রবার্ট ফ্রস্ট: জীবন ও কাব্যবোধ
রবার্ট ফ্রস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য কবি। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর সৃষ্টির স্বাক্ষর রয়েছে। ১৮৭৪ সালের ২৬ শে মে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো শহরে ফ্রস্টের জন্ম। বাবা উইলিয়াম ফ্রস্ট ছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং একজন নিবেদিত প্রাণ ডেমোক্র্যাট।
রবার্ট ফ্রস্ট ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান। বাবার মৃত্যুর পর মা স্কুলশিক্ষকের চাকরি নিয়ে সংসারের হাল ধরেন। আর্থিক টানাপোড়েনের একপর্যায়ে পুত্রকে নিয়ে ম্যাসাচুসেটসের শ্বশুর বাড়ি অর্থাৎ রবার্ট-এর দাদার বাড়িতে চলে যান। দাদা উইলিয়াম প্রেস্কট ফ্রস্ট তাঁর আদরের নাতিকে ভালো স্কুলে পড়াশোনা করবার সুযোগ করে দেন। ১৮৯২ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে হাইস্কুল পাশ করেন।
কলেজজীবনে পা দেওয়ার পর থেকেই রবার্ট ফ্রস্ট লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরি করেন। জীবনের প্রয়োজনে তাঁকে অনেক নিম্নশ্রেণির কাজও করতে হয়েছে। মুচি, কাঠমিস্ত্রি এবং টেক্সটাইল মিলে সাধারণ শ্রমিকের কঠিনতম কাজকেও বেছে নিয়েছিলেন সহজভাবে। কোনো কাজকেই তিনি অবজ্ঞার চোখে দেখেননি।
ছাত্রজীবন থেকেই রবার্ট ফ্রস্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত হন। তবে কবিতার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ঝোঁক। ১৮৯৪ সালে প্রথম কবিতা ‘মাই বাটারফ্লাই’ ছাপা হয় নিউইয়র্ক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায়। প্রথমে বিভিন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও স্মরণিকায় এবং পরবর্তী কালে বিখ্যাত পত্র-পত্রিকার সাহিত্যপাতায় তাঁর কবিতা ছাপা হতো। অচিরেই তিনি কাব্যজগতে পরিচিত ও খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন।
কাব্য চর্চার প্রথম জীবনে রবার্টকে কেউ গোনায় ধরত না। অনেকে তাঁর কবিতা ছাপতে চায়নি। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। একবার দ্য আটলান্টিক মান্থলি নামে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ রবার্টের কবিতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (!) এই বলে যে, ‘মাসিক আটলান্টিক’-য়ে এসব কবিতার স্থান নেই। তখন রবার্ট খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। কিন্তু মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকেননি। কবিতা ও সাহিত্যচর্চায় আরও মনোযোগী হলেন এবং সফল হলেন। কাব্যখ্যাতির উচ্চ শিখরে ওঠার পর ওই পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ভুল স্বীকার করে পুনরায় লেখা চেয়েছিল। কিন্তু তখন আর তিনি লেখা দেননি। পরবর্তী কালে ওই পত্রিকাটিও রবার্টকে নিয়ে কভার স্টোরি করেছিল।
কর্মজীবনে রবার্ট ফ্রস্ট স্কুলের শিক্ষকতা করেন। এ সময় ‘ইলিয়ন হোয়াইট’ নামে তারুণ্যময়ী স্কুল শিক্ষিকার প্রেমে পড়ে যান এবং ১৮৯৫ সালে তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাস্তব জীবনে তাদের ছিল ছয় সন্তান।
রবার্ট ফ্রস্ট হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৮৯৭-১৮৯৯) পড়াশোনা করেন। কিন্তু ডিগ্রি অর্জন না করেই আবার ম্যাসাচুসেটস এ ফিরে গিয়ে ডেইরি ফার্ম, এবং কৃষি কাজে নিয়োজিত হন। ১৯১২ সালে ফ্রস্ট তাঁর খামার বিক্রি করে সপরিবারে ইংল্যান্ডে চলে যান। নির্বাচিত কবিতা নিয়ে প্রথম কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয় উনচল্লিশ বছর বয়সে।
বিলেত যাওয়ার পর মূলত রবার্টের কাব্য সৃজনের জাগরণ সৃষ্টি হয়। তিনি সেখানকার কবিদের নজরে পড়ে যান এবং গভীরভাবে প্রভাবিত হন। অচিরেই তিনি কাব্যজগতে নন্দিত কবি হিসাবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন।
১৯১৫ সালে রবার্ট ফ্রস্ট বিলেত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। তিনি আমেরিকার এল্মহার্স্ট কলেজ এবং মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে অনেকদিন (১৯১৬-৩৮) শিক্ষকতা করেন। একই সঙ্গে ১৯১৬ সালে তিনি ‘দ্যা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তাঁর কবিতার বই মাউন্টেন ইনটার্ভেল প্রকাশিত হলে সমগ্র আমেরিকা ও ইউরোপে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এই কবিতা সংকলনে অন্তর্ভুক্ত রবার্ট ফ্রস্ট-এর কয়েকটি বিখ্যাত কবিতার মধ্যে ‘দ্য রোড নট টেকেন, দ্য ওভেন বার্ড, দ্য হিল ওয়াইফ সহ বেশ কিছু কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে।
১৯৩৮ সালে রবার্ট ফ্রস্টের স্ত্রী মারা যান। এ সময় তাঁর জীবন চরম অসহনীয় হয়ে ওঠে। নিঃসঙ্গতার ব্যাধিতে নেমে আসে কঠিন ট্র্যাজেডি। স্ত্রীকে হারানোর বেদনা না কাটতেই রবার্ট তাঁর চার সন্তানকে হারান। তাদের মধ্যে দুই কন্যা চরম মানসিক রোগাক্রান্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পুত্র ক্যারল টুকটাক কবিতাও লিখতেন। এক সময় সেই পুত্রটি আত্মহত্যা করেন।
প্রাণপ্রিয় স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়ে অনেক বেদনার মধ্যেও টলে যাননি ফ্রস্ট। জীবনকে গতিশীল রাখার জন্য ১৯৫৭ সালে রবার্ট ফ্রস্ট ইংল্যান্ড ও গ্রিস এবং ১৯৬১ সালে ইসরায়েল সফর করেন। একই বছর (১৯৬১) প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ইনাগ্রেসন অনুষ্ঠানে রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর দু’টি বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করেন। সকালের সূর্যকিরণ যখন হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট প্যালেসের সুবিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সকলকে শিহরিত করছিল। তখন রবার্ট ফ্রস্ট কর্তৃক আবৃত্ত ‘দ্যা প্রিপেচ’ এবং ‘দ্যা গিফট আউট রাইট’ কবিতা দু’টি সবাইকে মুগ্ধ ও বিমোহিত করে। প্রেসিডেন্ট ‘জন এফ কেনেডি’ এবং অন্যান্য অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে ছবিসহ পরদিন নিউইয়র্ক টাইমস এবং অনেক পত্রিকার কভার স্টোরি ছিল কবি রবার্ট ফ্রস্টের।
রবার্ট ফ্রস্ট পৃথিবীর বিখ্যাত কবি হিসাবে পরিচিত। বলাবাহুল্য, ১৯৫০ সালের টাইম ম্যাগাজিনের সেরা ব্যক্তিত্বের সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া লাইফ ম্যাগাজিনসহ বেশ কয়েকটি বিখ্যাত পত্রিকার কভার স্টোরি হয়েছিলেন তিনি।
১৯৬২ সালে একটি রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে গুডউইল গ্রুপের প্রতিনিধি হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন। নোবেল প্রাইজ ছাড়াও রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসাবে ইউ এস সিনেট পুরস্কার (১৯৫০), আমেরিকান পোয়েটস একাডেমি পুরস্কার (১৯৫৩), নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি পুরস্কার (১৯৫৬), দ্য হান্টিংটন পুরস্কার (১৯৫৮), দ্য কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল (১৯৬২), ম্যাকডোয়েল মেডেল (১৯৬২) পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৩০ সালে আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লিটারেচার এর নির্বাচিত মেম্বার, এল্মহার্স্ট ইউনিভার্সিটি লাইফ লেকচারার (১৯৪৯) এবং ১৯৫৮ সালে লাইব্রেরি অব কংগ্রেস এর পোয়েট্রি কনসালট্যান্ট নির্বাচিত হন। এ ছাড়া জীবদ্দশায় চার বার কবিতায় বিশ্ব বিখ্যাত পুলিৎজার প্রাইজ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।
১৯৬৩ সালের ২৬ শে জানুয়ারি কবি রবার্ট ফ্রস্ট ইহজগৎ ত্যাগ করেন। রবার্ট ফ্রস্ট এর ‘দি লেসন ফর টুডে’ নামক একটি বিখ্যাত কবিতার ‘আই হ্যাড এ লাভার্স কুরয়েল উইথ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ বিখ্যাত লাইনটির কোড নিয়ে আমেরিকায় একটি সাড়া জাগানো মুভি হয়েছিল। এখনো তাঁর কবরের স্মৃতিফলকে লেখা রয়েছে—‘আই হ্যাড এ লাভার্স কুরয়েল উইথ দ্য ওয়ার্ল্ড।’
একজন কবিকে বিখ্যাত হতে হলে অনেক কবিতার দরকার হয় না। অসংখ্য কাব্য সম্ভারের মধ্যে দু’চারটি উল্লেখযোগ্য কবিতাই তাঁকে খ্যাতিমান করে তুলতে পারে।
রবার্ট ফ্রস্টের ‘দ্য রোড নট টেকেন’ নামে একটি বিখ্যাত কবিতা এ রকম—
দু’টো পথ: একটি হরিদ্রাভ মসৃণ
আরেকটি গিয়েছে বনখণ্ডের মধ্য দিয়ে। আমি
একই সঙ্গে দু’টো পথে চলতে পারি না। তাই
যত দূর চোখ যায়, দাঁড়িয়ে দেখলাম
একটি পথ ঘন আগাছায় ভরা জনপদ চিহ্নহীন!
অন্য পথটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
আরও রয়েছে
মানুষের পায়ে হাঁটার স্বাক্ষর।
উভয় পথেই সকালের মিষ্টি রোদ পড়েছে—
কিন্তু যে পথে কেউ কখনো পা রাখেনি
আমি সে পথটিই বেছে নিলাম।’
এই হচ্ছে রবার্ট ফ্রস্টের জীবন ও কর্মের কিছু দৃষ্টান্ত। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও জীবনকে বিচিত্রভাবে উপভোগ করেছেন। জীবন ও কমের্র কঠিনতম দিকগুলো তাঁকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে।
রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় প্রেম আছে। বিরহকাতর ভালোবাসা আছে। অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে আছে সোচ্চার প্রতিবাদ। সত্যনিষ্ঠ দেশাত্মবোধ আছে। কর্তব্য পরায়ণে দৃঢ়তা আছে। অদম্য সাহস, দ্রোহ এবং প্রবল উত্তাপ আছে। আরও আছে জীবনবোধের বৈচিত্র্যময় আনন্দ ক্ষেত্র বিনির্মাণের প্রবল স্পৃহা। এসব কারণেই সাহিত্য জগতে কবি রবার্ট ফ্রস্ট অনির্বাণ ও অমর হয়ে থাকবেন।