সামরিক একাডেমিতে পাঠ্য যে রণক্ষেত্র
অনেক প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজ স্বাধীনতার ৫০ তম বছরে একটি রণক্ষেত্র এখানে আলোচনা করা যাক—যা আন্তর্জাতিক সিলেবাসে সামরিক একাডেমিতে পাঠ্য।
দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল এ কে নিয়াজী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৯১ হাজার ৬৩৪ জন সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। পূর্ব বাংলার নানা অঞ্চলে ১১টি সেক্টরে যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় লে. জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলে সবাই আশা করছিল, কমান্ডার হায়াত খান আর যুদ্ধ চালাবে না। কিন্তু সব আশাকে ভুল প্রমাণ করে রাত নয়টায় আবার অস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠে খুলনার শিরোমণি রণক্ষেত্র।
কমান্ডার হায়াত খান যশোর সেনানিবাস ছেড়ে তার বিশাল ট্যাংক রেজিমেন্ট, পদাতিক সেনা, রাজাকার বাহিনীর বিশাল শক্তি নিয়ে খুলনার শিরোমণি এলাকায় জড়ো করেন। পরবর্তীতে খুলনার শিরোমণি, আটরা, গিলাতলা, তেলিগাতি, দৌলতপুর ও শোলগাতিয়া এলাকার একাধিক স্থানে ক্যাম্প গড়ে তোলেন। জনশূন্য শিরোমণি এলাকায় কমান্ডার হায়াত খান সবচেয়ে বড় ক্যাম্প গড়েন এবং মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করতে থাকেন।
বিজয় অর্জিত হয়েছে এমন ভাবনায় দেশীয় শিবিরের সবাই যখন আচ্ছন্ন, তখন হঠাৎ করেই তীব্র আক্রমণ চালায় হায়াত খানের বাহিনী। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। দুই পক্ষই সমানে গোলাবর্ষণ করছে। দুই পক্ষেরই হতাহতের সংখ্যা প্রচুর। রাত তিনটার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আরও জোরালো আক্রমণ করলে হঠাৎ করেই একসঙ্গে বেশ কয়েকজন আঘাতের শিকার হন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসারসহ সাতজন নিহত ও প্রায় ৩০ জন আহত হন। মুক্তিবাহিনীর ক্ষতি আরও বেশি, নিহত ৩১ জন, আহত প্রায় চার গুন।
এ অবস্থায় এয়ার কভারেজের জন্য ম্যাসেজ পাঠালে মিত্রবাহিনী থেকে জানানো হয়, বিমান প্রস্তুত আছে দমদম এয়ারপোর্টে। দূরত্ব হিসাব করে বোঝা গেল, বিমান বাহিনীর সাহায্য আসতে অনেক দেরি। প্রচণ্ড বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে মেজর মঞ্জুর দাবি করেন, সম্মিলিত বাহিনীর দায়িত্ব তার হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক। যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী, শত্রুবাহিনীর ওপর হামলা করার আগে নিজেদের কমপক্ষে তিনগুন শক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা সম্মিলিত বাহিনীর ছিল না। তাই স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করতে হবে। ভারতীয় কমান্ডার ইতস্তত করতে থাকলে মেজর মঞ্জুর তার কোমরের বেল্ট খুলে টেবিলে রাখেন—যার অর্থ জয়ী না হয়ে আর ফিরবেন না তিনি। অবশেষে দলবীর সিং সম্মিলিত বাহিনীর দায়িত্ব মেজর মঞ্জুরের হাতে তুলে দেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার আগে, নিশ্চিত মৃত্যু ধারণা করে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে এক বাক্যের একটি শেষ বিদায়ী চিঠি এক সৈনিকের কাছে রেখে আসেন মেজর মঞ্জুর। এরপর শুরু হয় চূড়ান্ত যুদ্ধ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মিত্রবাহিনীর ট্যাংকগুলোর দুইটিকে সংকেত অনুযায়ী শিরোমণি-খুলনার প্রধান সড়কে ও ছয়টিকে ডান দিকের নিচু বেত গাছের সারির পাশ দিয়ে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা বুহ্যের পেছনে দ্রুতগতিতে পৌঁছে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন। প্রচুর হতাহতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ট্যাংকের পেছনে থাকেন ১২ জন করে সুইসাইড কমান্ডো। এর মধ্যে দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, আহত হন আরও একজন। ভারতীয় সেনাবাহিনীরও একজন আহত হন। ভোরের আলো ফোটার একটু আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানে আঘাত হানলেন মেজর মঞ্জুর। সবার আগে এসএলআর হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে নিশ্চিত মৃত্যু মাথায় নিয়ে শত্রু ব্যূহে ঢুকে গেলেন মেজর মঞ্জুর।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুটি টি-১৬০ ট্যাংক শিরোমণি-খুলনা প্রধান সড়ক দিয়ে আর ছয়টি টি-১৬০ ট্যাংক ডান দিক থেকে এগিয়ে গেল দ্রুত গতিতে। দুপক্ষ থেকেই শুরু হলো কামান ও ট্যাংকের অবিরাম গোলাবর্ষণ। যার চিহ্ন ছড়িয়ে পড়ল প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। আশপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, প্রবল গোলাবর্ষণের আলোর ঝলকানিতে আকাশ হয়ে উঠছে ফরসা। এর মধ্যেই লড়ে চলেছে মঞ্জুর বাহিনী। যুদ্ধ চলছে ট্যাংকের সঙ্গে ট্যাংকের, পাশাপাশি কোথাও কোথাও চলছে গোলাগুলি, হাতাহাতি। মেজর মঞ্জুর এসএলআর নিয়ে গুলি করতে করতে চলন্ত একটি ট্যাংকের মধ্যে ঢুকে গানারকে হত্যা করে সেটার দখল নিয়েছিলেন। ভোর ৬টার একটু আগে ভারতীয় বিমানবাহিনী হামলা শুরু করলে ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খানের শেষ প্রতিরোধও ধ্বংস হয়ে যায়।
১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর বেলা দেড়টায় খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে লিখিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মিত্র বাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং, ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর আবুল মঞ্জুর ও ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল, পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের বেল্ট ও ব্যাজ খুলে নিয়ে আত্মসমর্পণের প্রমাণাদিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।
বর্তমানে এই যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা সিলেবাস আকারে আন্তর্জাতিক মিলিটারি একাডেমিতে পড়ানো হয়। তবে ‘শিরোমণি ট্যাংক যুদ্ধ’ নামের এই যুদ্ধ কৌশলগত কারণে বিখ্যাত। এ যুদ্ধের কৌশল ভারত, পোল্যান্ডসহ ৩৫টি দেশের সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা কলেজে পড়ানো হয়। বিশ্বের সেরা কিছু ট্যাংক যুদ্ধের মধ্যে শিরোমণি ট্যাংক যুদ্ধ একটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ যুদ্ধক্ষেত্রও এই শিরোমণি।