মৃত মানুষের টেলিফোন

ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে দেখি রাত দুইটা। ভাবলাম নিশ্চয় বাংলাদেশ থেকে কেউ সময় ভুল করে ফোন দিয়েছে। নিউইয়র্কের অবস্থা এখন এত খারাপ যে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পরিচিতজনরা খোঁজ নেওয়ার জন্য ফোন করে। আবার দেশের বাড়ি থেকে জরুরি ফোনও হতে পারে। ফোনের স্ক্রিনে কলারের নাম দেখতে চশমা খুঁজতে হবে। তাই তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরলাম যাতে লাইনটা কেটে না যায়। দেখি ওপাশ থেকে নারী কন্ঠে শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলছে। আমি রং নম্বর বলে ফোন রেখে দিতে যাব এমন সময় ওপাশ থেকে বলল, প্লিজ লাইনটা কেটো না। আমি পামেলা, তোমার বন্ধু। খুব বিপদে পড়ে তোমাকে ফোন করছি। আজ ১৫ দিন থেকে ম্যানহাটনে আটকা পড়ে আছি। বেরোতে পারছি না। আমার কাছে আইডি নেই। ওরা আমাকে ছাড়ছে না।

এ ছাড়া বাইরে যাওয়ার মতো কোনো পোশাকও আমার নেই। এখানে অনেক ঠান্ডা। ওরা শত শত মানুষকে এখানে এনে রেখেছে। গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। আমি আর পারছি না। কাল সকালে এসে আমাকে উদ্ধার কর, প্লিজ।
বিছনায় উঠে বসলাম। তখনও ঘুম ঠিক মতো ভাঙেনি। বললাম, ঘটনা কী তা খুলে বলতো। এখন তো লকডাউন চলছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া তো আমি বাসার বাইরে যাই না। তোমার বাসা তো ব্রুকলিনে। তুমি ম্যানহাটনে গিয়ে আটকা পড়লে কীভাবে? আর তোমার পার্টনার কেতকি মানে কেট, সে মেয়েটাই বা কোথায়? তোমাদের কি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?
-সে অনেক কথা। তোমার সঙ্গে তো অনেক দিন যোগাযোগ নেই। আমরা দুজনেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলাম। তারপর দুই সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতাল থেকে এখানে এনে রেখেছে। কেটও হাসপাতালে ভর্তি ছিল। কিন্তু কোনো ভাবেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। জানি না সে কোথায় আছে, কেমন আছে। তুমি কেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাল আমাকে উদ্ধার কর, প্লিজ।
তুমি ওখান থেকে বের হতে এত ব্যস্ত কেন? সময় হলেই ওরা ছেড়ে দেবে। আমার পরিচিত কয়েকজনকে তো হাসপাতাল থেকে নিয়ে হোটেলে রেখেছিল। তারপর পুরোপুরি সুস্থ্য হওয়ার পর তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। তোমাকেও সময় হলে ছেড়ে দেবে। যা হোক আমি কাল কেতকির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করব। তুমি আমাকে তোমার ম্যানহাটনের ঠিকানাটা বল? দেখি কাল কী করতে পারি।
ওপাশ থেকে পামেলা কান্নকাটি শুরু করল।-কাল তুমি অবশ্যই আসবে। ঠিকানাটা আমি ঠিক জানি না। তবে লোকেশনটা তোমাকে বলছি। এটা ইস্ট রিভারের পাশ ঘেঁষে ম্যানহাটনের ৩০ স্ট্রিট আর ফার্স্ট অ্যাভিনিউয়ে যে এনওয়াই ইউ ল্যাং হাসপাতাল। তার সঙ্গে লাগানো দুটি পুরোনো বিল্ডিংয়ের মাঝখানে একটা বড় বিল্ডিং। এটা ফার্স্ট অ্যাভিনিউ থেকে নদীর ধার পর্যন্ত লম্বা। তুমি গুগলেও দেখে নিতে পারবে। আমার কিছু সমস্যা আছে। কেউ একজন না এলে আমাকে ছাড়বে না।
ঠিক আছে তুমি চিন্তা করো না। আমি দেখি, সকাল হলে কী করতে পারি। এই বলে টেলিফোন রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। ভাবলাম সকালে উঠে কেতকির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা
করব। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ঘুম আসল না। মনে হল, কেতকি বেঁচে আছে তো? হতে পারে এখনও অসুস্থ। হাসপাতাল অথবা কোনো রিহ্যাব সেন্টারে আছে। রিহ্যাব সেন্টারগুলোর ব্যবস্থাপনা কী খুব খারাপ? পামেলা কেন ওখান থেকে বের হতে এত উদগ্রীব। পরিচিত যারা রিহ্যাবে ছিল তাদের কাছ থেকে তো এমন খারাপ কিছু শুনিনি।পামেলা এমনিতেই একটু পাগলাটে টাইপের। আচার আচরণ পোশাকে পুরোদস্তুর পুরুষ। বছর পাঁচেক আগে আমরা এক সঙ্গে চাকরি করতাম। মেডিকেড অফিসে আমাদের পাশাপাশি ডেস্ক ছিল। আমাদের কাজ ছিল মেডিকেল ইনস্যুরেন্স রিনিউ করা। প্রতি বছর লোকজন তাদের ইনস্যুরেন্স রিনিউ করার জন্য যে আবেদন করে, তাদের পরিবারের লোকসংখ্যা ও ইনকাম ভেরিফাই করে যারা যোগ্য বিবেচিত হয় তাদেরটা পরবর্তী বছরের জন্য রিনিউ করা। খুব সহজ একটি কাজ। আমাদের অফিস ছিল ২৬ স্ট্রিট আর ১১ অ্যাভিনিউয়ের কর্নারে। আমি আর পামেলা ব্রেক টাইমে ১২ অ্যাভিনিউ পার হয়ে চলে যেতাম হাডসন নদীর ধারে পার্কে অথবা ৯ অ্যাভিনিউয়ের ওপরে হাইলেন পার্কে। পামেলা ইতালিয়ান বংশোদ্ভুত আমেরিকান। কথায় কথায় একদিন জানাল, সে কেট নামে একটি মেয়ের সঙ্গে ব্রুকলিনে থাকে। কেটও ম্যানহাটনে আরেকটি অফিসে কাজ করে। পামেলা বলল, তোমাকে একদিন কেটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। দেখবে ও অনেক ভালো মেয়ে। আমি সাহস পেয়ে বললাম, তাহলে চেষ্টা করে দেখব কেটকে গার্লফ্রেন্ড বানানো যায় কিনা। পামেলা বলল, তা তুমি চেষ্টা করে দেখতেই পারো। ওরা তো বাংলাদেশের। ওর দাদা শিপে চাকরি নিয়ে এসেছিল। তারপর শিপ থেকে নেমে এখানে থেকে গেছে। যাদেরকে বলে শিপ জাম্পার।
একদিন অফিস শেষে পামেলা বলল, অফিসের গেটে কেট অপেক্ষা করছে। চলো যাই তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। দুজন ১১ তলা থেকে নিচে নামলাম। দেখি এক সুন্দরী বাঙালি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পামেলা দৌড়ে গিয়ে হাই, সুইটি হানি বলে তাঁকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকাল। মেয়েটা পামেলার হাত ছাড়িয়ে বলল, তোমার সহকর্মী তো বাংলাদেশের। তাঁর সামনে একটু সংযত হওয়া উচিত। পামেলা বলল, হ্যাঁ তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। এই হচ্ছে মিস্টার রো আর বুঝতেই পারছ ও হচ্ছে কেট। মেয়েটা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমার নাম কেতকি রয়, আপনি কী রহমান না রমিজ? আমি হেসে বললাম, রহমান বা রমিজ কোনোটাই না, আমি রোহিত, রোহিত সেন। তারপর আমরা হাডসন নদীর ধারে পার্কে গিয়ে কিছুটা সময় কাটালাম। সেই দিন পামেলা জিজ্ঞাসা করেছিল, তোমাদের দেশে ছেলে-ছেলে বা মেয়ে-মেয়েতে কী বন্ধুত্ব হয় না? আমি বললাম, অবশ্যই হয়। তবে সেটা বন্ধুত্ব পর্যন্তই তার বেশি কিছু নয়।
-তুমি কি নিশ্চিত? সেখানে কোনো ব্যতিক্রম নেই।
ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই। তবে সেটা অবশ্যই সমাজের অগোচরে। এখানকার মতো প্রকাশ্যে নয়।
-দেখো, সব প্রাণির ভেতরেই এ ধরনের একটি বিষয় আছে। এটা একটি প্রাকৃতিক বিষয়। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও আছে। মানুষ তো নিজেদের অন্য প্রাণি থেকে উন্নত আর সভ্য বলে দাবি করে। বাংলাদেশে এ ধরনের আচরণকে সভ্যতার পরিপন্থী মনে করে। এ ছাড়া এই সব আচরণ সংক্রামক ব্যাধির মতো একটু প্রশ্রয় পেলেই ছড়িয়ে যায়। যে কারণেই আমাদের সমাজ এগুলোকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয় না।
হয়তো কথা বলতে বলতে আমি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম। কেতকি বলল, অযথা বেচারাকে উত্তেজিত করছ কেন। এগুলো অনেক জটিল বিষয়। এর সঙ্গে ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি বহু কিছু জড়িত।
আমি আর কথা বাড়াই না। তবে কেতকিকে দেখার পর অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। এই রকম একটি মেয়ে কীভাবে বিপথে পা বাড়িয়েছে। মেয়েটার বাবা-মা কতটা কষ্ট নিয়েই না বেঁচে আছে। আর যে বেচারা শিপ জাম্প করে এ দেশে থেকে গিয়েছিল সে কী জানত তার পরবর্তী প্রজন্মের এই উন্নত ভবিষ্যত? জানলে সে সাঁতরে আটলান্টিক পার হয়ে দেশে ফিরে যেত।
সেদিনের পর আমার বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল পামেলার সঙ্গে স্বাভাবিক হতে। তবে এই জুটিটি আমার ভালো বন্ধু হয়েছিল। আমি কয়েকবার ওদের বাসায়ও গিয়েছি। তারপর ওখান থেকে চাকরি ছেড়ে আসার পর অনেকদিন আর কোনো যোগাযোগ নেই।
এইসব ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেল। বিছানা থেকে উঠে চিন্তা করলাম, প্রথমে কেতকিকে একটা ফোন দিয়ে খোঁজ নেওয়া দরকার, সে কোথায় কেমন আছে। টেলিফোনে দেখলাম কেতকির নাম সেভ করা নেই। ডায়েরির পাতা ওল্টাচ্ছি কেতকির নম্বর খোঁজার জন্য। এমন সময় কেতকির নাম ভেসে উঠল টেলিফোন স্ক্রিনে। টেলিফোন ধরতেই কেতকি বলল, পামেলা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ১৫ দিন মর্গে পড়ে আছে। ফিউনারেল হোম খালি পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন লাশ নিয়ে আমরা এস্টোরিয়া সিমেট্রিতে যাব। তুমি ওখানে চলে আসো।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী বলছ তুমি। পামেলা তো গত রাত দুইটার সময় আমাকে ফোন দিয়েছিল। আমার তো এখন ম্যানহাটন যাওয়ার কথা। পামেলা আমাকে ৩০ স্ট্রিট আর ফার্স্ট অ্যাভিনিউয়ের ওখানে হাসপাতালের পাশের বিল্ডিংয়ে যেতে বলেছে। তুমি এখন কোথায়?
কেতকি বলল, আমি ঠিক ওই লোকেশনেই আছি। এটা নিউইয়র্ক সিটির কেন্দ্রীয় মর্গ। আমরা ১০টায় এস্টোরিয়া সিমেট্রিতে পৌঁছাব তুমি চলে এসো।
আমার মাথা তালগোল পাকিয়ে গেল। এটা কীভাবে সম্ভব! একজন মৃত মানুষ কিভাবে আমাকে টেলিফোন করল? আমি রাতে ঘুম ভেঙে স্পষ্ট পামেলার গলা শুনলাম। এখন কেতকি ফোন দিয়ে বলছে সে ১৫ দিন আগে মারা গেছে। গলার ভেতরে কেমন যেন ব্যথা ব্যথা লাগছে। শরীরে একটু জ্বরও হয়তো আছে। নাশতা করে দু’কাপ আদা চা খেলাম। প্রায় একমাস পরে বাসা থেকে বের হলাম। গাড়িতে স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখি ব্যাটারি ডাউন। গাড়ি স্টার্ট নিল না। মনের ভেতরে কেমন যেন ভয় ভয় লাগছ। জ্বর কী একটু বেড়েছে! সাবওয়েতে নামার পর দুই বার কাশি হলো। আমি কী অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। প্রায় এক মাস সেলফ কোয়ারেন্টিনে আছি। নিয়ম অনুযায়ী এখন আমার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। ট্রেনে-বাসে ভেঙে ভেঙে এস্টোরিয়া সিমেট্রিতে পৌঁছাতেই বেলা ১১টা বাজল। রাস্তা থেকে অনেকবার এই সিমেট্রি দেখেছি, কিন্তু ভেতরে যে এমন সাজানো গোছানো অফিস থাকতে পারে আমার ধারনা ছিল না। অফিসের ভেতরে ফ্রন্ট ডেস্কে দুজন স্প্যানিশ মেয়ে কাজ করছে। সামনে বেশ লম্বা লাইন। সবাই একজন আরেকজন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ানো। ফ্রন্ট ডেস্কে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগল। আমি পামেলা ও কেতকি দুজনেরই নাম বললাম। কারণ আমি জানি না ওরা জীবিত মানুষ না মৃত মানুষের নামে ফাইল করে। মেয়েটা কম্পিউটার মনিটরে চোখ দিয়ে বলল, আমরা দুজনের লাশই আজ রিসিভ করেছি। দুজনই ১৫ দিন আগে মারা গেছে। এলজিবিটি ম্যারেড কাপল। ওদের অ্যাসোসিয়েশন থেকেই সব ব্যবস্থা করছে। আমি খুব উত্তেজিত হয়ে আমার অবস্থা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। দুজন মৃত মানুষ আমাকে টেলিফোন করে এখানে ডেকে নিয়ে আসল! এটা কীভাবে সম্ভব। মেয়েটা শান্ত ভাবে আমার কথা শুনে বলল, এটা খুবই অসম্ভব। কিন্তু গত একমাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই এমন কিছু অসম্ভব ঘটনা আমাদের শুনতে হচ্ছে। তারপর আমার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলল, আপনি এই নম্বরে কল করে কথা বলতে পারেন। তারা হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে পারবে। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।
আমি বাইরে বেরিয়ে হাতের কার্ডটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেটা একটা মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ কেন্দ্রের ঠিকানা।