সিলেটের সমস্যা, সিলেটের সম্ভাবনা

সিলেটের গ্যাস পাওয়ার খবরে আনন্দিত সৈয়দ মুজতবা আলী মন্তব্য করেছিলেন, সিলেটের শিল্প-নিসর্গ এত দিন সীমাবদ্ধ ছিল সংগীত এবং সাহিত্যে, এখন গ্যাসের কল্যাণে চা-শিল্পের সঙ্গে ভারী শিল্প এই নিসর্গে যুক্ত হবে।
গ্যাসের কারণে সিলেটে সার কারখানা হয়েছে কিন্তু ভারী শিল্প এখনো এর শিল্প-নিসর্গ আবীর্ণ করেনি। বরং বাসাবাড়িতে গ্যাসসংযোগ আদায় করে সেই কবে থেকে সিলেটের মানুষ রান্নার ধকল কমিয়ে গ্যাসের লাগসই ব্যবহার নিশ্চিত করেছে।
সিলেটের সম্ভাবনা যদি তৈরি করে থাকে এর প্রাকৃতিক সম্পদ, এর সমস্যা সৃষ্টি হয় উন্নয়নের এবং শিল্পায়নের লক্ষ্যে সেগুলো কাজে লাগাতে না পারার অক্ষমতা। আমরা কবে থেকে শুনে এসেছি, ছাতকে আরেকটি সিমেন্ট কারখানা হবে, অন্যান্য জায়গায় এগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি অথবা বেতের আসবাবপত্রের আধুনিক কারখানা হবে। সিলেট-ঢাকা রেলপথ দ্বিমুখী হবে, সিলেট-ঢাকা হাইওয়ে চার লেনের হবে। বিশ্বমানের আইসিটি পার্ক হবে। এসব কিছুই হয়নি, শোনা কথা থেকে গেছে শোনা কথার জায়গায়।
সিলেট অথবা সুনামগঞ্জ অথবা হবিগঞ্জ শহরের কথা ধরা যাক। ত্রিশ বছর আগেও যেগুলো ছিল ছিমছাম সুন্দর শহর। সিলেটে গ্রন্থাগার ছিল, বইয়ের দোকান ছিল; সিলেটে উৎসব হতো সারা বছর। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ছিল। এর সম্ভাবনা ছিল আরও সমৃদ্ধ এক ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করার। কিন্তু এই ত্রিশ বছরে আমরা সেই পথে আর যেতে পারিনি। সিলেটের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু পড়াশোনার বিভাগটি পিছিয়ে পড়েছে। সুরমা বা কুশিয়ারা তাদের সৌন্দর্য হারিয়েছে। দূষণ এবং দখলের ফলে সুরমা নদীর সুরম্য বিস্তার কমেছে। শহরে দূষণ বেড়েছে শহরগুলোতে পয়োনিষ্কাশনের অবস্থা করুণ। সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে শহরগুলো। এদের সর্বত্র হইহুল্লোড়, শব্দদূষণ। রাস্তাগুলোতে হাঁটা যায় না। রাতে বাতি জ্বলে না অধিকাংশ রাস্তায়। বিদ্যুতের দশাও করুণ।
সিলেটের সমস্যা অবশ্য এর একার নয়, সারা দেশেই এ রকম ঘটছে। কিন্তু সিলেটের কষ্ট বাড়িয়েছে এর নির্মাণাধিক্য। সিলেটের অনেক লোক থাকেন ইংল্যান্ড-আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। তারা যে পুঁজি পাঠান সিলেটে তার একটি বড় অংশ খরচ হয় জমি কেনায়, দালানকোঠা বানানোয়। সিলেট শহরে স্কুলের হোস্টেলের জমিতে একটা মার্কেট উঠেছে, তার মাথায় আবার একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই নিয়েছে। কিন্তু এই বাজারের মাঝখানে পড়াশোনাটা কীভাবে হয়, আমার মাথায় আসে না। আমি কিছুদিন আগেও দেখেছি, এই শহরের মানুষগুলো শিক্ষা-দীক্ষাকে আর তেমন মূল্য দেয় না। অথচ একসময় শিক্ষা নিয়ে একটা অহংকার ছিল। কেউ ম্যাট্রিক বা এসএসসিতে প্রথম, দ্বিতীয় হলে সারা জেলায় সে সেলিব্রিটি হয়ে যেত।
এখন প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া ছেলে বা মেয়ে বড়জোর বাবা-মা বা শিক্ষকদের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে।
শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েই বিপদ ডেকে এনেছে সিলেট। ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের সময় সারা দেশে শিক্ষা-দীক্ষায় সিলেট ও বরিশাল ছিল সবার আগে। বরিশাল এখনো তার অবস্থান ধরে রেখেছে। সিলেট পড়েছে ক্রমাগত পিছিয়ে। শিক্ষার হার যত কমছে, বিদেশে পাড়ি দেওয়ার এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করার প্রবণতা তত বেড়েছে। এর ফলে এই বিভাগটির নিজের স্বার্থরক্ষার এবং নিজের উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষমতা কমেছে। দেশের উন্নয়ন সরকার করে না; সরকার করায়। আর যাদের মাধ্যমে তা করায়; সরকারি কর্মকর্তা, নির্মাণবিদ, পরিকল্পনাকারী, প্রকৌশলী—এঁদের মধ্যে সিলেটিদের সংখ্যা এখন অনেক কম। আর বাড়ি ছেড়ে বিদেশে চলে গেলে বাড়ির কাজ মানুষ কীভাবে আদায় করে?
আমার চোখে সিলেটের যে তিনটি প্রধান সমস্যা ধরা পড়েছে সেগুলোর সমাধান না হলে এ শহর, এ জেলা এবং এ বিভাগের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হবে না। ফলে দেশের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সমস্যা তিনটি হচ্ছে শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি ব্যাপক অনাগ্রহ, যদিও সম্প্রতি এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে; সহজে বড়লোক হওয়ার প্রবণতা, যা অনেক তরুণকে শিক্ষা ছেড়ে বাণিজ্যের দিকে অথবা বিদেশে পাড়ি জমাতে উৎসাহিত করছে এবং একধরনের গাছাড়া ভাব, যার আরেক নাম আলস্য অথবা আস্তিন গুটিয়ে কাজে নেমে পড়ার অনীহা। এর ফলে দক্ষ, তেজি এবং একগুঁয়ে উদ্যোক্তার অভাব রয়েছে সিলেটে। এই প্রবৃত্তি বড় অর্জনের পথে অন্তরায়।

আমি নিজে এই প্রবৃত্তি শ্রেণিতে পড়ি, ফলে বুঝতে পারি কেন সিলেটের উন্নতি প্রত্যাশামতো হয় না। সিলেট শহরের বেশ কটি সংগঠনের খবর আমি জানি, যেগুলো শিক্ষার প্রসার, জনসেবা ইত্যাদি এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সেগুলো দরজা বন্ধ করে কাজে ইস্তফা দিল। এ রকম একটি সংগঠন একবার আমাকে সিলেটে শিক্ষা প্রসারের জন্য পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিল। অথচ সিলেটে শিক্ষা প্রসারে আমার কোনো ভূমিকাই নেই। অর্থাৎ একজনকে পুরস্কার দেওয়ার আগে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার মতো আগ্রহ সংগঠনটির ছিল না। এ জন্য দুই বছরের মধ্যেই এর অপমৃত্যু ঘটলে আমি অবাক হইনি।
অবশ্য একটি কাজে সিলেটের লোকজনের উৎসাহ যথেষ্ট এবং তা হলো মার্কেট বসানোর এবং দোকান খোলার। ঢাকার আদলে এখন সিলেটে রেস্টুরেন্ট, ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে শুরু করে কাপড়চোপড়ের বুটিক হয়েছে। সেগুলোতে ভিড়ও লেগে থাকে দিনমান। কিন্তু ভালো বইয়ের দোকান নেই। একটি যে আছে, তারও অবস্থা সঙিন। এ থেকে বোঝা যায় সিলেট কোন পথে এগোচ্ছে।
সমস্যা আরও আছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে সম্ভাবনার ছবিটা একটু দেখা যাক। সম্ভাবনা আছে শিক্ষার এবং মুজতবা আলী কথিত দুই ধরনের শিল্পে।
শিক্ষার বিস্তার ঘটছে সারা দেশে। সিলেটেও যদি ও মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে বিস্তারের একপর্যায়ে হয়তো মান নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। একসময় সিলেটে শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার ফল অন্য সব বোর্ড থেকে খারাপ হতো। গত দু-তিন বছরে এ অবস্থান পাল্টেছে। শিক্ষা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন এ রকম কিছু শিক্ষাকর্মী আমাকে জানালেন, গ্রামে-শহরে, স্কুলে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর আগ্রহ এখন অনেকটাই বেড়েছে; শিক্ষার্থীরাও এখন পড়াশোনাটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। হাওর অঞ্চলে বর্ষায় নৌকায় করে, অনেক ঝুঁকি নিয়ে শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে। এবারে হাওর অঞ্চলে দুবার বন্যা হলো, দুবারই স্কুল বন্ধ করে দিতে হলো। কিন্তু প্রথম সুযোগেই সেগুলো খুলেও দেওয়া হলো। কুড়ি বছর আগে হলে এই ছবিটা হয়তো দেখতে পাওয়া যেত না।
বিজ্ঞান শিক্ষাতে সিলেটে আগ্রহ বাড়ছে; মেয়েদের ভেতর এই আগ্রহটি বেশি। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। আমি দেখেছি, সিলেটে যেসব মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে, সেগুলোতে প্রচুর মেয়ে পড়ছে। যত বেশি মেয়ে বিজ্ঞান পড়ছে, ডাক্তারি প্রকৌশলবিদ্যা পড়বে, তত শিক্ষার ফলটা তারা কাজে লাগাবে। একসময় সিলেট বা মৌলভিবাজার শহরকে পুরুষশাসিত বা পুরুষপ্রধান মনে হতো। মেয়েরা এমনকি কেনাকাটার জন্যও ঘরের বাইরে বলতে গেলে যেতই না। সে অবস্থা পাল্টেছে। ঘরের বাইরের নানা কাজে—চাকরিবাকরি এমনকি পরিবারের নানা প্রয়োজনে তারা এখন সক্রিয়। সমাজের সব কাজে নারীদের সমান অংশগ্রহণ সমাজকে যে এগিয়ে নেয়, তা তো বিশ্বের অনেক দেশেই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
শিক্ষা শুধু মানুষকে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানই যে দেয় তা নয়; শিক্ষা মানুষকে জানায়, তার মনের জানালাগুলো সব খুলে দেয়। মানুষ পৃথিবীটাকে জানতে পারে। তখন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রকল্প নিয়ে তারা মাঠে নেমে পড়ে। আমার বিশ্বাস, সিলেটের শিক্ষাচিত্রটি একদিন আরও উন্নত হবে, সমাজটাও বদলে যাবে। সেই সম্ভাবনার ছবিটা এখনো অস্পষ্ট হলেও ছবিটা তো আছে। একদিন নিশ্চয় স্পষ্ট হবে।
সম্ভাবনার বিষয়টা শিল্পের আদি অঞ্চলে আছে। এই শিল্প হচ্ছে সংস্কৃতির নানা ফসল। সংস্কৃতির প্রতি সিলেটে একসময় প্রবল আগ্রহ ছিল। আমার ছেলেবেলায় দেখেছি, পাড়ায় পাড়ায় গানের-নাটকের অনুষ্ঠান হচ্ছে। সিলেটে উচ্চাঙ্গসংগীত সম্মেলন হয়েছে। সেখানে আল্লারাখা খান, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান এসেছেন। স্কুলগুলোতেও নাটক হতো, খেলাধুলা হতো সারা বছর। সাহিত্যচর্চা হতো সিলেটের সবখানে। মাঝখানে তাতে ভাটা পড়েছে। সংস্কৃতিচর্চার বিরুদ্ধে অন্ধ আক্রোশও দেখিয়েছে কিছু মানুষ। মনে আছে, একবার শামসুর রাহমানকে সিলেটে এসেও কোনো অনুষ্ঠান না করে এদের কারণে ফিরে যেতে হয়েছে। সে অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেছে। তরুণেরা চেষ্টা করছে সংস্কৃতির ম্রিয়মাণ স্রোতটাকে বেগবান করতে।
একদিন নিশ্চয়ই তারা পারবে। তখন সিলেট সত্যিকার অর্থে সামনের দিকে পা রাখবে।