লকডাউনে প্রেম
ডেভিড: হাই বিউটিফুল। কেমন আছ?
নোরা: হাই। ভালো আছি। তুমি?
ডেভিড: আমি ভালো। তবে তোমাকে খুব মিস করছি। জান, আই লাভ ইউ। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
নোরা: এখন তো এ অবস্থায় দেখা করা যাবে না।
ডেভিড: হ্যাঁ, আমি জানি। আমি কী তোমার বাসার সামনে একবার আসতে পারি? তুমি দূরে দাঁড়াবে। একবার আমাকে দেখা দেবে?
নোরা: না ডেভিড। তুমি জানো না এখন বাইরের অবস্থা কতটা বিপজ্জনক? কত মানুষ মারা যাচ্ছে? ডোন্ট বি সিলি, খবরদার তুমি আসবে না।
ডেভিড: আচ্ছা আসব না। জানি তো কিন্তু! তাহলে আমি কী ভিডিও কল দিতে পারি?
নোরা: হ্যাঁ, দাও।
নোরা ফোন রিসিভ করে। সে খুব অগোছালো হয়ে আছে। উসকোখুসকো চুল। দুজনেই দু পাশ থেকে হাসে। দুজন চুমু বিনিময় করে।
ডেভিড: তুমি কি সুন্দর সুইটহার্ট!
নোরা: না, তুমি বেশি সুন্দর। তুমি কোথায় যাচ্ছ? তোমাকে না বলছি বাড়ি থেকে বের হবে না?
ডেভিড: না জান, আমি এমনিতেই গাড়িতে বসে আছি। কোথাও যাচ্ছি না। আমার আর ঘরে ভালো লাগছে না।
নোরা : ওহ আচ্ছা। তুমি একদম বাচ্চাদের মতো ডেভিড। কী প্রয়োজন ঘর থেকে বের হওয়ার? বাতাসেও জীবাণু থাকতে পারে। কিন্তু মনে রেখো, যদি কোথাও যাও খুব খারাপ হবে। আমি তোমার সাথে কখনো কথা বলব না।
ডেভিড: না, যাব না। কিন্তু আমি তোমাকে মিস করছি।
নোরা: আমিও। তোমার মা–বাবা কেমন আছেন?
ডেভিড: ভালো।
নোরা: ওকে। তাঁদের খেয়াল রাখবে। সাবধান কিন্তু, তুমি তাঁদের কথা মনে রেখে ঘর থেকে বের হবে না।
ডেভিড: আচ্ছা। লাভ ইউ জান।
নোরা: লাভ ইউ টু।
ডেভিড, খুব সুন্দর। ঠোঁট দুটো গোলাপী। ফর্সা, মধ্যম উচ্চতার মানুষ। চেহারার মাঝে কী একটা শিশুসুলভ বা দেবসুলভ নির্মলতা আছে। এটাই নোরাকে টানে। সে স্পস্ট ইংরেজিতে কথা বলে। ম্যাসেজও ইংরেজিতে। কিন্তু আফগানিস্তানের ছেলে। যদিও এদের সে পছন্দ করে না। যদিও ডেভিড নিজে নিজেকে আমেরিকান ভাবতে পছন্দ করে। তাঁর দাউদ এহমেদ নামটা কাউকে বলে না। তাঁকে খুব রহস্যময় যুবক মনে হয়। প্রায়ই নোরা ভাবত টেরোরিস্ট নয় তো? সে জানে ওদের দেশে টেরোরিস্ট জন্মায়। ভয় হতো, এর সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু এসব সন্দেহ বলা যায় না। জিজ্ঞেস করা খুব অপমানজনক ।
তবে সে আমেরিকান আর্মিতে ছিল দীর্ঘ দিন। কিন্তু তার ভালো লাগে না। তাই সরে এসেছে। ছবিও দেখিয়েছে নোরাকে। ডেভিড পাখি ভালোবাসে। তার কাঁধে বসা এক পোষা ঈগলের ছবি পাঠিয়েছিল। ফেসবুকে সে দেখেছে, আফগান পার্লামেন্টের চেয়ারে সে বসা, যেখানে সে মধ্যমণি। সব মিলিয়ে তাকে ভয়ংকর মনে হয়। সে বলেছিল ইউএস গভর্নমেন্ট থেকে তার পুরো পরিবারকে ইমিগ্রান্ট ভিসা দিয়ে এখানে আনা হয়েছে। অন্য এক ছবিতে তাকে হজ করতে দেখা গেছে। সাদা কিছু একটা পরা, কিন্তু বুক খোলা সুঠাম দেহ। ফর্সা বুক কালো লোমে ঢাকা। এ ছবি দেখে নোরা খুব হেসেছিল। তার ডেভিডকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। ডেভিড তাকে বুঝিয়েছিল এটা একটা ধর্মীয় নীতি। কী অদ্ভুত সব ধর্ম। নোরার এসব ভাবলে দমবন্ধ লাগে। সে সোজাসাপ্টা মানুষ। কিন্তু ডেভিডকে তার খারাপ লাগে না।
ডেভিডের সঙ্গে আজ থেকে এক বছর আগে পরিচিয়। এপ্রিলের ১১ তারিখে একটা অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে একসঙ্গে সে আর নোরা স্টারবাকসে বসে কফি খেয়েছিল। দুজনই একটা চার্চে গিয়েছিল এক ফিউনারেল অনুষ্ঠানে। নোরা উবার কল করলেও বারবার বাতিল হচ্ছে অতিরিক্ত জ্যাম আর ব্যস্ত মুহূর্তর জন্য। তখন ডেভিড তার গাড়ির জন্য যাচ্ছিল পার্কিং লটে। তাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাহায্য করতে চেয়েছে। সেই থেকে পরিচয়। তবে সে পরিচয় শুধু খুব দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে টেক্সট ম্যাসেজে বিদ্যমান। যার শুরুতেই হাই–হ্যালোর পরেই থাকে সে নোরাকে মিস করছে। নোরার জীবনে তার সত্যিকারের প্রেমিকও কখনো এতবার মিস করেছে কি না জানে না। নোরা ভাবত হয়তো ফ্লার্ট করে ওর সঙ্গে। সুন্দর ছেলেদের কাজই হচ্ছে মেয়েদের কোনোভাবে পটিয়ে ফেলা। তাই সে তেমন পাত্তা দেয় না।
কিন্তু যখনই ভিডিও কলে ওর শিশুর মতো মুখটা দেখে, মনে হয় সত্য সেখানে ঝলমল করছে। এক ঝাঁক ঘন কালো চুল মাথায়। ফর্সা গালে নিলাভ শেভ করা বা না করা চেহারা দুটোই কেমন নির্মল! তাই মাঝেমধ্যে মনে হয় সেও প্রেমে পড়ে যায়। পথের পরিচয় পথেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু শেষ আর হয় না। মাস, দু মাস পর হলেও ডেভিড তার খোঁজ করে। তার খোঁজ করার ধরন দেখে মনে হয় না কোনো সময়ের ব্যবধান ছিল। মনে হয় কত চেনা, কত আপন। নোরা নিজে খুব কম যোগাযোগ করেছে। একবার শুধু তার বাবা হাসপাতালে ছিলেন, তখন সে খোঁজ নিয়েছে।
লকডাউনের পর থেকে ডেভিড প্রতিদিন একবার হলেও খোঁজ নেয়। ম্যাসেজের জবাব না দিলেও মাঝেমধ্যেই তার ‘আই লাভ ইউ’ বার্তা জারি আছে। এ জীবনে এতবার কেউ ‘আই লাভ ইউ’ বলতে পারে? সে একদিন সিরিয়াস ম্যাসেজ করেছে। ‘যদি কখনো দেখা না হয়? আই অ্যাম মিসিং ইউ জান!’ কত জীবন ডেভিড মিস করবে তাকে? এক জীবন, দু জীবন! নাকি শত শত জীবন! ভালোবাসা কি শূন্যে মিলায় অপার সমুদ্রের মতন। নোরা বসে থাকে ঈস্ট রিভারের পারের সুউচ্চ ভবনের এক বেলকনিতে। তার অ্যাপার্টমেন্ট ডাউনটাউন ব্রডওয়েতে। তার বাসাটা আকাশের কাছাকাছি। মনে হয়, হাত বাড়ালেই সে ছুঁয়ে দেবে এ আকাশ। ডেভিড বলেছিল ব্রুকলিনে কোথাও থাকে।
ঈস্ট রিভারের ওপারে গেলে ডেভিডের বাড়ি। নোরার রুম থেকে ব্রিজ দেখা যায়। নীরব নিথর খুব অল্প মানুষ আজকাল আসছে। তার মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় ছুটে যেতে ব্রিজের ওপর দিয়ে। শুভ্র বরফের মতো গাউন তার পরণে। সামনে থেকে গাউনের বিশাল বহর সে দু হাতে একটু তুলে রেখেছে । দীর্ঘ সাদা অংশ পেছনে ছুঁয়ে চলেছে পথের সবকিছু। সেদিকে একটুও ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সে ছুটছে ব্রিজের ওপর দিয়ে। তার মনে হচ্ছে, ব্রিজ পাড়ি দিলেই সে ডেভিডকে পেয়ে যাবে। সে কি ডেভিডকে ফোন করে বলবে, ‘তুমি আসো?’ না এখন তো বলা যাবে না। তাকে অপেক্ষা করতে হবে। সে বাতাসে মিলিয়ে দেয় বহু ‘আই লাভ ইউ’, ‘আই মিস ইউ’। নোরা গান শুনছে। এড শ্যারনের গান—
‘I found a love for me
Darling just dive right in
And follow my lead
Well I found a girl beautiful and sweet
I never knew you were the someone waiting for me
‘Cause we were just kids when we fell in love’
নোরার মাঝেমধ্যে মনে হয়, সে ডেভিডকে বহু বছর আগে থেকে চিনত। সত্যি কী ও শিশুকালে ওর প্রেমে পড়েছে? কোথাও মিলেছে? কিন্তু সে রকম তো হওয়ার কথা নয়। সে আরেক ক্যারেবিয়ান নগরীতে জন্মেছে। এ কী করে সম্ভব? সম্ভব হোক, আর না হোক এ জন্মে হোক, আর না হোক, কোনো জন্মে নোরা সত্যি ডেভিডের হবে। সে অপেক্ষা করবে। যদি বেঁচে যায়, তবু করবে। যদি মরে যায় তবু করবে। নোরা জানে, সে আবার আসবে এ পৃথিবীতে।