লকডাউনে ঘরে বসে ব্যবসা

ঘরে বসে উপার্জন করে সফল মানুষ সাদিয়া আখন্দ ও লুৎফুন নাহার

করোনার সময় সবার জন্য বাইরে বের হওয়া বেশ বিপদজনক। বিশেষ করে নারীদের জন্য যেন আরও বেশি। একজন কর্মজীবী নারীকে বাইরের কাজ সামলে ঘরের বাচ্চা থেকে শুরু করে পরিবারের বড়দের দেখাশোনা করতে হয়। করোনার এই দুর্যোগকালে আপনি চাইলে ঘরে বসেই আয় করে স্বামীকে সহায়তা করতে পারেন। আমাদের অনেকের হয়তো জানা নেই, ঘরে বসে কম পুঁজিতে কী নিয়ে কাজ করে সহজে আয় করা যায়। সে জন্য এখানে লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসে কাজ করে সফল হয়েছেন, এখানে এমন কয়েকজনের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

ঘরে থেকে ব্যবসার আইডিয়াগুলো যথেষ্ট লাভজনক, শুরুতে আপনার অল্প কিছু বিনিয়োগ করতে হবে। শুরুতে ততটা লাভ না হলেও ঘরে থেকেই লাভজনক ব্যবসা শুরু করা সত্যিই সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, উদ্ভাবনী, সৃজনশীলশক্তি আর অধ্যবসায়। অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে হলে প্রথমেই ঠিক করে নিতে হবে আপনার আগ্রহ ও দক্ষতার ক্ষেত্র। যেহেতু ঘরে বসে ব্যবসায় বিনিয়োগ কম, তাই শুরুতেই বাস্তবে আপনি বিক্রি করবেন আপনার দক্ষতা আর শ্রম। আর তাই ব্যবসার ক্ষেত্রটিতে আপনার যথেষ্ট দক্ষতা না থাকলে লাভজনক ব্যবসা করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশিই বিষয়টি সম্পর্কে আপনার আগ্রহ থাকা জরুরি। জেনে নিন, এমন কয়েকটি বিজনেস আইডিয়া যা নারীরা শুরু করতে পারেন কম পুঁজিতে। আপনার দক্ষতা ও আগ্রহের ভিত্তিতে ঠিক করুন, কী করতে চান।

অনলাইনে আপনার পছন্দের বিষয়টি শিখিয়ে ঘরে বসেই ভালো রকমের আয় করা সম্ভব। যেমন হতে পারে পেইন্টিং, নাচ, গান, পড়াশোনা, বাদ্যযন্ত্র বা ভাষা শিক্ষা। আপনার দক্ষতা ও আগ্রহের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে নিতে পারেন। নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলে বিনা বিনিয়োগেই আয় করতে পারেন। আজকাল অনেকেই তাদের রান্নার ভিডিওসহ দৈনন্দিনের অনেক কাজকর্মের ভিডিও করে ইউটিউবে আপলোড করে। প্রিয়া ডায়েস করোনার সময় ২০টি বাচ্চাকে অনলাইনে নাচ শেখাচ্ছেন। আপনি চাইলে আবৃত্তি, গান বিভিন্ন জিনিস শেখাতে পারেন।

খাবারের হোম ডেলিভারি করে কুইন্সের অনেক নারী ঘরে বসে আয় করছেন। এদেরই একজন সামিয়া স্বর্ণা। তিন বছর হলো এ দেশে এসেছেন। ছেলেমেয়েরা কলেজে পড়ে। করোনার তারণে কাজ জোগাড় করতে পারছে না। বাসা থেকে বের হচ্ছিল। ফেসবুকে একদিন একটা গ্রুপে চোখ পড়ল, যেখানে বাসার তৈরি খাবার অর্ডার নেওয়া হচ্ছে। আইডিয়াটা সামিয়ার পছন্দ হলো। আজকের কর্মব্যস্ত যুগে বাড়িতে রোজ রান্না করার সুযোগ হয় না অনেকের, আবার অনেকে প্রতিদিন হোটেলের খাবারও খেতে চান না। সামিয়া অল্প অল্প অর্ডার নিয়ে বাড়িতে রান্না করে মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিতে শুরু করলেন। এভাবে একদিন নিজেই শুরু করে দিলেন নিজের ক্যাটারিংয়ের কাজ।

কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এই ব্যবসার সুযোগ বেশি। শহরের বাইরে থেকে পড়তে আসা ছাত্র–ছাত্রীরা অনেকেই রোজকার রান্না করতে চায় না, সে ক্ষেত্রে তাঁরা নির্ভর করেন হোম ডেলিভারির ওপর। এ ছাড়া অনেক ছোট পরিবারও রোজকার খাবারের জন্য হোম ডেলিভারির খাবারের ওপরই নির্ভর করেন। নুসরাত জাহান লং আইল্যান্ড থাকেন। রকমারি কেক, কুকিজ বানাতে ভালোবাসেন, আত্মীয়-বন্ধুদের জন্মদিন-অ্যানিভার্সারিতে নুসরাতের বানানো কেকের কদর আছে। তাহলে ওভেন-ফ্রেশ বেকারি আইটেমের চাহিদা প্রচুর, আর তা যদি একেবারে ক্রেতার ঘরে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই। নিত্য–নতুন রেসিপি করে তিনি তৈরি ভোক্তাদের কাছে আলাদা বিশেষত্ব অর্জন করেছেন।

মিনি রহমান থাকেন স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে। তিনি কাস্টমাইজড গয়না তৈরি করেন। নতুন ধরনের গয়না তৈরি করেন, অভিনবত্ব আনেন গয়নার ডিজাইন, স্টাইল আর উপকরণে। এ ধরনের গয়না তৈরির উপকরণ সহজেই অনলাইনে পাওয়া যায়। পছন্দ মতো উপকরণ সংগ্রহ করে বাড়িতে বসে সহজেই তিনি গয়না বানান। অনলাইনে নিজের একটা পেজ করে সেগুলি বিক্রি করছেন। ভালোই সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান। বাংলাদেশে বাসার কাছেই দরজির দোকান পাওয়া যতটা সহজ, এখানে পাওয়া ততটাই কঠিন।

অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করতে চাইলে নারীরা ভাবতে পারেন দরজির দোকানের কথা। তবে এ ক্ষেত্রে আপনার অবশ্যই থাকতে হবে উপযুক্ত দক্ষতা ও সৃজনশীলতা। নিজের বাড়ি থেকেও এই ব্যবসা করতে পারেন। ক্রেতার বাড়ি না গিয়ে ও ফোনে ফেইস টাইম করে ডিজাইন আর মাপ নিয়ে বাড়িতে বসে বানিয়ে সহজেই আয় করতে পারেন।

এখন নেটের দুনিয়া। অনলাইনে বহু নতুন অভিনব ডিজাইন পাওয়া যায়, সেখান থেকে নিজের পছন্দ মতো ক্যাটালগ তৈরি করে নিতে পারেন। যেমন টেক্সাসে বাস করে লুৎফুর নাহার (রুবি)। বছর কয়েক হলো টেক্সাসে এসেছেন। স্বামী, মেয়ে, সবাই যখন কাজে চলে যায়, তার সময় কাটাতে কঠিন হতো। তার জন্মদিনে মেয়ে তাকে একটা সেলাই মেশিন কিনে দেন। শুরুটা ছিল বাসার কিছু দরকারি জিনিস সেলাই করা বা নিজের আর মেয়ের জামা অল্টার করা। অল্টারের কাজ উনি করতে পারেন শুনে অনেকেই তাকে অল্টার করতে দেন, সেই সঙ্গে পারিশ্রমিক। দুজন চারজন করে অনেকেই আসতে শুরু করে। লুৎফুর নাহার এখন মেয়েদের সালোয়ার কামিজ, বাচ্চাদের জামা–ব্লাউজ সবকিছুই সেলাই করছেন।

চাইলে আপনি বিউটিশিয়ানের কাজও করতে পারেন, যদি উপযুক্ত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ থাকে। অল্প পুঁজিতে এই ব্যবসা করা সম্ভব। ব্রঙ্কসের অলকা নন্দী প্রথমেই কিনে ফেলেছিলেন প্রাথমিক পরিষেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ। এখন তার বাড়িতেই কাস্টমার আসেন। ঘরে বসে ফেসিয়াল, পেডিকিওর, ম্যানিকিওর, ওয়েল ম্যাসাজ বা ওয়্যাক্সিংয়ের মতো সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।