লাল ঝুঁটি

আম্মা বিছানার ধার থেকে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাসু, কয়টা বাজে দেখ তো?’ ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল আঁচড়াতে এসেছিলাম। কাল সারা রাত বাড়িতে কেউ দু চোখের পাতা এক করেনি। বকা দিয়ে শুতে পাঠানো হয়েছিল আমাদের তিন ভাইবোনকে। ছোটটি সবে পাঁচ পেরিয়েছে। সে আব্বা-আম্মার ঘরেই ঘুমায়। ঘুমাতে গেলেও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে রাত পার হয়ে গেছে।

চোখ লেগেছিল ফজরের আজানের একটু আগে। ঘণ্টা দেড়েক পর ঘুম ভেঙে যেতে তাড়াহুড়ো করে মুখ ধুয়ে চলে এসেছি আম্মা-আব্বার ঘরে। আম্মার কথা শুনে খুব স্বাভাবিকভাবে পাশের পড়ার টেবিলে রাখা ঘড়ির দিকে তাকালাম। ‘ছয়টা পাঁচ, আম্মা’, বলতে গিয়ে আমার বারো বছর বয়সের মাথাটা ঘুরে উঠল। ‘ছয়টা...’, বলার পর বাকিটা গলায় জড়িয়ে গেল। চিরুনি হাতে আমি ছুটে গেলাম বিছানার পাশে। আম্মা একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আব্বার গলা পর্যন্ত ঢাকা গায়ের চাদর টেনে তার মাথাটি ঢেকে দিলেন। বললেন, ‘সবাইকে ঘুম থেকে উঠে এই ঘরে আসতে বল।’ আমি হতবুদ্ধি হয়ে আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। তারপর গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলাম।

এপ্রিল মাসের শেষ। বৈশাখী ঝড় প্রায় প্রতিদিন তেড়েফুঁড়ে আসে। কাল সন্ধ্যায়ও এসে মাঝরাতে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় সঙ্গে করে আনা অঝোর বৃষ্টি রেখে গেছে। ঝরঝর বৃষ্টির ঘন পর্দার আড়ালে দুটি মানুষ মাটি খুঁড়ে একটা ছোট আয়তাকার গর্ত বানিয়েছে। কাঁধে করে লাশ নিয়ে এসেছি আমরা কয়েকজন বাড়ির লোক, আর গুটিকয়েক প্রতিবেশী। মসজিদে জোহরের নামাজে নামাজি মাত্র তিনজন। পাকিস্তান আর্মি আশপাশে টহল দেয়। তাই নামাজ পড়তে আসতেও লোকজন ভয় পায়। মার্চের ২৫ তারিখ রাতে আর্মি নামার খবর আসতেই ইমাম সাহেব বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। তিনি আর আসেননি। মুয়াজ্জিন সাহেব মসজিদেই থাকেন। জানাজা পড়ালেন তিনিই।

সারা গা, হাত-পা কাদায় মাখামাখি করে যখন বাড়িতে এলাম, দেখলাম, ঘরের বাইরে বারান্দার সিঁড়িতে আম্মা বসা। তাঁকে ঘিরে চারপাশে বসে আছেন দাদি, বড় চাচি, আর আমার দুই বোন। যুদ্ধকালে শহর ছেড়ে যে বাড়ির আশ্রিত আমরা, সেটার গৃহকর্ত্রী বসে আছেন একটু দূরে একটি মোড়ায়। তাঁর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন সে বাড়ির অন্য মহিলারা। বারান্দার ধার ছাড়িয়ে টিনের চালের ছাউনিটি এগিয়ে গেছে বেশ সামনে। সরাসরি বৃষ্টির পানি মাথায় না পড়লেও ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটা শরীর ভিজিয়ে দিয়েছে সবার। সেটা নিয়ে কেউ কোনো ভ্রুক্ষেপ করছে না।

আঙিনায় ঢোকার পথ থেকে সবাইকে অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল। খানিক এগিয়ে কাছাকাছি হতে দেখলাম, আম্মার সারাটা মুখ ভেজা। গাল বেয়ে থুতনিতে পৌঁছে সেগুলো ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়ছে। কতটুকু তাঁর আকাশ থেকে নেমেছে, আর কতটুকু বুকের ভেতর থেকে উঠে আসছে, তা বোঝার মতো বোধ আমার তখনো পুরোপুরি আসেনি। খুব মনোযোগ দিয়ে তখন সেটা দেখেছি কিনা মনেও করতে পারছি না। আম্মার গায়ে সকাল বেলায়ও যে রঙিন শাড়িটি জড়ানো ছিল, তা আর নেই। সেখানে উঠেছে চিকন কালো পাড়ের একটি ধবধবে সাদা শাড়ি। প্রাথমিক ধাক্কাটা চলে যাওয়ার পর থেকে আমার আর কোনো কষ্ট হচ্ছিল না। অন্য কিছু হচ্ছিল কিনা, জানি না। আসলে আমার মধ্যে কোনো অনুভূতিই কাজ করছিল না।

বাড়ির বারান্দার জটলাটি দেখে কেন যেন আমার ইন্দ্রিয়গুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। উঠোনজুড়ে গোছা গোছা দোলনচাঁপা ফুটে রয়েছে। চারপাশের ঘিরে থাকা রঙিন পোশাকের পটভূমিতে সাদা শুভ্র শাড়ির আম্মাকে মনে হচ্ছে তেমনই একটি ফুল। আম্মা রূপবতী মহিলা। সেই মুহূর্তে তাঁকে যেন আরও অপূর্ব লাগছিল। অথচ দৃশ্যটি দেখে আমার গা জ্বালা করে উঠল। আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠতে চাইলাম। রাগে দুঃখে সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। কিন্তু গলা দিয়ে টু শব্দটি বেরোল না। সবচেয়ে কাছাকাছি হাঁটছিলেন মেজো চাচা। আমার পরিবর্তনটি তাঁর নজর এড়াল না। তিনি আমাকে টেনে কাছে আনতে চাইলেন। আমি জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে ভেতর বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলাম। আমাকে আটকানোর জন্য মনে হয় কেউ এগোতে চাইছিলেন। আশ্রয়দাতা গোফরান সাহেবের সঙ্গে কাছারি ঘরের বারান্দায় বসেছিলেন দাদু। তাঁকে গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুনলাম, ‘থাক, ওকে যেতে দাও।’

গোফরান সাহেব গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থ। বাড়ির ভেতর দিকটায় একটি চৌকোন উঠোনের চারদিক ঘিরে একই রকম নকশার পাঁচটি আলাদা আলাদা ঘর। আমার থাকার জায়গা হয়েছিল দুই চাচার সঙ্গে। পেছন দিকটার তেমন একটিতে। উঠোন থেকে ঘরগুলোতে ঢুকতে হলে প্রথমে উঠতে হয় একচিলতে একটি বারান্দায়। সেটার অন্যপাশে দরজা। ঘরের সামনে, পেছনে লোহার শিক বসানো এক জোড়া করে কাঠের পাল্লার জানালা। সামনের দরজার সরাসরি ঘরের পেছনের দেয়ালে আরেকটি দরজা। সেটা খুলে বেরোলে প্রথমেই খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তারপর একটি পুকুর। পুকুরের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি জারুল গাছ। এই গ্রামে আমি কাউকে চিনি না। সমবয়সী ছেলেপেলেরা সামনে পড়লে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়। পড়ার মতো কোনো বই সঙ্গে আনার সুযোগ হয়নি। বন্ধুবিহীন সময় কাটাতে আমি বেশির ভাগ সময় পুকুরের পাড়ে বসে থাকি; একা একা।

এমন সময় হঠাৎ করে এক বন্ধু জুটে গেল। ঘরে সবচেয়ে কাছের গাছটিতে এসে আস্তানা গেড়েছে এক অদ্ভুত পাখি। এমন রংচঙে পাখি আমি আগে কখনো দেখিনি। পাখিটির পিঠে নীল পালক। হালকা হলুদ আভা গালের দুপাশে। মাথার ওপরে লাল ঝুঁটি, বেগুনি আর কমলা রঙের ঝোলানো লম্বা লেজ। প্রথম যেদিন দেখলাম, আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এটা কি কাকাতুয়া? নাহ, বইয়ে যে কাকাতুয়ার ছবি দেখেছি, এটা সে রকম কিছু নয়। গাঁয়ের ছেলেগুলোর মতো সেও আমার দিকে একই রকম সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল। আমি ভাবলাম, কেউ যখন শুনতে পাচ্ছে না, না হোক এটা কাকাতুয়া, আমি ওকে লাল ঝুঁটি কাকাতুয়াই ডাকব। বললাম, ‘এই লাল ঝুঁটি, তুই আবার কোত্থেকে এলি?’ ঘাড়ের রোঁয়া ফুলিয়ে সে আমার দিকে চাইল। কোনো উত্তর দিল না। আমি তাতে দমে যাওয়ার পাত্র নই। কথা চালিয়েই যেতে থাকলাম। লাল ঝুঁটি কিছুক্ষণ শোনার পর বোধ হয় বিরক্ত হয়ে কয়েকবার পাখা ঝাপটালো। হয়তো বলল, ‘থামো।’ আমি কর্ণপাত না করায় ঝাঁপ দিয়ে সে ডানা মেলে আকাশের বুকে হারিয়ে গেল।

পরদিন পেছনের দরজা খুলে বাইরে এসে গাছটির দিকে তাকালাম। মাথার দিকের একটা ডালে বসে আছেন তিনি। পিছু ফিরে ঘরের ভেতর দিয়ে আমি ভেতরের উঠোনে চলে এলাম। বাঁশের চাটাইয়ের ওপর ধান শুকোতে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে একমুঠো ধান নিয়ে আবার পেছনের জারুল গাছটির কাছে এলাম। পাখিটির দিকে চোখ রেখে বললাম, ‘লাল ঝুঁটি, খিদে লেগেছে? এই নে।’ হাতের ধানগুলো ওর দিকে ছুড়ে দিলাম। যেখানে পাখিটি বসা, আমার হাতের জোরে সেখানে ধানগুলো পৌঁছানোর অনেক আগেই ঝরঝর করে মাটিতে নেমে এল। আমি ডাকলাম, ‘আয়, খা!’ পাখিটি বিরক্ত হয়ে ডানা ঝাপটালো। কিন্তু আগের দিনের মতো উড়ে চলে গেল না। কোত্থেকে একদল মুরগি ছুটে এসে তার ধানগুলো খুটে খুটে খেয়ে নিমেষে শেষ করে দিল। আমিও ছাড়ার পাত্র নই। লাল ঝুঁটির জন্য মেনু বদলে দিলাম। নানির কাছ থেকে পরদিন একমুঠো ভাত চেয়ে আনলাম। কিন্তু সেদিনও সুবিধা হলো না। হলো চতুর্থ দিনে; অবশেষে তিনি বশ মানলেন। ভাত ছড়িয়ে অনেক ডাকাডাকির পরও যখন গাছ থেকে নামলেন না, মুরগিগুলোকে তাড়ানো বাদ দিয়ে আমি পুকুর ঘাটের দিকে রওনা দিয়েছি, পেছন থেকে হালকা ধপ শব্দ হলো, দেখি তিনি নেমে এসেছেন। একটা দূরত্ব বজায় রেখে আমি চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলাম। এই ঘটনাটি ঘটেছিল আট দিন আগে। এর পর থেকে রোজ সকাল এগারোটার দিকে কেবল রান্না হওয়া ভাতের হাঁড়ি থেকে একমুঠো ভাত কচুর পাতায় নিয়ে, ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে এনে গাছতলায় ছড়িয়ে দিই। লাল ঝুঁটি নিচে নেমে আসে। তারপর ভাতগুলো খুঁটে খুঁটে খায়। ইদানীং একদম কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেও আমাকে আর ভয় পায় না।

কবরে নেমেছিলাম বলে আমার সারা গা, মাথা, হাত, পায়ে কাদা মাখা। টপটপ করে পানি পড়ছে চুল বেয়ে। কবরযাত্রীদের থেকে সরে ছুটতে ছুটতে এসে থাকার ঘরটায় ঢুকলাম। কিন্তু ভেতরে থাকলাম না। পেছনের দরজা খুলে আবার বৃষ্টিতে বেরিয়ে পড়লাম। জারুল গাছটির মাথায় তাকিয়ে দেখলাম, পাতার আড়ালে মাথা গুঁজে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে লাল ঝুঁটি। আমার সাড়া পেয়ে মনে হয় মুখ বের করে আনল। ভাব দেখে মনে হলো জানতে চাইছে, আজ সকালে তার ভাত কেন আসেনি? আমি ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, ‘তুই জানিস না?’ লাল ঝুঁটির কোনো ভাব পরিবর্তন হলো না। আমার দিকে সে জুলজুল করে চেয়েই রইল। আমি বললাম, ‘কেন এমন হলো, বলত?’ লাল ঝুঁটি নির্বিকার। আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘কথা বলছিস না কেন? বল, এমন কেন হলো? বল!’ লাল ঝুঁটি পাখা ঝাপটে উঠল। তারপর আবার মাথা গুঁজে দিল গাছের পাতার আড়ালে। আমার ভেতরটা রাগে পুড়ে যাচ্ছে। আমি জানতে চাইছি, ‘কেন, আর তুই উত্তর না দিয়ে সরে গেলি। শয়তান, দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি।’ আশপাশ থেকে কয়েকটি মাটির ঢেলা কুড়িয়ে আনলাম। তারপর একের পর এক ছুড়তে থাকলাম লাল ঝুঁটির দিকে। কাল রাতের পর থেকে আর কিছু খাওয়া হয়নি। সারা দিনের অবসাদে শরীর ভেঙে পড়তে চাইছে। সেটা ছাড়াও অল্প বয়সী শরীরে তখনো অত দূর ঢিল পৌঁছানোর শক্তি আসেনি। অতএব নিউটনের সূত্র মেনে তার সব কটি আমার মাথা, আর শরীরে নেমে এল।

অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। সদ্য পিতৃহারা একটি বালক তাতে ভিজছে, আর আকাশপানে অবিরাম ঢিল ছুড়ে যাচ্ছে। এমন একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে যে কারওরই আঁতকে ওঠার কথা। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে যে মানুষটি সেটা করলেন তিনি আমার সেজো চাচা। দাদু নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি মনে হয় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। আমার খোঁজ না করে থাকতে পারেননি। শুনলাম তিনি বলছেন, ‘হাসু, এই হাসু, হচ্ছেটা কী? কাকে ঢিল ছুড়ছিস? ঘরে আয়, অমন করে বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বরটর হয়ে যাবে।‘ জ্বর মনে হয় আমার চলেই এসেছে। চোখ জ্বালা করছে। আমি একরকম ঘোরের মধ্যে বললাম, ‘সেজো চাচা, তোমার বন্দুকটা কোথায়?’ বন্দুক মানে হচ্ছে, এয়ার গান। সেজো চাচার খুব প্রিয় জিনিস। যুদ্ধের এই ডামাডোলে এসব নিয়ে ঘোরাফেরা খুবই বিপজ্জনক। তবু এটা বাড়ি ছেড়ে আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। তিনি বললেন, ‘আছে, কেন?’

-এখানে একটা পাখি আছে। এটাকে মারতে হবে।

-এই বৃষ্টির মধ্যে? বৃষ্টি থামুক। তারপর আমি মেরে দেব।

-বৃষ্টি থামা পর্যন্ত পাখিটি কি গুলি খাওয়ার জন্য বসে থাকবে?

আমি গোঁয়ারের মতো বলে বসলাম। চাচার সঙ্গে আমার বয়েসের যে ব্যবধান, তাতে তাঁর সঙ্গে ওই ভঙ্গিতে আমি কখনো কথা বলি না। তিনি আমার দিকে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘এখন গোলাগুলি করা ঠিক হবে না রে। শব্দ পেয়ে আর্মি এসে পড়লে মহা বিপদ হয়ে যাবে।’

-ঠিক আছে যাও, লাগবে না। আমিই ঢিল দিয়েই এটাকে মারব।

চাচা চলে গেলেন। কয়েক মিনিট পর বৃষ্টির ভেতরেই বন্দুক নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন, ‘কোথায় তোর পাখি?’

‘আমার পাখি কেন হতে যাবে? এটা আমার পাখি না।’ আমি রাগী রাগী গলায় উত্তর দিলাম, ‘ওই যে দেখ গাছের মাথায়, পাতার ফাঁক দিয়ে লেজ বেরিয়ে আছে।’

চাচা ছাতা একপাশে হেলিয়ে বন্দুক তুললেন। গুলি ছোড়ার শব্দটি বৃষ্টির তোড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগেই ঝপ করে আরেকটি শব্দ হলো। রঙিন দুভাঁজ ঘুড়ির মতো দেখতে বিশাল পাখিটির প্রাণহীন শরীরটি আমাদের সামনে এসে পড়ল।

আমার শরীর পাথর হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠলাম, ‘চাচা, তুমি এটা কী করলে? পাখিটিকে গুলি করে মেরে ফেললে?’

চাচার চোখে একই সঙ্গে হয়তো বিস্ময় আর রাগ ফুটে উঠেছিল। আমি সেটা দেখার আগেই আবার স্নিগ্ধ সজল হয়ে গেল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন, ‘কী আশ্চর্য, তুই বললি বলেই না আমি গুলি করলাম। বাবা জানলে আমাকে বকে শেষ করে দেবে।’

-আমি বলিনি। আমি বলিনি। তুমি শুধু শুধু আমার পাখিটিকে কেন গুলি করে মেরে ফেললে?’

চাচা ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আমাকে বুকে টেনে নিতে নিতে বললেন, ‘ভুল হয়ে গেছে রে হাসু। পাখিটিকে মারা একদমই উচিত হয়নি।’

আমি সেজো চাচাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। সকাল ছয়টা দশ মিনিটে কেঁদেছিলাম। ঠিক আট ঘণ্টা পর, আমি ফের চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। পাখিটির দিকে তাকাতে দেখলাম, চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন অবাক চোখে জানতে চাইছে, ‘কেন?’