শ্রাবণধারা
অরণি
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ গলা সাধল,
গলা সাধতে গিয়ে বুঝতে পারল আজকাল সুর ও লয়ের খেলাটা তেমন জমছে না।
প্রিয় ফুল গাছে জল দিচ্ছে আর ভাবছে জীবনের যদি ছন্দপতন হয়, তবে গানের হওয়াটা কি অস্বাভাবিক?
এমন সময় ফোন বেজে উঠল।
ওপাশ থেকে অরিত্রের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
অরণি: কী ব্যাপার বল তো, এত সকালে তোমার ফোন? তুমি তো ভোরের পাখি নও।
অরিত্র: আমার মনটা ভীষণ খারাপ
অরণি: কেন, কেন?
অরিত্র: দেখেছ, সকালটা কী ঝাঁজাল সুন্দর?
অরণি: হুমম, ঝাঁজাল না, বলো নির্মল সুন্দর। তার জন্য মন তো ভালো হবে, খারাপ কেন?
অরিত্র: যে সুন্দরকে নিজের করে পাওয়া যায় না, সে সুন্দর ঝাঁজাল হোক আর নির্মল হোক, সে সুন্দর যে আমায় পোড়ায়।
তা তুমি বুঝবে না বালিকা।
অরণি: আচ্ছা, বুঝে আমার কাজ নেই। এখন আমার কী করতে হবে, সেটা বলো?
অরিত্র: আমার মন ভালো করার গুরু দায়িত্ব যে এখন তোমার হাতে, বালিকা।
অরণি: আচ্ছা বালক, বলো কী করতে হবে?
অরিত্র: আজকের সুন্দর সকালটা আমি আরেক সুন্দরের সাহচর্যে কাটাতে চাই। দেবে আমাকে খানিকটা সময়?
অরণি: আচ্ছা তা নাহয় দিলাম।
অরিত্র: আজ আমি তোমায় নিয়ে পুরো শহরে রিকশায় চড়ে ঘুরব।
অরণি: যাক বাবা বাঁচা গেল, আমি তো ভেবেছি তুমি বলবে আমায় নিয়ে বান্দরবান পালাবে। হা হা হা...
অরিত্র: দুষ্টুমি রাখো। আমার পরিকল্পনাটা শোনো। কিছু শর্ত দিচ্ছি, পালন করলে খুশি হব।
অরণি: আচ্ছা বলো।
অরিত্র: তুমি আমার দেওয়া নীল শাড়িটা পরবে আর চোখে দুটিতে কাজল পরবে।
তোমার কাজল পরা ডাগর চোখ দেখলেই আমার সেই ছোট্টবেলার স্বপ্নকন্যা অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তফার কথা মনে পড়ে।
আর তোমার এই চোখে যে কতবার আত্মসমর্পণ করেছি, তা তো তুমি জানোই না।
অরণি: ঠিক আছে, আত্মসমর্পণ করো যতবার ইচ্ছা, কিন্তু দয়া করে আত্মহত্যা কোরো না।
অরিত্র: তোমার চুল খোলা থাকবে আর তোমার প্রিয় Viktor & Rolf পারফিউমটা কিন্তু মাখাবে না।
অরণি: মানে কী? পারফিউম মাখাব না, চুল বাঁধব না?
অরিত্র: বলছি শোনো।
তোমাকে হাতটা একটু ধরতে দিয়ো।
তারপর রিকশা নিয়ে সোজা চলে যাব শাহবাগে। সেখানে কিনব রজনীগন্ধা ও বেলি ফুল।
বেলি তোমার হাতে আর রজনী গন্ধা তোমার চুলে পরাব। তোমার গন্ধ আর ফুলের গন্ধে আমিও দখিনা হওয়ার মতো মাতাল হব।
আর চলন্তি রিকশায় তোমার অবাধ্য খোলা চুল উড়ে এসে বারবার তোমার মুখে ওপরে পড়বে। তুমি অবাধ্য চুলকে কঠোর হাতে দমন করার ব্যর্থ চেষ্টা করবে। আর এই দৃশ্য আমি আর চোখে দেখব আর মিটিমিটি হাসব।
অরণি: হাসবে কেন?
অরিত্র: আহা, হাসব না তো কী করব? আমাকে কঠোর শাসনের মধ্যে রাখো, কিন্তু চুলকে? হা হা হা...
অরণি: এই যে তোমার কথা শুনতে শুনতে দেখো আকাশটা কেমন মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।
অরিত্র: হোক না অন্ধকার আসুক না বৃষ্টি, আমি নাহয় নীল শাড়ি পরা বালিকার হাত ধরে আজ কল্পনায় ভিজি।
দেবে কি তোমার হাতটা ধরতে? নাকি কষিয়ে চড় বসাবে গালে?
অরণি: হা হা হা। না না, চড় বসাব না।

আজ মনে হচ্ছে তোমার মনটা একটু বেশি রকমের খারাপ। তাই রোমান্টিক গল্পকে মলম হিসেবে ব্যবহার করছ বালক।
অরিত্র: আমি বের হচ্ছি, তুমি রেডি থাকো আর সঙ্গে গীতবিতানটা নিয়ো।
মাঝেমধ্যে কিছু প্রেম ও পূজা পর্যায়ের গানে ভাসাবে আমাকে। কী, পারবে না?
অরণি: পারব না কেন? পারব।
অরিত্র: তো যাও, রেডি হও, আমি আসছি।
বাংলা সিনেমার তারকাখচিত রঙিন ক্যানভাসে সেই দুরন্ত রঙিন রিকশা নিয়ে। তোমাকে তুলে নিতে হে বালিকা।
অরণি: অরিত্র, তুমি বোধ হয় ভুলেই গেছ যে আমাদের শহরে হওয়ায় ফুলের গন্ধে বা নারীর চুলের গন্ধে মাতাল হয় না। এখন চারদিকে চাপা কান্না ও ভয়েই আকাশ–বাতাস ভারী।
আর কোথায় তুমি ফুল পাবে? শাহবাগের সব ফুলের দোকানই তো এখন বন্ধ।
আর আমার হাত ধরার কথা বলছ?
আমার ভালোবাসা তোমাকে সংক্রমিত করেছে কিন্তু সংক্রমণ ব্যাধি যেন তোমাকে না ছোঁয়, তাই এখন আমার হাতটা ছোঁয়া যাবে না যে।
আর কী গান শোনাব বলো? আজকাল আমার সুরগুলোও বেসুরা সুরে ধ্রুপদি রাগ সাধছে, এতে সুরের কী দোষ বলো?
যেখানে জীবনেরই ছন্দ নেই, সেখানে গানের পতন তো হবেই।
এইরে দেখো, বৃষ্টি এসে গেল। তুমি কি শুনছ আমাকে?
অরিত্র: হুম শুনছি। কত দিন দেখি না তোমাকে বলো তো?
অরণি: বাইরে হাতটা বাড়াও, বৃষ্টির স্পর্শ নাও এবং আমাকে ভাবো।
তার সঙ্গে চলো, আমরা দুজনে প্রকৃতির কাছে ক্ষমা চাই।
অরিত্র: অরণি ওই গানটা ধরাণা ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক বেয়ে’।
অরণি: চোখ বন্ধ করে বৃষ্টিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে গানটা ধরল ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক বেয়ে...
অরিত্র: অরণি কাল সারা রাত ICU–তে কোভিড–১৯–এর রোগীর সেবা দিতে গিয়ে বারবার তোমার কথা মনে হচ্ছিল।
আমাদের একজন সহকর্মী মারা গেল কাল রাতে। যদি ফিরে আসি বিজয়ীর বেশে, তুমি কি তোমার হাতটা ধরতে দেবে অরণি?
নাকি কষিয়ে।...
অরণি: থামিয়ে দিয়ে বলল, আহা রে, শখ কত! আমার হাত ধরবে?
এই বালক, তুমি আমার হাত কী ধরবে! আমিই তো তোমার হাত ধরে সোজা বান্দরবান পালাব।
থোড়াই কেয়ার করি কে কী বলল?
অরিত্র: বালিকা আমার, তুমি শাড়ি–কাজল নিয়ে রেডি থাকো। আমি আমার কর্তব্য শেষ করে তোমার কাছে আসছি।
অরণি: প্রচণ্ড শক্ত ও শাসন করা মেয়েটা যেন প্রচণ্ড আবেগে, কষ্টে পুরোটাই গলে পড়ল।
শ্রাবণের ধারার প্রবাহিত হলো তার চোখ বেয়ে।