদের তিনজনের জীবন নানাভাবে দেখানো হচ্ছিল। প্রদর্শনীর নামটি খুব সুন্দর ‘এক্সিবিশন অব সিভিল লিবার্ট’। তাঁরা হচ্ছেন সেসব অনন্যসাধারণ পরানসখা যাঁরা মানুষের সম্মান বাঁচাতে, মানুষকে অপমান ও গ্লানি থেকে মুক্ত করতে অগম পারে যাত্রা করতেও দ্বিধাহীন। মানবতা আকুল হয়ে থাকে সেসব পরানসখাদের অভিসারের হদিস জানতে। মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় উপমহাদেশের একজন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব উপনিবেশের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আপন সম্মান নিয়ে বাঁচতে ও সবাইকে বাঁচাতে ছিল যাঁর নিরস্ত্র অভিযান বা অভিসার। মার্টিন লুথার কিং উত্তর আমেরিকা তথা মার্কিন দেশের নাগরিক অধিকার আন্দোলনে নিবেদিত একজন পরানসখা আর একজন নেলসন ম্যান্ডেলা আফ্রিকার মর্যাদার প্রতীক ও পৃথিবীজুড়ে সর্বজন মান্য একজন মানুষ।

এলএসইর দেয়ালে টানানো চিত্রকর্ম
এলএসইর দেয়ালে টানানো চিত্রকর্ম

আরেকজন মানুষ বুকে অপার ভালোবাসা পুষে দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। তাঁর প্রতিকৃতি আজও দেখা যায় তরুণের জামার বুকে, মাথার ব্যান্ডেনায় ও টুপিতে। আর তাঁকে দেখা গেল পৃথিবীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পথে টাঙানো এক দেয়ালচিত্রে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে বিখ্যাত লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস। এমন এক জায়গায় ঝুলছে যে ছবি তাতে আছেন সেই স্বাপ্নিক তরুণ যাঁর বুকে ছিল ভালোবাসা আর হাতে ছিল অস্ত্র। মন্ত্রিত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ অবহেলায় ছেড়ে যিনি পথে বেরিয়েছিলেন মানুষকে দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি এনে দিতে। শুধু সাধারণ মানুষের জামার বুকে নন তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের আলোয় ছুঁয়ে দিয়ে যান শিক্ষিত বোদ্ধাদেরও। ইনিও একজন পরানসখা, মানবতার আকাশ তাঁর জন্যও কাঁদে হুতাশ হয়ে।

তাকে এলএসইর দেয়ালে টাঙানো চিত্রকর্মে দেখা হতো না যদি না শিক্ষক সুপারভাইজারের পরামর্শ শুনে আমার এককালীন বিদ্যাপীঠের নতুন বিল্ডিং দেখতে না যেতাম। সুপারভাইজার তখন ভ্যাকেশনে ফ্রান্সে। আমি অনেক বছর পর একা নই স্বামীসহ লন্ডনে গিয়েও তাঁর দেখা পাব না ভেবে মন খারাপ হলো।

জানালেন, স্কুলে যেও, নতুন সব নির্মাণ দেখবে, ঝকঝকে ক্যাফে হয়েছে দেখে এসো।

খুব যে উৎসাহ পেলাম তাঁর কথায় তা নয়। তবুও পাতাল রেলে চড়ে বসলাম। একসময়ে হলবর্ন স্টেশনে নামলাম। গভীর মাটির তল থেকে দুই দুবার দীর্ঘ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে এগোতেই সেই পরিচিত বুশ হাউস (BVSH HOUSE) চোখে পড়ল। এখানে ইংরেজি অক্ষর ‘ইউ’ লিখিত ‘ভি’এর মতো। এলএসই পৌঁছে চোখে পড়ল ঐতিহ্যবাহী পুরান সব দালানকোঠার পাশেই নতুন বিল্ডিং মাথা তুলেছে। আমি পুরোনো বিল্ডিংয়ে গেলাম পুরোনো দিনকে মনে করতে।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে গিয়ে এ শিল্পকর্ম চোখে পড়ল। পুরোনো জায়গায় আমার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে নতুন কিছু খুঁজে পেলাম। আগে তো এই বিল্ডিংটা ছিলই এমন চিত্রকর্ম ছিল কি? হয়তো ছিল, হয়তো ছিল না। তখন পড়াশোনার চাপে চারপাশের সবকিছু মনোযোগসহ দেখা হয়ে ওঠেনি আর। আমার স্বামী উৎসাহ নিয়ে এই চিত্রকর্মের ছবিটি ক্যামেরাবন্দী করলেন। তারপর যাকেই ছবিটি দেখিয়েছি চে গুয়েভারাকে চিনতে কেউ মুহূর্ত দেরি করেনি। মূলকথা মানবতা তো রবিঠাকুরের গানের সুরেই হাহাকার করে পরানসখার জন্য। তাই মানুষের স্মৃতি থেকেও বিস্মৃত হয়ে যাবেন না তাঁরা কখনোই, কোনো দিন।