হারিকেন ও শৈশব

সেদিন জ্যাকসন হাইটসে এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা। দেখি হন্তদন্ত হয়ে তিনি রাস্তার এমাথা-ওমাথা হাঁটছেন আর সম্ভবত কিছু একটা খুঁজছেন। জিজ্ঞেস করতেই তাঁর চোখেমুখে রাজ্যের কৌতূহলের ছাপ ফুটিয়ে বললেন, ‘আর বলো না, হারিকেন খুঁজছি। কোথায় পাই হারিকেন?’
আমার চোখ এবার আকাশে উঠল। এত বিষয় থাকতে এই ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিকেন কেন? এবার স্বভাবসুলভ তাঁর ‍উত্তর, ‘আরে, বলো কী? হারিকেন দেখলেই তো বাংলাদেশের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। হারিকেনের আলোয় আমার শৈশব এখনো জ্বলজ্বল করে ওঠে। যখন গ্রামে ছিলাম তখন হারিকেনের আলোই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। তারপর বিজলি বাতির হাত ধরে কত শহরেই না ঘুরলাম। কিন্তু হারিকেনের সেই মোহ এখনো ত্যাগ করতে পারিনি।’
বন্ধুটি যখন তাঁর কথা বলছিলেন, ততক্ষণে আমিও আমার সেই সোনালি কৈশোরে ডুব দিয়ে হারিকেনের সন্ধানে নেমে গেলাম। জ্যাকসন হাইটসে হারিকেন খোঁজার চেষ্টা রেখে দিয়ে দুই বন্ধু একটি রেস্তোরাঁয় হারিকেন নিয়ে আলোচনায় ডুবে গেলাম।
‘হারিকেন’ শব্দটি আমাদের বাঙালির কানে এখনো অপরিচিত শব্দে রূপান্তরিত হয়নি। বাংলার গ্রামগঞ্জে যখন বিজলি বাতি ছিল না, তখন হারিকেন আর কুপি বাতিই ছিল একমাত্র পাথেয়। যদিও হারিকেনের আলোয় বড় হওয়ার সুযোগ থেকে আমি বঞ্চিত, কিন্তু তারপরও কখনো কখনো আমাদের গ্রামের বাড়িতে হারিকেন আর হ্যাজাক বাতির স্মৃতিতে এখনো মনেপ্রাণে পুলক খুঁজে পাই।
বন্ধুটি বলতে শুরু করলেন, ‘একসময় আমাদের গ্রামবাংলায় রাত নেমে আসত হঠাৎ করে ঝুপ করে কাউকে বলে না কয়েই। তখন চারপাশে ঘন অন্ধকার। দিনের চেনা বড় বটগাছটাও তখন অন্ধকারে রূপকথার দৈত্য দানবের মতো মনে হতো। সাধারণত সন্ধ্যা থেকেই গ্রাম বাংলার ছোট্ট ঘরে ঘরে শুরু হতো হারিকেন নিয়ে যত রকম আয়োজন! সলতেটা ঠিক আছে তো? চিমনিটা কালো হয়ে আছে, পরিষ্কার করতে হবে যে! কেরোসিন মজুত আছে তো! নাকি সদু মিঞার টং থেকে আবার কেরোসিন আনতে হবে? তারপর হারিকেন জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা তাদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ করত। তখন শুরু হতো হারিকেন সেবা। আর শুধুই কি হারিকেন সেবা? সেই হারিকেন ঘিরে কত ছোট ছোট মুখ। সেই মুখ‍গুলোতে ফুটে উঠত শুধু বিস্ময় আর বিস্ময়! চোখে হাজার রকম প্রশ্নের ঝলকানি! হারিকেনের লালচে আলোয় পরীক্ষার পড়াটা তৈরি করতে হবে যে! তারপর ধীরে ধীরে রাত গভীর হতে শুরু করে। হারিকেনের আলোয় খোকার ছায়া পড়ে ঘরের পুরোনো দেয়ালে। সে এক লম্বা ছায়া। খোকা ভাবে, এটা কার ছায়া? এই ছায়াকে আমি চিনি কি?’
আমার স্মৃতিতেও হারিকেন নিয়ে কিছু স্মৃতি রয়েছে। হারিকেনের আলোয় তৈরি হওয়া ছায়ার প্রতিবিম্বকে কাজে লাগিয়ে আপনারা কি কখনো ছায়াবাজি চিত্র তৈরি করেছেন? ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসের জনক হীরালাল সেন সে কাজটি করতেন, ঠিক তিনি যখন স্কুলে পড়তেন। হীরালাল সেনের আরেক খালাতো ভাই দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন তাঁর সেই খেলার সঙ্গী। পরবর্তীকালে দীনেশচন্দ্র সেন মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করে বিখ্যাত আর হীরালাল সেন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের পুরোধা। সে খবর আমরা জানি। কিন্তু মজার তথ্য হলো, তাঁরা দুজনেই ছেলেবেলায় এই হারিকেন নিয়ে ছায়াবাজি খেলা খেলতেন। আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, আপনারা অনেকেই হয়তো খেলাটা খেলেছেন। আমরা ছেলেবেলায় হারিকেনের আলো-আঁধারি মিষ্টি আলোতে হাতের আঙুলগুলো বিভিন্ন রকম কসরত করে দেয়ালের তার প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে ছায়াছবি তৈরি করতাম। অবাক কাণ্ড! সেই হাতের আঙুলগুলো কখনো কখনো তোতা পাখির মুখ, কখনো ছাগলের মাথা, কখনো উড়ন্ত পাখি হয়ে যেত। আবার কখনো টগবগ টগবগ করে রাজকুমারের ঘোড়াটি তেপান্তরের মাঠটিও পার হয়ে যেত। সবই হতো দুই হাতের দশ আঙুলের কারসাজিতে। আমরা ঘরে বসে বসে বিনে পয়সার সেই সিনেমাটা উপভোগ করতাম।
হারিকেন নিয়ে লেখার কি অন্ত আছে? আমার আব্বার ছিল ছিপে মাছ ধরার শখ। আর আমি ছিলাম তাঁর একান্ত সহকারী। আমাদের বাড়ি গাজীপুর কাপাসিয়া এলাকায় প্রচুর বিল আর খাল ছিল। কোন বিলে কোন মাছ বেশি মেলে, তা আমার আব্বা ভালো জানতেন। আব্বা কলেজে মাস্টারি করতেন বলে তাঁর অনেক কলেজছাত্র ছিল। তাদেরই একজন খবর দিল। ‘স্যার, ঢুলি বিলে প্রচুর মাছ এসেছে’। আব্বা দিনখন ঠিক করে তাঁর বড়শি আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চললেন ঢুলি বিলে মাছ ধরতে। সে এক মহা আয়োজন। আমি হলাম তাঁর সঙ্গী। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আম্মা আব্বার জন্য পানের খিলি বানিয়ে দিতে ভুললেন না। ঢুলি বিলে গিয়ে সত্যি প্রচুর মাছের দেখা মিলল। আব্বা ছিলেন যাকে বলে পাকা শিকারি। তিনি জানতেন, মাছ কোথায় বেশি পাওয়া যায়। তিনি ছিপ ফেলেন আর টপাটপ মাছ ওঠান। হঠাৎ আব্বার খেয়াল হলো, সন্ধ্যা তো হয়ে গেল! তিনি আমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমাদের বাড়ি সেই ঢুলি বিল থেকে মাইলখানেকের পথ। এদিকে আমাদের সঙ্গে হারিকেনও নেই। এতটা পথ যাব কীভাবে? আমরা বিলের পাশেই এক গৃহস্থের দ্বারস্থ হলাম। বাড়ির কর্তা সব শুনে তিনি তাঁদের বাড়িতে আমাদের আতিথেয়তা নেওয়ার আহ্বান জানালেন। কিন্তু আব্বা রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত একটা হারিকেন জোগাড় হলো। সেই হারিকেনের আলোয় আমরা বাপ-বেটা বাড়ির পথে রওনা হলাম। আব্বার এক হাতে হারিকেন আর আরেক হাতে তার প্রিয় বড়শি আর মাছ রাখার ডুলা। আমার ছোট হাতে মাছ ধরার কিছু যন্ত্রপাতি। হরিকেনটা দুলছে আর সেই হারিকেনের আলোয় আমার নাকের সামনে দুলছে গোটা ভুতুড়ে এক গ্রাম। সন্ধ্যায় সেই গ্রামের গাছপালাগুলো হারিকেনের ভুতুড়ে আলোয় কেমন যেন অদ্ভুত আর অচেনা দেখায়। গা তখন ছমছম করে ওঠে। আব্বা সেই চলার পথে কত যে গল্প বললেন, তার কি কোনো শেষ আছে? স্পষ্ট মনে আছে হারিকেনের সেই মোহনীয় আলোয় আমি আমার পিতার বুদ্ধিদীপ্ত মুখটা বার কয়েক দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। মুখে তাঁর সেই চিরচেনা হাসি, চোখে ছিল রাজ্যের আনন্দ, আবার ভয়ও।
অনেক দিন পর বন্ধুটির হারিকেন কেনা উপলক্ষে হারিকেন নিয়ে অনেক কথাই মনে পড়ে গেল। যেখানে বাংলাদেশেই এখন হারিকেন তার অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, সেখানে নিউইয়র্কে এই ফিরিঙ্গি শহরে হারিকেন? জানি, হয়তো খোদ বাংলাতেই এখন হারিকেনের কোনো স্থান নেই কিন্তু আমাদের এই প্রবাসীদের অন্তরাত্মা থেকে এই বস্তুটাকে বিদায় করি কোন উপায়ে? আপনিই বলুন। হয়তো বিজলি বাতির এই সভ্যতায় হারিকেনের এখন কোনো ভূমিকাই হয়তো নেই। কিন্তু হায়! একসময় বাঙালির বহুমুখী আনন্দ উৎসবের সাক্ষী হিসেবে হারিকেনের ভূমিকা কি ভুলে যাওয়া সম্ভব? হারিকেনের লালচে আলোকে ঘিরে কীটপতঙ্গগুলো যেভাবে চিমনির গায়ে ধাক্কা খেত, ঠিক একইভাবে বাঙালির হাজার সুখের স্মৃতিগুলোও যেন হারিকেনের চিমনির গায়ে নিত্যই ধাক্কা খায়। সে কারণেই হয়তো নিউইয়র্কের এই তামাটে শহরে বসে হারিকেন শব্দটা শুনলে আমাদের নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। হারিকেনকে ভুলি কী করে?