আপনি হাইওয়েতে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন আর পথ হারাবেন না সেটা কেমন করে হয়? আজ থেকে বছর পনেরো আগেও রাস্তাঘাট হারিয়ে গেলে তা খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল ইয়াহু ম্যাপ। ম্যাপটা কোলে রেখে গাড়ি চালিয়ে ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া। আর তাতেও যদি কাজ না হতো তাহলে কোনো গ্যাস স্টেশনে সোজা গাড়িটা পার্ক করে সেখানকার স্থানীয় অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে রাস্তাঘাটের আদ্যোপান্ত বুঝে নেওয়া। মনে রাখবেন আমাদের সেই সময়ে জিপিএস নামের ‘বস্তুটি’ তখনো আলোর মুখ দেখেনি।
আমাদের গাড়ি ছুটছে ফ্লোরিডার ওল্ডডেক্সি হাইওয়ের ধুলো উড়িয়ে। আপাত গন্তব্য লেক মিয়াকার একটা অনেক পুরোনো ক্যাভারেন যা কি না, আজ থেকে ৩০০ বছর আগে স্থানীয় নেটিভরা আবিষ্কার করেছিল সেটার পরিদর্শন। গাড়ি চালাচ্ছি আমি। আমার পাশে আমাদের শ্রীমান সবজান্তা বাবু। পেছনের সিটে রয়। গাড়ির ভেতর অসাধারণ এক পরিবেশ। ফুল ভলিউমে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজছে ডিফারেন্ট টাচ, অবসকিউর, ক্লিফ রিচার্ড, জন ডেনভার। পাশে বসে থাকা বাবুর দেওয়া পথনির্দেশনা অনুযায়ী আমি মোটামুটি নিশ্চিন্ত মনেই গাড়ি চালাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কী হলো জানি না, বাবুর চোখেমুখে যেন আতঙ্কের ছাপ। ‘রাস্তাঘাট তো ম্যাপের সঙ্গে মিলছে না। ভুল রাস্তায় আছি।’ বাবুর এই কথা শুনে এবার আমরা সবাই যেন নড়েচড়ে বসলাম। পেছন থেকে রয় টিপ্পনী কাটল, ‘বাবুর মতো এমন সবজান্তা একজন গাইড থাকলে পথ যে আমরা হারাব তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?’ কিন্তু এখন ঝগড়া করার সময় না। মাথা আমাদের ঠান্ডা রাখা চাই। হাইওয়েতে রাস্তা হারালে সবার আগে যা করণীয় তা হলো, ‘টেক দা ইমিডিয়েট এক্সিট’। আমিও তাই করলাম। এবার পরের যা করণীয় তা হলো একটা গ্যাস স্টেশন খুঁজে বের করা এবং সেখানে কারও কাছ থেকে পথঘাট ভালো করে বুঝে নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়া। আমরা তাই করলাম। বেশ দূরে একটা গ্যাস স্টেশনের সাইন দেখে তাই অনুসরণ করার চেষ্টায় নেমে পড়লাম। অপেক্ষাকৃত শহর থেকে দূরে এই সব গ্যাস স্টেশন দেখলেও প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। খুব সুন্দর সাজানো-গোছানো। যাকে বলে ঝকঝকে তকতকে। সামনে ফুলের বাগান। চারদিকটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আশপাশের সবকিছুই পবিত্র মনে হয়। অনেক লম্বা সময় ড্রাইভিংয়ের জন্য আমরা সবাই মোটামুটি ক্লান্তই ছিলাম। পেয়ে আমাদের আহ্লাদের আর সীমা থাকল না। এখান থেকে গাড়ির তেল ভরে, পেটে কিছু চালান দিয়ে আর একটু ফ্রেশ হয়ে কারও কাছ থেকে পথনির্দেশনা ভালো করে বুঝে আবার রাস্তায় নেমে পড়া যাবে। সবাই মিলে হইচই করে গ্যাস স্টেশনের ক্যাশ রেজিস্টারের সামনে যেতেই আমাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া! এক নিপাট বাঙালি ভদ্রলোক ফিনফিনে এক ফতুয়া পরে সব কাজের দেখভাল করছেন। আর তাঁর পাশে এক রূপসী বাঙালি রমণী, যিনি ক্যাশ রেজিস্টারের সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। চেহারা আর কাপড়চোপড় দেখে ধরেই নিয়েছিলাম যে এরা একদম খাঁটি বাংলাদেশের বাঙালি। আর চারদিকে আলোকিত করে রাখা এই অপরূপ সুন্দরী যে এই ভদ্রলোকেরই স্ত্রী সেটাও আমরা কীভাবে যেন বুঝে নিয়েছিলাম। তাই হাজারটা মানা থাকা সত্ত্বেও সভ্যতা-ভব্যতার মাথা খেয়ে আমাদের বাবু কথা বলবেই বলবে। ‘ভাইজান কি বাঙালি?’ আমাদের সবার মুখে বাংলা ভাষার কিচিরমিচির শুনে ফ্লোরিডার কোনো এক অজপাড়াগাঁয়ের এই গ্যাস স্টেশনের মালিকের চোখে যেন আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। কীসের কাজ, কীসের কী? নিমেষেই আমরা সবাই আড্ডায় ডুবে গেলাম। আর হ্যাঁ, জানা গেল এই ভদ্রলোক এই এক্সন গ্যাস স্টেশনটার মালিক। মাসুদ ভাই। আর ওই সুন্দরী নারী বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত তাঁরই স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই ব্যবসা দেখছেন। ততোক্ষণে আমাদের আড্ডা তুঙ্গে। চা আসছে, কফি আসছে, স্যান্ডউইচ আসছে। আর আমাদের গল্পের গরু বাংলাদেশের সবুজ প্রান্তরে চরতে শুরু করেছে। লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বেশ বোঝাই যাচ্ছে মাসুদ ভাই এক মহা আড্ডাবাজ মানুষ। আর ভাবি তাঁর যথার্থ সহধর্মিণী।
এক কিউবান কর্মচারীকে দোকানের দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে মাসুদ ভাইয়ের ছোট্ট অফিসে আমরা পাঁচটা বাঙালি প্রাণী টক-ঝাল-মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদের গল্পে বেহুঁশ হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের বাঙালিরা যে অতিথিপরায়ণ সে খবর পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষই একবাক্যে স্বীকার করবেন কিন্তু মাসুদ ভাই আর ভাবি যেন তার চেয়েও দুই ডিগ্রি এগিয়ে আছেন। সত্যি বলতে এই অল্প সময়ের মধ্যেই এই দম্পতি আমাদের খুব কাছের হয়ে গেলেন। আমাদের বারবার মনে হচ্ছিল, এই মাসুদ ভাইকে হয়তো চিনি কত জনম আগে। বাংলাদেশকে নিয়ে কতই-না তাঁর উচ্ছ্বাস, কতই-না ভালোবাসা আর সেই সঙ্গে উৎকণ্ঠা! দেশটা কবে দাঁড়াবে? কবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া হবে। কবে দুর্নীতিমুক্ত হবে? আমাদের আলোচনার সবটা জায়গা জুড়েই বাংলার সবুজ মায়াবী আঁচলে ঢাকা ছিল।
জানি যাঁরা বাংলাদেশের বাইরে থাকেন তাঁদের কাছে বাংলাদেশ নিয়ে উচ্ছ্বাস আর আবেগটা হয়তো একটু বেশি কিন্তু এর মূল্য যে একজন প্রবাসীর কাছে সাতরাজার ধনের চেয়েও মূল্যবান, সে কথাটা কি আপনারা জানেন? মাসুদ ভাই আর ভাবির সঙ্গে এমনভাবে আড্ডায় জড়িয়ে পড়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের যাত্রাপথের সব আয়োজন ভেস্তে গেল। কীসের ক্যাভেরন দেখতে যাওয়া? সে তো আরেক দিন দেখা যাবে! তার চেয়ে একজন এ রকম তরতাজা আড্ডাবাজ আর হৃদয়বান বাঙালির দেখা পাওয়াটা কি আরও বেশি ভাগ্যের বিষয় নয়? সেই যে মাসুদ ভাইদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেই থেকে তিনি আমার হৃদয়ের একজন মানুষ হয়ে আমার জীবনের সব খুঁটিনাটির সঙ্গে গেঁথে আছেন। এখনো ফ্লোরিডা ঘুরতে গেলে মাসুদ ভাইকে দেখব না এমন ধৃষ্টতা আমি দেখাই কী করে? বাঙালির এই অকৃত্রিম ভালোবাসাকে অবজ্ঞা করার সাহস কি আমার আছে? মাসুদ ভাইদের মতো এই মানুষ আছেন বলেই বাঙালিদের বুকের ছাতিটা গর্বে এত বিশাল হয়ে যায়।