সবুজ মেঘের ছায়া-সতেরো

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

নাবিদ দৃশ্যটাকে কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। মিসেস এলিরা স্মিথ একটা চেয়ারে বসে আছেন। তার মুখ হা করা। বিস্কুটের কিছু গুঁড়ো তার ঠোঁটের কাছে লেগে আছে। সারি বাঁধা কালো পিঁপড়া ঠোঁটের কোণের সেই বিস্কুটের গুঁড়োগুলো নিয়ে টানাটানি করছে। এলিরা স্মিথ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। তার দুই হাত অবলম্বনহীনভাবে ঝুলে আছে। একটা হাতে তখনো একটা বিস্কুট ধরা। সেখানেও কালো পিঁপড়ার সারি।

সোমবারে ঘটনাটা ঘটে। আজ শনিবার। এরই মধ্যে পাঁচ দিন চলে গেছে।

নাবিদ ভাবল, কীভাবে পাঁচটা দিন চলে গেল! মিসেস স্মিথের পচে ফুলে ওঠা লাশ উদ্ধার করে দুই দিন ওয়াইকাটো হাসপাতালের হিমাগারে ছেলেমেয়েদের অপেক্ষায় রাখা হয়। এলিরা স্মিথের মৃত্যুর পর তার সব ছেলেমেয়েরাই আসে। তার যে এত আত্মীয়স্বজন আছে, তা নাবিদ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করত না। অথচ তার জীবিতকালে নাবিদ তাদের টিকিটি পর্যন্ত দেখেনি।

মিসেস স্মিথের আত্মীয়স্বজনরাই হ্যামিল্টনে তিন দিন থেকে তার শেষকৃত্যের সব কাজ সেরে গেছেন। হাসপাতাল, ফিউনারেল ডিরেক্টরের মাধ্যমে নিউস্টিড সিমেট্রিতে কবর দেওয়ার জন্য একটুকরো জায়গার ব্যবস্থা করা ও এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে সবার উপস্থিতিতে তার স্মৃতিচারণ!

নাবিদ নিজেও সেদিন জুঁইকে দোকানে বসিয়ে নিউস্টিড সিমেট্রিতে গিয়েছিল। তবে একটা ব্যাপার নাবিদের মোটেও ভালো লাগেনি। সেটা হলো মিসেস স্মিথের লাশটা নিউস্টিড সিমেট্রিতে কবর দেওয়ার পর তার আত্মীয়স্বজন, এমনকি তার ছেলেমেয়েরা বাসায় ফিরে কোথায় একটু শোকের মাতম করবে, তা না। তারা সারা রাত মদ্যপান আর হই-হুল্লোড়ে বাড়িটা মাত করে রেখেছিল। তারা এমন আচরণ করছিল যেন ওই বাড়িতে কোনো মানুষ মরেনি। কারও বিয়ে হচ্ছে বা কারও জন্মদিন পালন করা হচ্ছে।

নাবিদের বরাবরই মনে হয়, এ দেশের মানুষজন যেন সবকিছুতেই আনন্দ খোঁজে। এমনকি মৃত্যুতেও!

নাবিদ দোকানের কাউন্টারের পেছনের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাসা থেকে আসার সময় সে এলিরা স্মিথের বাড়িটাকে মৃতর মতো দেখে এসেছে। অথচ তার বাগানে বেশ অনেকগুলো গোলাপ ফুল ফুটেছে। বেশ অনেকগুলো লাল গোলাপের পাশাপাশি কয়েকটা কালো গোলাপ ও সাদা গোলাপ আছে। বেঁচে থাকলে আজও তিনি নিশ্চয়ই মৌনতাকে কিছু গোলাপ কাঁচি দিয়ে কেটে এনে দিতেন। আদর করে মৌনতাকে বলতেন, মুনতা, মুনতা, ফুলগুলো কিন্তু পানি দিয়ে ভিজিয়ে রেখ। নয়তো খুব তাড়াতাড়ি ঝরে যাবে।

এলিরা স্মিথ তাদের কারও নামই ঠিকমতো বলতে পারতেন না। মৌনতাকে যেমন মুনতা বলতেন, তেমনই নাবিদকে নাবইদ ও জুঁইকে জুহু বলতেন। এটা শুধু এলিরা স্মিথের বেলায়ই নয়। এ দেশের মানুষ, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান সাদারা অন্য কোনো দেশ থেকে আসা কারও নাম শুদ্ধ করে উচ্চারণ করতে পারেন না। নাবিদের প্রথম প্রথম মনে হতো, তারা যেন ইচ্ছে করেই নাম বিকৃতি করে বলেন। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে, না, তার ধারণা ঠিক নয়।

জুঁই অফিস রুমের লম্বা সোফাটায় শুয়ে আছে। আজ নদী দোকানে ট্রেনিং নিতে আসবে। নদী আসবে বারোটার দিকে। কিন্তু জুঁই বাসায় কিছু করার নেই বলে নয়টার দিকে মৌনতাকে সঙ্গে করে দোকানে এসেছে। এ ছাড়া, জুঁই নদীর ট্রেনিংয়ের বিষয়ে নাবিদের ওপর ভরসা করতে পারে না। তাই সে আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছে।

মৌনতাও অফিস রুমে মার পাশে কম্পিউটারে গেম খেলছে। আর কড়মড় করে পটেটো চিপস খাচ্ছে। এ বয়সেই তার বেশ গেমের নেশা পেয়ে বসেছে। কিন্তু নাবিদ কী করবে? মৌনতাকে কিছু বলতে গেলে মৌনতা উল্টো তাকে কতগুলো উপদেশ শুনিয়ে দেয়। কম্পিউটারে বা মোবাইলে গেম খেললে নাকি ব্রেন শার্প হয়, আইকিউ বাড়ে...!

দোকানে আধা ঘণ্টা-চল্লিশ মিনিট পরপর এক-দুজন কাস্টমার আসে। পত্রিকা, দুধের কন্টেইনার বা রুটি নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ আসছে সিগারেট কিনতে।

নাবিদ প্রতিবারই কাস্টমার বিদায় হলে কাউন্টারের পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটা তার অভ্যাস। কাউন্টারের পাশেই একটা টুল আছে। অফিস রুমে একটা চেয়ারও আছে। কিন্তু সে বরাবর দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।

এই মাত্র একজন কাস্টমার বিদায় করে নাবিদ আবার কাউন্টারের পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই সে এলিরা স্মিথের কথা আবার ভাবতে শুরু করল। একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে একটা বাড়িতে কেমন স্তব্ধতা নেমে আসে তা সে সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় এলিরা স্মিথের বাড়ির দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছে। তিনি কী চমৎকার একজন প্রতিবেশীই না ছিলেন! মৌনতা সেদিন এলিরা স্মিথের লাশ দেখার পরও এখনো বুঝতে পারছে না তিনি বেঁচে নেই। ওর ধারণা, তিনি কোথাও ঘুরতে গেছেন। হয়তো দু-চার দিনের মধ্যেই তিনি চলে আসবেন। গত পাঁচ দিন ধরে মৌনতার একই প্রশ্ন, মিসেস এলিরা স্মিথ কখন বাসায় ফিরবেন? আমার বেবি ডলটার চোখ ঠিক করতে তার কাছে নিয়ে যেতাম। আচ্ছা, বাবা, আমার বেবি ডলটার জন্য তো তুমি চোখের ডাক্তার ডাকনি?

নাবিদ ভাবল, মানুষ এত তাড়াতাড়ি মরে কেন? একটা কচ্ছপ যেখানে পাঁচ শ বছর বাঁচে, সেখানে মানুষ দুই শ বছর বাঁচলে ক্ষতি কী?

নাবিদের দোকানে একজন ভদ্রলোক মাঝেমধ্যে এটা-সেটা কিনতে আসেন। ভদ্রলোক বিপত্নীক। তিনি ক্যান ব্রাউন ড্রাইভের রিটায়ারমেন্ট ভিলেজে থাকেন। মিসেস মার্গারেটের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে খুব বেশি দূরে নন। মাত্র চারটা অ্যাপার্টমেন্ট পরেই তিনি থাকেন।

ভদ্রলোকের নাম ড. ডেভিড হ্যাক। তিনি দোকানে এলে নাবিদ মজা করে বলে, মিস্টার হ্যাক, আপনি হ্যাকার নন তো?

ডেভিড হ্যাক কৃত্রিম দাঁত বের করে হাসেন। এ দেশের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের হাসি খুব সুন্দর। হয়তো কৃত্রিম দাঁত পরেন বলেই তাদের হাসিটা এত সুন্দর লাগে। ভেভিড হ্যাক অ্যাপ্লাইড ফিজিকসের ওপর পিএইচডি করলেও কখনো শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেননি। সারা জীবন বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করেছেন। কখনো ব্যাংকে, কখনো কন্সট্রাকশন ফার্মে, কখনো সিটি কাউন্সিলে। শেষের দিকে একটা টেলিকমিউনিকেশন অফিসে সিইও পর্যন্ত হয়েছিলেন। সেখান থেকেই তিনি অবসরে যান।

সেই ডেভিড হ্যাক দোকানে এলে নাবিদকে একটা কথা প্রায়ই বলেন, ম্যান, লাইফ ইজ টু শর্ট। এনজয়, জাস্ট এনজয়।

তবে ডেভিড হ্যাকের এ সব কথা বলার মধ্যে নাবিদ কখনো সুখবোধ দেখে, কখনো দুঃখবোধ খুঁজে পায়। ডেভিড হ্যাকের জীবনের অতীত সব ঘটনা নাবিদ জানে না। তবে সে যেটুকু জানে তাতে মনে হয়, তিনি সারাটা জীবন খুব খামখেয়ালি ধরনের ছিলেন। তার তিন ছেলেমেয়ে। এক ছেলে নিউজিল্যান্ড মিনিস্ট্রি অব এডুকেশনে চাকরি করে। দ্বিতীয় ছেলে অস্ট্রেলিয়ার কোয়ান্টাস এয়ারলাইনসের পাইলট। মেয়েটা এয়ার নিউজিল্যান্ডের বিমানবালা। কিন্তু কোনো ছেলেমেয়ের সঙ্গেই ড. ডেভিড হ্যাকের যোগাযোগ নেই। হয়তো ছেলেমেয়েরাই তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না।

নিউজিল্যান্ডে বাবা-মার সঙ্গে ছেলেমেয়েদের যোগাযোগ না থাকাটা একটা গতানুগতিক ব্যাপার। বাবা-মারাও তাতে কিছু মনে করেন না। ডেভিড হ্যাকও সেরকমই। তার স্ত্রী মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর আগে।

ডেভিড হ্যাকের বেশ জমানো টাকাপয়সা আছে। এ ছাড়া, তিনি বেশ বড় বড় চাকরি করেছেন বলে পেনশনের টাকাটাও বড় অঙ্কের পান। কিন্তু তার টাকাপয়সা খরচ করার কোনো স্থান নেই। এ জন্য দেখা যায়, তিনি ছয় মাস পর পর গাড়ির মডেল পরিবর্তন করেন। কোনো সোসাইটি গার্লকে এক সপ্তাহের জন্য সঙ্গে নিয়ে কাছে বা দূরে কোথাও ছুটি কাটাতে চলে যান। ক্যাসিনোতে গিয়ে প্রায় সব সময় জুয়া খেলেন। এ ছাড়া, ম্যাসাজ পারলারে গিয়ে শরীর ম্যাসাজ করা তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

এতেই ডেভিড হ্যাকের আনন্দ। এই আনন্দ তিনি দিনের পর দিন করছেন। আর এই আনন্দের কথা তিনি নিঃসংকোচে বলতে দ্বিধা করেন না। এখন তার বয়স বাহাত্তর বছর। কিন্তু বয়সের তুলনায় তিনি বেশ শক্ত-সামর্থ্য। এখনো তিনি এক কিলোমিটার অনায়াসে দৌড়ে চলে আসতে পারেন।

নাবিদ ডেভিড হ্যাকের মতোই ভাবল, জীবন সত্যি খুব ছোট। এই ছোট্ট জীবনটায় যতটুকু ভালো থাকা যায়, যতটুকু আনন্দে থাকা যায়। যদিও এই ভালো বা মন্দ থাকার দ্বন্দ্ব সর্বত্র। দ্বিধাটাও বেশ প্রখর।

নাবিদ এমনই আরেকজনের অতি ছোট্ট জীবনের গল্প জানে। তার যে ডিন্সডেলের বাড়িটা, সেই বাড়িতে যিনি ভাড়া থাকেন তার নাম ফিয়োনা। ছিপছিপে গড়নের সোনালি চুলের অপূর্ব সুন্দরী এক যুবতী ফিয়োনো। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। তার স্বামী হেনরিও তার সঙ্গে থাকে। বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের দীর্ঘ সম্পর্কের ইতি ঘটিয়ে মাত্র কয়েক মাস আগেই বেশ বড় করে বিয়ের আয়োজন করে তারা যথার্থ স্বামী-স্ত্রী হয়েছেন।

সেই ফিয়োনার ব্লাড ক্যানসার। ডাক্তার বলেছিলেন, ফিয়োনা ছয়-সাত মাসের বেশি বাঁচবেন না। কিন্তু আজ এক বছরের মতো হয়ে গেছে, এখনো বেঁচে আছেন। আরও বেশ কিছুদিন বাঁচবেন বলে সবার ধারণা।

ফিয়োনার মনের জোর খুব প্রবল। নিশ্চিত মৃত্যুকে মানসিকভাবে বরণ করেই প্রতিনিয়ত আনন্দ করছেন। নাইট ক্লাবে যান। সি-বিচে গিয়ে সার্ফিং করেন। প্রতিটা মাস পূর্ণ হলেই বাসায় বড় করে পার্টি দেন। মাস পূর্তির আনন্দে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন নিয়ে বারবিকিউ, মদ-বিয়ার খেয়ে সারা রাত হই-হুল্লোড় করেন। অথচ প্রতি সপ্তাহেই তাকে ওয়াইকাটো হাসপাতালে ব্লাড ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য যেতে হয়। দুই মাস পরপর কেমোথেরাপি নেন।

নাবিদ ভাবল, এ তো মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা কিছু মানুষের কথা। কিন্তু যারা মৃত্যুকে কষ্ট হিসেবে বরণ করে, তাদের কথা তো আরও করুণ। বিশেষ করে প্রবাসে কারও মৃত্যু। এই তো কিছুদিন আগে অকল্যান্ডে মোয়াজ্জেম হোসেন নামে এক ভদ্রলোক হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। তিনি বুয়েট থেকে পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বাংলাদেশে অনেক নামীদামি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে নিউজিল্যান্ডে অভিবাসী হয়ে আসেন। নিউজিল্যান্ডে এসে তিনি নিজের পেশায় চাকরি না পেয়ে ট্যাক্সি চালাতেন। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তার ছোট্ট সুখের সংসার ছিল।

সেদিনও মোয়াজ্জেম সাহেব ট্যাক্সি চালাচ্ছিলেন। দুপুরের দিকে অকল্যান্ডের ওয়েস্টার্ন স্প্রিংব্রুকে এক প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে ডলারগুলোও গুনতে পারেননি। এরই মধ্যে তিনি শেষ। তার একটা হাত স্টিয়ারিং ধরা ছিল, অন্য হাতে ছিল ডলারগুলো...!

তেমনই কামাল আহমেদ। কামাল আহমেদ মারা যান মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। সুস্থ মানুষ ছিলেন। তাওরাঙা শহর থেকে এক বাঙালি রোগীকে ওয়াইকাটো হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। ভেতরে ডাক্তার সেই বাঙালি রোগীকে দেখছিলেন। আর তিনি হাসপাতালের লাউঞ্জে অপেক্ষায় বসে ছিলেন। হাসপাতালের লাউঞ্জে বসা অবস্থায় তিনি শেষ!

কামাল আহমেদের জীবিত অবস্থায় তার পরিবারের কাছে কথায় কথায় বলতেন, তিনি যদি কখনো মারা যান, তার কবর যেন বাংলাদেশের মাটিতে দেওয়া হয়।

কামাল আহমেদের সেই ইচ্ছে অনুযায়ী তার পরিবার তার লাশ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য অন্য বাঙালিদের কাছে সহযোগিতা চান। নাবিদ একটা ব্যাপার বরাবরই অবাক হয়ে দেখেছে, জীবিত অবস্থায় এখানকার একজন বাঙালি আরেকজন বাঙালির কাঁচা মাংস চিবিয়ে খেলেও কোনো বাঙালি মারা গেলে সেই বাঙালিরাই আবার খুব আপন জনের মতো কাঁদে। সহযোগিতা করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

ঠিক তেমনই কামাল আহমেদের লাশ বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যাপারে সব বাঙালিরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। তবে নাবিদ কামাল আহমেদের লাশ পাঠানোর সময় এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। কামাল আহমেদের লাশ নাকি কেজি ধরে হিসেব করে দেশে পাঠাতে হবে এবং প্রতিটা এয়ারলাইনস ফোনে হিসাব জানায়, লাশের কেজি ফরটিন ডলার অ্যান্ড টোয়েন্টি ফাইভ সেন্টস...! নাবিদ তখন একটা কথাই ভাবে, এই তো মানুষের জীবন। এই জীবনের জন্য কত হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি। আর এক দুর্ভাগা জীবন হলো প্রবাসজীবন। মৃত্যুর পর মানুষের লাশকে ওজন করে মাপা হয়। লাশের কতটুকু ওজন হলো, সে অনুযায়ী মূল্য করে এয়ারলাইনস এই প্রবাস থেকে দেশের মাটিতে সেই লাশকে নিয়ে যায়!

জুঁই অফিস রুম থেকে সামনে এল। তার চোখ হালকা ঘুম দিয়ে ওঠার কারণে একটু ভারী। সে নাবিদের দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার, এমন ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

নাবিদ মৃদু হেসে বলল, কী আর করব? কাস্টমার এক ঘণ্টাতেও একটা আসে না।

জুঁই মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হুম, তাই তো দেখছি। আমিও দোকানে থেকে কী করব, ভাবছি। তোমার বোন একটু সকাল সকাল চলে আসলে পারত। সকাল সকাল আসলে তার কী এমন ক্ষতি হতো? আজ তো তার ক্লাস নেই? শনিবার।

নাবিদ বলল, নিশ্চয়ই অন্য কোনো কাজ আছে?

: ঘোড়ার ডিম কাজ আছে! খোঁজ নিয়ে দেখ, নদী এখন ওই ছেলেটার বাসায় গিয়ে বসে আছে। ছেলেটার নামটা না যেন কী?

: রাকিব।

: হ্যাঁ হ্যাঁ, রাকিব। শোনো, নদীকে এ ব্যাপারটা জিজ্ঞেস কর তো?

: কোন ব্যাপারটা?

: নদী কি তার সঙ্গে লিভ টুগেদার করে কিনা?

: তোমাকে কে বলেছে যে নদী রাকিবের সঙ্গে লিভ টুগেদার করে।

: এখানকার বাঙালি অনেকেই বলে। বেবুন ভাবি তো বাসায় বাসায় গিয়ে বলে বেড়াচ্ছে।

: বেবুন ভাবি হলেন অ্যাকোরিয়ামের পচা একটা মাছ। নিজে তো পচেছেন, অন্যকেও পচিয়ে ছাড়ছেন। ব্লাডি রোটেন ফিশ!

: তুমি বেবুন ভাবিকে এভাবে গালি দিচ্ছ কেন? তিনি তো ভুল কিছু বলেননি। আগে নদীকে চিনতাম না। সে লিভ টুগেদার করুক আর যা ইচ্ছে তাই করুক, আমাদের কিছু যেত-আসত না। এখন যেহেতু তোমার বোন। কাজিন। আমি মনে করি, তাকে এ কথাগুলো জিজ্ঞেস করা উচিত।

: জুঁই, তুমি একটু বেশি বেশি ভাবছ না?

: হ্যাঁ, ভাবছি। কারণ ভাবতে হচ্ছে। মানুষজন কিন্তু দুদিন আগে বা পরে আমাদের দিকে আঙুল তুলবে।

: তোমাকে কে বলেছে নদী রাকিব ছেলেটার সঙ্গে লিভ টুগেদার করে? তুমি তো নিশ্চিত না। একটা অনিশ্চিত কথা তাকে আমি কীভাবে জিজ্ঞেস করি? মাত্রই তো কয়েক সপ্তাহ আগে পরিচয় হলো।

: তুমি তাকে এভাবে জিজ্ঞেস না করে অন্যভাবে জিজ্ঞেস করতে পার। এটা তো সত্য, তুমি আমি সবাই জানি, নদী ও রাকিব এক সঙ্গে চলাচল করে। এখানে সেখানে ঘুরতে যায়। তুমি তাকে ওটাই জিজ্ঞেস কর?

: তাকে ওটা কী জিজ্ঞেস করব?

জুঁই একটু রেগে গিয়ে বলল, তুমি আসলেই একটা ভেড়া প্রজাতির। মানুষ হিসেবেও। কাজেকর্মেও। দেখ, নদী বুয়েট থেকে পাস করা একটা মেয়ে। ওয়াইকাটো বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে মাস্টার্স করছে। ভবিষ্যতে পিএইচডি করবে। আর রাকিব? সে কখনো কোনো ইউনিভার্সিটিতেই গেছে কিনা, জানি না। এ ছাড়া সে নাকি আগে একটা বিয়ে করেছিল। পাঁচ বছর সংসারও করেছে। একটা মেয়েও ছিল। এমন একটা ছেলের সঙ্গে নদী কেন যে ঘোরাঘুরি করে?

নাবিদ জুঁইয়ের গালাগাল বা তাকে ছোট করে কথা বলা কখনই গায়ে মাখে না। আজও মাখল না। বরং জুঁইকে খুশি করার জন্য জিজ্ঞেস করল, তুমি এত খবর পাও কোথা থেকে? তুমি সত্যি জিনিয়াস!

জুঁই একটু ভাব নিয়ে বলল, আমি তো তোমার মতো ভেড়া প্রজাতির না। আমার চোখ কান খোলা আছে। তুমি তোমার বোন আসলে কিন্তু এ কথাগুলো জিজ্ঞেস করবে।

নাবিদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, আচ্ছা। (ক্রমশ)

মহিবুল আলম: গোল্ড কোস্ট, কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া। ইমেইল: <[email protected]>