স্টিফানে ঈর্ষান্বিত হোক আমাদের তারুণ্য

স্টিফান বুজম্যান
স্টিফান বুজম্যান

কিছু কিছু মানুষকে নিয়ে লিখতে গেলে ধাঁধায় পড়তে হয়। তাদের চরিত্রই মুগ্ধতায় ভরা এক গল্প। শব্দের বুননে সে গল্প লিখে আর কতটুকু প্রকাশ করা যায়। স্টিফান বুজম্যান তেমনই একজন। কাঁচা যৌবন তাঁর। অথচ এইটুকু সময়ের মধ্যেই কী চমৎকার সব কীর্তি জ্বলজ্বল করছে। ২০ বছর বয়সে সম্প্রতি পিএইচডি শেষ করেছে এই তরুণ। বর্তমান সময়ে সে সুইডেনের সেলিব্রিটি মেধাবী তরুণ।

স্টিফান আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের (স্টকহোম ইউনিভার্সিটি) ছাত্র। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কথামত গিয়ে হাজির হলাম তার অফিসে। কফি হাতে শুরু হলো আমাদের আড্ডা। স্টিফান বুজম্যান (Stefan Buijsman) জন্মেছেন ১৯৯৫ সালে, নেদারল্যান্ডসের লাইডেন শহরে। সে শহরই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই ছিল গণিতের প্রতি তার অসম্ভব ভালোবাসা। স্কুলে থাকতেই তিনটি ক্লাস ডি​ঙিয়েছে সে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে শেষ করেছে হাইস্কুল তথা দ্বাদশ শ্রেণি। তারপর পড়াশোনা শুরু লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। নেদারল্যান্ডসের খুব নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় সেটি।
কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক করতে শুরু করে স্টিফান। তবে একসময় তার ফিলসফি অব ম্যাথমেটিক্‌স ভালো লাগতে শুরু করে। ভালো লাগার সঙ্গে সে আপস করেনি। স্নাতক করতে তার দরকার ছিল ১৮০ ক্রেডিট কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই সে শেষ করে ৩২০ ক্রেডিট। ডিগ্রিটা কম্পিউটার সায়েন্স হলেও ফিলসফি অব ম্যাথমেটিক্‌সের ডিগ্রি সে নিজেই শেষ করেছে। তারপর দুই বছরের মাস্টার্স শেষ হয়ে যায় এক বছরে। আঠারো পেরোতেই তাঁর লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকে যায়। সেখান থেকে চলে আসেন সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাত্র দেড় বছরের মাথায় তার পিএইচডি থিসিস শেষ হয়। স্টিফান যখন থিসিস জমা দেয় তার বয়স তখন বিশ। এই পর্যন্ত পড়ে আপনি বিস্মিত হতেই পারেন। কারণ এ বিস্ময় লেগেছে সুইডিশ সমাজেও। সুইডেনের প্রায় সকল প্রচারমাধ্যমের সংবাদ হয়েছেন স্টিফান। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে স্টকহোমে অবস্থিত ডাচ দূতাবাস। ভবিষ্যতে তার গবেষণার জন্য আর্থিক অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানই। অনেকেই মনে করেন সুইডেনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে পিএইচডি করা তরুণ সে।
ফ্রেগ (Gottlob Frege) তার খুব পছন্দের গণিতবিদ ও দার্শনিক। তালিকায় আছে ডেভিড হিলবার্ট, বাট্রান্ড রাসেলসহ বেশ কয়েকজন। তাদের প্রসঙ্গ আসে আলোচনায়। স্টিফানের স্বপ্ন অনেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে গবেষণার সঙ্গেই সংযুক্ত থাকার ইচ্ছে তাঁর। সে স্বপ্নের পথে তেমন কোনো বাধাও নেই আপাতত। সফলতাই সফলতার জন্ম দেয়—এ কথা তার অজানা নয়। এত কম বয়সে পিএইচডি শেষ করেছে বলে তার কোনো বিস্ময়ও নেই। খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, আমি তো সব সময়ই খুব তাড়াতাড়ি সব শেষ করেছি। আমার কাছে এটা আকস্মিক কোনো বিষয় নয়।

লেখক ও স্টিফান বুজম্যান
লেখক ও স্টিফান বুজম্যান

সুইডেনে সাধারণত গড়ে ২৭-২৮ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা পিএইচডি শেষ করেন। স্টিফান মনে করে তার এই অর্জন সমাজের তরুণদের আরও কম বয়সে পিএইচডি শেষ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। গবেষণায় ভালো করতে হলে অল্প বয়সেই একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে সে মনে করে।
আড্ডায় কথা হয় অন্যান্য বিষয়েও। বাংলাদেশকে স্টিফান চেনে, তবে কখনো সেখানে বেড়ানো হয়নি। বললাম, তোমার কথা প্রকাশিত হওয়ার পর যদি বেড়াতে যাও তাহলে খ্যাতির বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে! স্টিফান হেসে বলল, খ্যাতির বিড়ম্বনার সঙ্গে যথারীতি সে পরিচিত। সম্প্রতি এক ম্যাগাজিনের কভার ফটোর জন্য, তাঁকে দুই ঘণ্টা ধরে বিভিন্নভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়েছে।
স্টিফানের সঙ্গে দেড় ঘণ্টার আড্ডা ফুরিয়ে যায় খুবই দ্রুত। এমন স্বপ্নবাজ আলোকিত মানুষের সঙ্গে গল্প করে ক্লান্তি আসে না। আড্ডা শেষে আমার হাতে তুলে দিল তার থিসিসের একটি কপি। রসায়নের গবেষক হয়ে তার থিসিসের আদ্যোপান্ত বুঝব না কিন্তু দারুণ স্মৃতি হয়ে থাকবে সে বই। স্টিফানের সাফল্যের কথা পড়ে ঈর্ষান্বিত হোক আমাদের তারুণ্য। মনে-প্রাণে এটুকুই চাই আপাতত।

(লেখক গবেষক, স্টকহোম ইউনিভার্সিটি, সুইডেন। ইমেইল: [email protected])